হামের পর আরও তিন রোগের ভয়াবহ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

এএফপির প্রতিবেদন

হামের পর আরও তিন রোগের ভয়াবহ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেশের টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা ও ঘাটতিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে হামের পাশাপাশি হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া এবং টিকা থেকে উদ্ভূত পোলিও ভাইরাসের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের একটি স্বাধীন কমিটি।
অক্টোবরের শুরুতে গবেষণা চালানো এই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব দেশের টিকাদান ব্যবস্থার অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও সতর্কসংকেত। প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছে কর্তৃপক্ষ। এই প্রাদুর্ভাবে ১ হাজার ২০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ। কয়েক দশকের মধ্যে এটিকে দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত সংক্রমণ মোকাবিলায় ব্যবস্থা না নিলে হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া এবং টিকা থেকে উদ্ভূত পোলিও ভাইরাসের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়া কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জাহিদ রায়হান বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যত দ্রুত সম্ভব টিকাদানকর্মী নিয়োগ দেয়া হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), টিকা সহায়তাবিষয়ক জোট গাভি এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সমর্থনে চলতি মাসের শুরুতে ৭০ সদস্যের একটি দল বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি মূল্যায়ন করেছে।

মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশের মাত্র ৮২ শতাংশ শিশু পূর্ণাঙ্গ টিকা পেয়েছে। অথচ জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ৯৫ শতাংশ। এ ছাড়া টিকাদানকর্মীদের প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে টিকাদান কর্মসূচির সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯৭৯ সালে কর্মসূচি শুরুর পর দেশটি পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল করেছে। পাশাপাশি রুবেলা ও হেপাটাইটিস বি নিয়ন্ত্রণেও সাফল্য পেয়েছে। তবে ২০২৪ সালে পরিকল্পিত হামবিরোধী টিকাদান কর্মসূচি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা বিপ্লবের কারণে পিছিয়ে যায়। ২০২৫ সালে ধর্মঘট ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আরেকটি কর্মসূচিও ব্যাহত হয়।

এরপর কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম শুরু করলেও সংক্রমণ বাড়তে থাকায় উদ্বেগ কাটেনি। হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এর জটিলতার মধ্যে রয়েছে মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং গুরুতর শ্বাসকষ্ট। বিশেষ করে ছোট শিশুরা এ রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

অন্যদিকে, হুপিং কাশি শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ডিপথেরিয়া শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করার পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুর ক্ষতি করতে পারে। আর পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়া জনগোষ্ঠীতে টিকা থেকে উদ্ভূত পোলিও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে পক্ষাঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা না হলে বাংলাদেশে অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।