ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ব্রাজিলসহ লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ৮১তম জন্মদিনের মাত্র কয়েক দিন আগে এই সাফল্য পেলেন লুলা। এমন বয়সে অনেক নেতাই রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে লুলার এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন আরও একটি রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থেকেও কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী চূড়ান্ত দফায় জয় ছিনিয়ে আনতে পারেননি। এবার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী লুলা দুই দফার ভোটের মধ্যবর্তী তিন সপ্তাহে নিজের ভোটের সংখ্যা বাড়িয়েছেন এক কোটিরও বেশি। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন অতিরিক্ত মাত্র ৩৬ লাখ ভোট।
লুলার জয়ের ব্যবধান এতটাই বড় যে, ২০২২ সালে জাইর বলসোনারোকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময়ের চেয়েও এবার বেশি ব্যবধানে জয় পেয়েছেন তিনি। জাইর ছিলেন ফ্লাভিওর বাবা এবং তখনকার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট।
এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থিদের প্রধান নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখলেন লুলা। অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে যখন ডানপন্থিরা এগিয়ে যাচ্ছে এবং অনেক সরকার ডনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে, তখন লুলার জয় রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
এদিকে চার বছর আগে বাবার মতো এবারও নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। আদালতের মাধ্যমে নির্বাচন বাতিলের উদ্যোগ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সুপ্রিম ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিনের ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এই সিনেটর। তার দাবি, এই সিদ্ধান্ত সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়নি, ফলে ভোটের সমান সুযোগ ক্ষুণ্ন হয়েছে।
ফ্লাভিও বলেন, ‘যে পরিস্থিতিতে এসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া অসম্ভব।’
তবে তার এই বক্তব্য লুলার ঐতিহাসিক জয় উদ্যাপনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তারপরও কংগ্রেস ও রাজ্য সরকারগুলোতে ডানপন্থিদের শক্তিশালী অবস্থান লুলার নতুন প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
নির্বাচনে তার জয় রাজনৈতিক স্থায়িত্বের প্রমাণ দিলেও বিরোধী শিবিরের সংসদীয় শক্তি কমেনি। ফলে লুলার পরবর্তী মেয়াদের বড় বৈপরীত্য হলো—নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, কিন্তু দেশ পরিচালনায় সীমিত সুযোগ।
কীভাবে প্রথম দফার পরাজয় কাটিয়ে উঠলেন লুলা?
প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকার পর লুলা কীভাবে জয় পেলেন, তার ব্যাখ্যা মিলছে নির্বাচনী এলাকার ফলাফলে। ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটারসংখ্যার রাজ্য মিনাস জেরাইসে প্রথম দফায় প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিলেন লুলা। কিন্তু চূড়ান্ত দফায় সেখানে প্রায় ৯৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পান তিনি।
১৯৮৯ সাল থেকে ব্রাজিলে সরাসরি অনুষ্ঠিত প্রতিটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে রাজ্যের বিজয়ী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়েও জয়ী হয়েছেন, সেই মিনাস জেরাইস এবারও জাতীয় ফলাফলের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
সাও পাওলো ও রিও ডি জেনেইরো রাজ্যে ফ্লাভিও নিজের এগিয়ে থাকা ধরে রাখলেও দেশটির সবচেয়ে বড় দুই শহরের মেয়রসদৃশ নগর নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোতে জয় পেয়েছেন লুলা। রিও ডি জেনেইরো শহরেও প্রথম দফার ফল উল্টে দিতে সক্ষম হন তিনি।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নয়টি রাজ্যেই জয় এবং ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধিও লুলার সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে। প্রথম দফায় ভোট না দেয়ার হার ছিল ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ। চূড়ান্ত দফায় তা কমে প্রায় ১৯ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। ফলে প্রায় ৩০ লাখ বেশি ব্রাজিলীয় ভোট দিতে আসেন।
অতিরিক্ত এই ভোটারদের অংশগ্রহণের পুরো কৃতিত্ব লুলাকে দেয়া যায় না। তবে ভোটারদের কেন্দ্রে আনার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। কারণ প্রথম দফায় দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ২২ লাখের কিছু বেশি।
ডিজিটাল প্রচার ও ভোটারদের বাস্তব সমস্যা
নির্বাচনী লড়াইয়ের বড় একটি অংশ হয়েছে ব্রাজিলীয়দের মুঠোফোনে। প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকার পর ডিজিটাল প্রচার জোরদার করেন লুলা। তার লক্ষ্য ছিল সমর্থকদের কাছে পৌঁছানো এবং সমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করা। শুধু সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের মন জয় করাই নয়, যারা আগে থেকেই তাকে পছন্দ করেন, তাদের ভোটকেন্দ্রে আনাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি পদক্ষেপ ও প্রস্তাবও সামনে আনেন লুলা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়ের সীমা বাড়ানোর একটি আইনে স্বাক্ষর করেন তিনি। ভোক্তাদের ঋণ পুনর্গঠনের নতুন উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তাব দেন এবং অনলাইন বেটিং বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। অনলাইন বেটিংয়ের বিস্তার পরিবারগুলোর ঋণের বোঝা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিরাপত্তার প্রশ্নেও ঐতিহ্যগত ডানপন্থি অবস্থানের কাছাকাছি যান লুলা। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার ন্যূনতম বয়স কমানোর পক্ষে মত দেন তিনি। অপরাধ দমনে আরও কঠোর অবস্থানের দাবির প্রতি সাড়া দিতেই এই উদ্যোগ, যা নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল।
এই জয় লুলাকে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দিয়েছে। তবে নির্বাচনে জয়ী হতে তিনি যে প্রত্যাশা তৈরি করেছেন, তা পূরণের দায়িত্বও এখন তার ওপর।
