বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার মানচিত্র এখন আর শুধু স্থলভাগের সীমানা, শিল্পকারখানার উৎপাদন কিংবা সামরিক শক্তির পরিমাপে নির্ধারিত হয় না; সমুদ্রপথের ওপর কার কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেটিও হয়ে ওঠেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম নির্ধারক। যে জলপথ দিয়ে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও প্রযুক্তিসামগ্রী বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছায়, তার নিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকার বিঘ্নিত হলে কয়েক হাজার মাইল দূরের দেশেও মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন সংকট ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগর এই বাস্তবতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি। এর নীল জলরাশির নিচে রয়েছে জ্বালানি ও মৎস্যসম্পদের সম্ভাবনা, আর জলপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিপুল প্রবাহ। ফলে এই সাগরকে ঘিরে বিরোধ নিছক ভূখণ্ডের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশাধিকার, সামুদ্রিক আইন এবং ভবিষ্যতের কৌশলগত ক্ষমতা নির্ধারণের লড়াই।
প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশে অবস্থিত প্রায় ৩৫ লাখ বর্গকিলোমিটারের দক্ষিণ চীন সাগর চীন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই ও ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যিক সংযোগের অংশ হিসেবে এই অঞ্চল দিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবাহিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব সমুদ্রবাণিজ্যের আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ এই সাগর ও এর সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক করিডরের ওপর নির্ভরশীল। তবে, এই প্রবাহের গুরুত্ব শুধু বাণিজ্যের আর্থিক মূল্য দিয়ে বোঝা যাবে না। পূর্ব এশিয়ার উৎপাদনকেন্দ্রগুলো থেকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই পথের কার্যকারিতা বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় ও গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই বাস্তবতায় দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর প্রভাব বিস্তারের অর্থ কেবল সমুদ্রের একটি অংশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; বরং বাণিজ্যিক চলাচলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ অর্জন। কোনও রাষ্ট্র যদি এই অঞ্চলে অন্যদের চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা অর্জন করে, তবে সংঘাতের সময় সেই সক্ষমতা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বিপরীতে, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক দেশগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। তাই দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধকে সামুদ্রিক ভূরাজনীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের ঐতিহাসিক অধিকারভিত্তিক দাবি এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে সংঘাত। চীন দক্ষিণ চীন সাগরের বিস্তীর্ণ অংশে ঐতিহাসিক অধিকার দাবি করে আসছে, যার প্রকাশ বহুল আলোচিত নয়-দাগের রেখায়। কিন্তু ঐতিহাসিক উপস্থিতি বা অতীতের মানচিত্রের উল্লেখ করলেই আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে কোনো সমুদ্রাঞ্চলের ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন বা ইউএনসিএলওএস উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সামুদ্রিক অধিকার, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং নৌচলাচলের স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করেছে। এসব বিধানই বিরোধ নিষ্পত্তির প্রধান আইনি ভিত্তি।
২০১৬ সালে ফিলিপাইন ও চীনের মধ্যকার বিরোধে গঠিত সালিশি ট্রাইব্যুনাল ঐতিহাসিক অধিকারসংক্রান্ত চীনের বিস্তৃত দাবির পক্ষে ইউএনসিএলওএসের বাইরে কোনো আইনি ভিত্তি পায়নি। একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল নির্দিষ্ট কিছু সামুদ্রিক অধিকার ও পরিবেশগত প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দেয়। চীন এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তার দাবিতে অটল রয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই রায় দক্ষিণ চীন সাগরের প্রতিটি দ্বীপ বা ভূখণ্ডের মালিকানা নির্ধারণ করেনি; বরং কনভেনশনের আওতায় উত্থাপিত নির্দিষ্ট সামুদ্রিক অধিকার ও দাবির বৈধতা বিচার করেছে। এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি, কারণ আইনি সিদ্ধান্তকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করলে বিরোধের প্রকৃত কাঠামো আড়াল হয়ে যায়। কিন্তু রায় প্রত্যাখ্যানের রাজনৈতিক অবস্থানও আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
