বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণ সক্ষমতা, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগে আনসার একাডেমি পরিদর্শন করেছেন চার দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল। সোমবার গাজীপুরের সফিপুরে একাডেমিতে আসেন সিঙ্গাপুর, মরক্কো, কসোভো ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূতগণ। বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদের উপস্থাপনায় প্রতিনিধিদল বাহিনীর প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম, কর্মমুখী শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সম্পর্কে অবহিত হন। তিনি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আধুনিকায়ন, আএসদস্যদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাহিনীর অবদান তুলে ধরেন। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত দেশের সর্ববৃহৎ এই স্বেচ্ছাসেবী ও আধাসামরিক বাহিনী সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
আনসার মহাপরিচালক বিশেষভাবে উল্লেখ করেন,পরিবর্তিত জাতীয় প্রেক্ষাপটে বাহিনীতে বহুমুখী কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা হয়েছে। এর আওতায় সর্বস্তরে ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজস্ব আধুনিক ইআরপি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল পর্যন্ত সদস্যদের একটি সুসংহত নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক এবং ‘প্রকল্প সঞ্জীবন’-এর সহায়তায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও তৃণমূল পর্যায়ে উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে এই আনসার ও ভিডিপি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকর অবদান রেখে চলেছে।
তিনি আরও বলেন,আমাদের লক্ষ্য কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি ক্ষেত্রে নৈতিক অভিবাসন নিশ্চিত করতে আমরা জাপানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব স্থাপন করেছি। নিজস্ব বায়োমেট্রিক ও ডেটাবেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা ছাড়াই নিরাপদ কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে বাহিনী নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
তেজগাঁওয়ে নির্মাণাধীন আধুনিক সদর দপ্তর এবং যুগোপযোগী কল্যাণমুখী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও দেশমাতৃকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সাথে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মহাপরিচালক। পরবর্তীতে প্রতিনিধিদল ইভি কারযোগে প্রান্তিক শক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (পিএসটিসি) পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা ৬জি ওয়েল্ডিং কর্মশালা, সবুজ জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, ড্রাইভিং সিমুলেটর প্রদর্শনী, ভ্রাম্যমাণ আইসিটি প্রশিক্ষণ বাস, কুটিরশিল্প প্রশিক্ষণ, জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আতিথেয়তা ও রন্ধনশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, অরণ্য অবকাশ এবং নির্মাণ, ড্রাইভিং ও গার্মেন্টস শিল্পবিষয়ক গণপ্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ব্যবহারিক দিক, আধুনিক সরঞ্জাম এবং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সম্পর্কে তারা অবহিত হন। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মান ও সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন।
পরিদর্শনকালে কর্মমুখী ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। ৬জি ওয়েল্ডিং, নির্মাণ ড্রাইভিং, গার্মেন্টস, আতিথেয়তা ও রন্ধনশিল্পের মতো খাতে দক্ষতা অর্জন দেশের শিল্পায়ন, সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও সবুজ জ্বালানিবিষয়ক প্রশিক্ষণ টেকসই উন্নয়ন ওর পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির বিকাশে সহায়ক হতে পারে। আইসিটি প্রশিক্ষণ এবং জাপানি ভাষা শিক্ষার সমন্বয় প্রশিক্ষণার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশে অভিযোজনের সুযোগ বাড়াতে পারে।
চার বন্ধুপ্রতিম দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের এ পরিদর্শন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণ সক্ষমতা, আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ, কারিগরি দক্ষতা ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে বাহিনীর সদস্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সম্ভাবনাও উন্মোচিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনীন রশিদ, কসোভোর রাষ্ট্রদূত লুলজিম প্লানা, সিঙ্গাপুরের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ফিলিপ ওং এবং মরক্কোর রাষ্ট্রদূত লাল্লা বুতাইনা এল কেরদৌদি এল কৌলালি উপস্থিত ছিলেন।
