বিশ্বনেতাদের প্রতি মানবিক সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদাভিত্তিক নতুন বিশ্বসভ্যতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ক্যাপ্টেন এ কে এম গোলাম কিব্রীয়া (সিআইপি)। তিনি বলেছেন, ক্ষমতার ইতিহাস নয়, মানবমুক্তির ইতিহাস রচনা করুন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত ঐতিহাসিক ডিসি ৩৭ মেইন ইউনিয়ন হলে গত ২২শে অক্টোবর অ্যালায়েন্স অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকান লেবার (এএসএএএল)-এর ১৯তম বার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান। সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর, সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক সংগঠনের নেতা এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় ক্যাপ্টেন কিবরিয়া তার প্রস্তাবিত ‘হিউম্যান ইকুইটি সিভিলাইজেশন’ বা মানবিক সাম্যভিত্তিক বিশ্বসভ্যতার ধারণা তুলে ধরেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা ক্ষমতা অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের জীবন থেকে দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও অসহায়ত্ব দূর করা। বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু রাষ্ট্রের নেতা হবেন না, মানবতার নেতা হোন। এমন এক উত্তরাধিকার রেখে যান, যেখানে ক্ষমতার স্মৃতির চেয়ে মানুষের মুক্তির ইতিহাস হবে অনেক বেশি মহিমান্বিত।
ক্যাপ্টেন কিব্রীয়ার বক্তব্যে আগামী প্রজন্মের জন্য দুর্ভোগমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি এমন একটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান, যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, গৃহহীনতা, চিকিৎসাবঞ্চনা ও মানবিক অসহায়ত্ব মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে থাকবে না। তার মতে, প্রতিটি মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন, সমান সুযোগ এবং নিজের সম্ভাবনা বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক বিভাজন ও ভৌগোলিক সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যান দুর্ভোগমুক্ত পৃথিবী।
ক্যাপ্টেন কিব্রীয়ার দর্শন অনুযায়ী, বিশ্বসভ্যতার অগ্রগতি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং মানুষের দুর্ভোগ কতটা কমেছে এবং কতজন মানুষ মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছে, সেটিও অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও শ্রমিক নেতারা এএসএএএল-এর ১৯তম বার্ষিক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নিউইয়র্কের কংগ্রেস সদস্য গ্রেস মেং ও থমাস আর. সুয়োজি, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেট মেজরিটি লিডার আন্দ্রেয়া স্টুয়ার্ট-কাজিনস, অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস এবং নিউইয়র্ক সিটির কাউন্সিল স্পিকার জুলি মেনিন।
এ ছাড়া বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর, নগর প্রশাসনের প্রতিনিধি ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারাও সম্মেলনে অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন জর্জিয়ার সিনেটর শেখ রহমান ও নাবিলা ইসলাম, ভার্জিনিয়ার সিনেটর সাদ্দাম আজলান সালিম, সিডব্লিউএ লোকাল ১১৮০-এর গ্লোরিয়া মিডলটন, নিউইয়র্ক স্টেট নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের ন্যান্সি হ্যাগানস এবং ইউনাইটেড ফেডারেশন অব টিচার্সের মাইকেল মুলগ্রুস।
সম্মেলনে এএসএএএল-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস এমএএফ মিসবাহ উদ্দিন, জাতীয় সভাপতি মোহাম্মদ করিম চৌধুরী, সম্মেলন কমিটির চেয়ারম্যান ড. সুহাইল ইসলামসহ সংগঠনটির জাতীয় পর্যায়ের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
ক্যাপ্টেন কিব্রীয়ার বক্তব্যে বাংলাদেশের সোনাইমুড়ী ও চাটখিল থেকে শুরু হওয়া মানবকল্যাণের উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তার দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো, প্রতিটি মানুষ যেন মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে, নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে এবং অন্য মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের পর নিউইয়র্কের এ সম্মেলনে তার অংশগ্রহণকে মানবিক সাম্য ও বৈশ্বিক দায়িত্ববোধের বার্তা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্যাপ্টেন এ কে এম গোলাম কিব্রীয়া (সিআইপি) ড. মোস্তফা হাজেরা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও এমএইচ গ্লোবাল গ্রুপের চেয়ারম্যান। তার পরিচিতিতে ‘গ্লোবাল হিউম্যানিটারিয়ান চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড রিসিপিয়েন্ট, অক্সফোর্ড ২০২৫’ উপাধির উল্লেখ রয়েছে। তিনি ‘হিউম্যান ইকুইটি সিভিলাইজেশন’ ধারণার প্রবক্তা এবং বিশ্বব্যাপী পাঁচ শূন্য প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন বলে তার পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও দুর্ভোগমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
ক্যাপ্টেন কিব্রীয়ার বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— এক মানবজাতি, এক অভিন্ন দায়িত্ব এবং মানবিক মর্যাদাভিত্তিক এক নতুন বিশ্বসভ্যতা। তার মতে, ক্ষমতার সিংহাসন একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এবং মানবতার কল্যাণে অবদান রাখা নেতৃত্বের উত্তরাধিকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নিউইয়র্কের সম্মেলন থেকে তার দেয়া বার্তা— ওয়ান হিউম্যানিটি, ওয়ান শেয়ার্ড রেসপনসিবিলিটি, ওয়ান সিভিলাইজেশন অব হিউম্যান ডিগনিটি। বাংলায় যার অর্থ—এক মানবজাতি, এক অভিন্ন দায়িত্ব, মানবিক মর্যাদার এক নতুন বিশ্বসভ্যতা।
বিশ্বনেতাদের প্রতি তার আহ্বান, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক অর্জনের বাইরে এসে মানুষের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মানবতার মুক্তি ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই রচিত হতে পারে একটি নতুন বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস।
