ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপের অভ্যন্তরীণ বিবাদ চলছে দীর্ঘ সময় ধরে। টাটা ট্রাস্টস ও টাটা সন্সের মধ্যে টাটা সন্স-এর শেয়ারবাজারে সম্ভাব্য তালিকাভুক্তি (লিস্টিং) নিয়ে বিবাদের মীমাংসা না হওয়ায় দুই শিবিরের দ্বন্দ্ব আইনি লড়াইয়ের পথে চলেছে। টাটা ট্রাস্টগুলো সম্মিলিতভাবে টাটা সন্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারের (৬৬ শতাংশ) মালিক। টাটা গোষ্ঠীটির মালিকানা পরিচালিত হয়ে আসছে পার্সি সম্প্রদায়ের নোয়েল টাটার মাধ্যমে।
পরিচালনা সংক্রান্ত চলমান বিবাদের প্রেক্ষাপটে পার্সি ও জরোস্ট্রিয়ান সম্প্রদায়ের ছয়টি সংগঠন টাটা ট্রাস্টস এবং টাটা পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে আবেদন জানিয়েছে, যেন শেয়ার বাজারে টাটা সন্স-এর সম্ভাব্য তালিকাভুক্তি (লিস্টিং) নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটানো যায়। সেইসঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের মালিকানা ও পরিচালনার মডেলটিকে সুরক্ষিত রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।
মোদিকে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদী তত্ত্বাবধান এবং স্বল্পমেয়াদী বাজারের প্রত্যাশার মধ্যকার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনে এমন যেকোনো পদক্ষেপ টাটা সন্স এবং সেই সূত্রে পুরো টাটা গ্রুপের মূল কাঠামো, নীতি-আদর্শ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করতে পারে।
টাটা ট্রাস্টের পরিচালনা পদ্ধতি এবং টাটা গ্রুপের হোল্ডিং কোম্পানি ‘টাটা সন্স’-এর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে চলমান মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটেই এই হস্তক্ষেপের বিষয়টি সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর যুক্তি হলো, বিষয়টিকে কেবল একটি নিয়ন্ত্রক বা প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ এর ফলে টাটা গ্রুপের পরিচালনা পদ্ধতি (গভর্ন্যান্স) এবং বিনিয়োগ অগ্রাধিকারের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।
পার্সি সংগঠনগুলো জানিয়েছে যে, টাটা ট্রাস্টস এবং টাটা গোষ্ঠীর হোল্ডিং কোম্পানি ‘টাটা সন্স’-কে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব কেবল করপোরেট বা শেয়ারহোল্ডারদের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে ছয়টি সামাজিক সংগঠন জানিয়েছে যে, টাটা সন্সের সম্ভাব্য তালিকাভুক্তি (শেয়ার বাজারে অন্তর্ভুক্তি) নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা কেবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মকানুন মেনে চলার বিষয়টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা সতর্ক করে বলেছে যে, কোম্পানিটির মালিকানাকাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনা হলে তা টাটা গোষ্ঠীর জনহিতকর ঐতিহ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ অগ্রাধিকারগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
চিঠিতে ভারতীয় শিল্প, বিমান চলাচল, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে এই গোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স, টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস এবং টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
এতে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক গতিশীলতা (ইলেকট্রিক মোবিলিটি) খাতে তাদের বিনিয়োগের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এই গোষ্ঠীটি কেবল মুনাফার পেছনে না ছুটে ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাতগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করে এসেছে।
চিঠিটিতে টাটা গ্রুপকে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার সুনাম পার্সি সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। এতে সতর্ক করা হয়েছে যে, গ্রুপটির যে ‘অনন্য পরার্থপর বৈশিষ্ট্য’ রয়েছে, তা কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ হলে বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থানের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