চীনের কৌশল শুধু কূটনৈতিক দাবি উত্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন প্রবালপ্রাচীর ও সামুদ্রিক বৈশিষ্ট্যে ভূমি পুনরুদ্ধার, কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ, রানওয়ে, বন্দরসুবিধা এবং সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশটি তার উপস্থিতি জোরদার করেছে। এর ফলে প্রত্যন্ত জলাঞ্চলেও নজরদারি, সরবরাহ ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবকাঠামো বেইজিংয়ের কাছে প্রতিরক্ষার অংশ হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর দৃষ্টিতে তা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের উপায়। বিশেষ করে ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর জন্য সমস্যাটি আরও জটিল, কারণ তাদের সামুদ্রিক অধিকার রক্ষার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিশাল ব্যবধান জড়িয়ে আছে।
তবে, এই বিরোধকে শুধু চীনের সম্প্রসারণবাদ বনাম প্রতিবেশীদের প্রতিরোধ হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ ভূরাজনৈতিক মাত্রা বোঝা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রও দক্ষিণ চীন সাগরে তার উপস্থিতিকে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা ও বিদ্যমান আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজের নিয়মিত চলাচল এবং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বেইজিংয়ের একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে সীমিত করার উদ্দেশ্য বহন করে। কিন্তু চীনের কাছে এসব তৎপরতা তার উপকূলীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিসরের ওপর চাপ সৃষ্টি হিসেবে প্রতিভাত হয়। ফলে একপক্ষের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অন্যপক্ষের কাছে হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়; সেই হুমকি মোকাবিলায় নেয়া পাল্টা ব্যবস্থা আবার নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায়। এভাবেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা কখনও কখনও নিরাপত্তাহীনতাকেই আরও গভীর করে তোলে।
এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, কোনো পক্ষ হয়তো সরাসরি যুদ্ধ চায় না, অথচ ভুল হিসাব, আকস্মিক সংঘর্ষ বা রাজনৈতিক চাপের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিতর্কিত জলসীমায় কোস্টগার্ডের মুখোমুখি অবস্থান, সামরিক বিমানের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল কিংবা নৌযানের সংঘর্ষ থেকে এমন সংকট তৈরি হতে পারে, যার পরিণতি শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা তাই বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও একটি বড় অনিশ্চয়তা। কারণ, আধুনিক অর্থনীতি শুধু পণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; নির্দিষ্ট সময়ে সেই পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোর সক্ষমতাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ধরা যাক, সামরিক উত্তেজনার কারণে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বাধা সৃষ্টি হলো। তখন জাহাজমালিক ও বিমাকারীরা ঝুঁকিপ্রিমিয়াম বাড়াতে পারে, কিছু জাহাজ বিকল্প পথে চলতে বাধ্য হতে পারে এবং পরিবহনের সময় ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে আমদানি করা পণ্যের ষধহফবফ পড়ংঃ বা গন্তব্যে পৌঁছানোর মোট ব্যয় বাড়বে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তার ওপর চাপালে পণ্যমূল্য বাড়বে; উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল দেরিতে পেলে উৎপাদন কমাতে বা কার্যক্রম স্থগিত করতে পারে। ফলে একটি আঞ্চলিক সামুদ্রিক সংকট একইসঙ্গে সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাণিজ্যঘাটতির চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে। তবে এই প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সংকটের ব্যাপ্তি, স্থায়িত্ব, বিকল্প নৌপথের সক্ষমতা এবং বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শিল্পকারখানা জ্বালানি, তুলা, রাসায়নিক উপকরণ, যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাকশিল্পের মতো রপ্তানিমুখী খাতেও সময়মতো কাঁচামাল সংগ্রহ ও বিদেশি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানো প্রতিযোগিতার অন্যতম শর্ত। দক্ষিণ চীন সাগরে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বেড়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তামূল্য ও রপ্তানির প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয় সময়মতো দেশে না এলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এখানে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল শিক্ষা হলো, দূরবর্তী ভূরাজনৈতিক সংঘাতও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ। কোনো একটি বাণিজ্যপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও কাঁচামাল মজুত, বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শিপিং বাজারের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ জরুরি। একইসঙ্গে রপ্তানি খাতকে এমন সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যাতে পরিবহন ব্যয় বা সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন দেখা দিলেও উৎপাদন ও সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়। অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আইন, শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি এবং উন্মুক্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যের পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান নিতে হবে। এর অর্থ কোনো পরাশক্তির বিরোধে অন্ধভাবে পক্ষ নেয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা।
দক্ষিণ চীন সাগরের আরেকটি উপেক্ষিত মাত্রা হলো পরিবেশ ও জীবিকার নিরাপত্তা। প্রবালপ্রাচীরের ওপর কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক দূষণ এবং সামরিক তৎপরতা এ অঞ্চলের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিবেশগত ক্ষতি শুধু প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে না; তা স্থানীয় মানুষের আয়, খাদ্যপ্রাপ্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করে। রাষ্ট্রগুলো যখন সামরিক প্রতিযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও যৌথ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে। অথচ এই সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটিও পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
সমাধানের জন্য প্রথম প্রয়োজন বিরোধের আইনি কাঠামোকে স্বীকার করা এবং সামরিক শক্তির বদলে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান ও চীনের মধ্যে কার্যকর, বাস্তবায়নযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণবিধি প্রতিষ্ঠা জরুরি। শুধু কূটনৈতিক ঘোষণায় উত্তেজনা কমবে না; বিতর্কিত অঞ্চলে বিপজ্জনক আচরণ নিয়ন্ত্রণ, আকস্মিক সংঘর্ষ এড়ানোর প্রোটোকল, সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর প্রক্রিয়া থাকতে হবে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে এমন সামরিক ও কূটনৈতিক সংযম দেখাতে হবে, যাতে প্রতিরোধের নামে এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, যা শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর রাখাও অপরিহার্য। তবে আন্তর্জাতিক আইন নিজে থেকে কোনো বিরোধের সমাধান বাস্তবায়ন করতে পারে না; এর কার্যকারিতা নির্ভর করে রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক চাপ এবং নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকারের ওপর। পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের মতো ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে- যেখানে আইনি অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলেও পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
দক্ষিণ চীন সাগরের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে: আন্তর্জাতিক জলপথ কি সবার জন্য নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য ও চলাচলের ক্ষেত্র থাকবে, নাকি সামরিক শক্তি ও একতরফা দাবির প্রতিযোগিতা একে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত করবে? চীনের নিরাপত্তা-উদ্বেগকে উপেক্ষা করে যেমন স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, তেমনি ঐতিহাসিক অধিকারের দোহাই দিয়ে অন্য রাষ্ট্রের আইনসম্মত সামুদ্রিক অধিকার সংকুচিত করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে, নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলার পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলার দায়িত্বও বড় শক্তিগুলোর রয়েছে।
সমুদ্রের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় সাময়িক কৌশলগত সুবিধা অর্জন সম্ভব, কিন্তু সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য কোনো এক দেশের সীমানায় আটকে থাকবে না। জাহাজ চলাচলে বাধা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বজুড়ে। তাই দক্ষিণ চীন সাগরে প্রকৃত বিজয়ী সেই পক্ষ হবে না, যে সবচেয়ে বেশি সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবে; বরং সেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হবে সফল, যেখানে কোনো রাষ্ট্রকে তার বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যের নিরাপত্তা ধ্বংস করার প্রয়োজন হবে না। এই সাগরকে পরাশক্তির সংঘাতের মঞ্চ থেকে সহযোগিতার জলপথে রূপান্তর করা এখন শুধু আঞ্চলিক শান্তির শর্ত নয়, বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতারও অপরিহার্য দাবি।
লেখক: ব্যাংকার
