জামায়াতের আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে আরও সাহসী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বিগত সরকারকে ফ্যাসিস্ট বানাতে ও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমেরও দায় রয়েছে। রাষ্ট্রের ৩টি স্তম্ভের কার্যক্রম সঠিক ও সোজা রাখতে ধারালো চাবুকের কাজ করে সংবাদ মাধ্যম। সংবাদ মাধ্যম জাতির দর্পণ। কিন্তু বিভিন্ন সরকারের আমলে তার বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতিনিয়তই দেশে কি ঘটছে তা সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে। এমন তথ্য জানানো কোনো রাজনৈতিক দলেরও সমক্ষমতা নেই। গতকাল দুপুরে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজে মুন হলে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে সংবাদ মাধ্যমের ওপর আক্রমণ হয়েছিল। রাজনীতির ওপর আঘাত এসেছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্র বাদ দিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সবগুলো সংবাদ মাধ্যম সরকার তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। ৪টি সংবাদ মাধ্যম ছাড়া আর কোনো সংবাদ মাধ্যমের অস্তিত্ব রাখা হয়নি। বিগত ৫৫ বছর থেকে দেখে আসছি সংসদ, সরকারি দল ও বিরোধী দলের ভূমিকা। কিন্তু জনগণ এটার পরিবর্তন চায়।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে আরো সাহস করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। একজন সাহস করে বলেছেন, আমাদেরকে কষ্ট দেবেন না, আমাদের কাছে আসতে হবে। তিনি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ভিপি ছিলেন। মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। আমি তাকে সাধুবাদ জানাই। এরকম বলতে হবে সাহস করে।
বর্তমান সরকার চায় যে আমরা অতীতের মতো ইয়েসম্যান বিরোধী দল হই। সরকারি দলের মতো করে সবকিছু বলি। আবার কিছু লোকের মাইন্ডসেট হলো অতীতের মতো আমরাও ফাইল ছোড়াছুড়ি করি। গালিগালাজ করি। সংসদের ভেতরকে উত্তপ্ত করে তুলি এবং একসময় সংসদকে অচল করে ফেলি। আমরা এর কোনোটাতেই নেই। জামায়াতের আমীর বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো ভালো লক্ষণ দেখছি না। বিএনপি’র একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাডারকে নির্বাচন কমিশনের এডিশনাল সেক্রেটারি হিসেবে বসানো হয়েছে। একজন দলীয় লোককে কেন আনতে হবে এখানে এ প্রশ্ন জনগণের। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ যিনি জাতীয় সংসদের শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকেন তিনি তার এলাকায় গিয়ে বলেছেন যে জায়গায় বিএনপি’র প্রার্থী বিজয়ী হবে না সেখানে কোনো সরকারি বরাদ্দ দেয়া হবে না। এটা লজ্জার বিষয়। তার মানে আগ থেকে জনগণকে ভয় দেখানো হচ্ছে।
এরকম ভয়ভীতি এবং দলভীতির মধ্যদিয়ে নির্বাচন হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের নিশ্চিয়তা পাবো তখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো। আমরা কারও স্কিপ গুড হতে চাই না। তিনি বলেন, আমরা জনগণের অধিকার নিয়ে লড়তে চাই। আমরা চাই জনগণ যাকে ভোট দিয়ে পছন্দ করবে সেই ক্ষমতায় যাবে। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা সৌভাগ্যক্রমে একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পেয়েছি। তিনি সকল মন্ত্রণালয়ে সার্ভিস দেন। তার প্রাইম ডিউটি হচ্ছে নিজের মন্ত্রণালয় লোক আফটার করা। না তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করলেন। না তিনি সমাজে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারলেন। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই। পুলিশের একজন কর্মকর্তার বাড়িতে কি ঘটেছিল। হাসপাতাল ভাঙা হচ্ছে। মাদকের মহড়া চলছে। চাঁদাবাজি হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে যদি দেশে অবৈধ টাকা ও প্রাণঘাতী অস্ত্র প্রবেশ করে, তাহলে সরকার থেকে লাভ কী? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যারাই পালন করেন এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলেন, আইনশৃঙ্খলা আগের চেয়ে ভালো।
এ সময় তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এই আগের চেয়ে ভালোর মাপকাঠি কি তা আজ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম না। জামায়াত আমীর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী এভাবে পাবলিকলি বলতে পারেন না। উনি খোলাসা করে বলুক আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমরা আছি। আমরা উনার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী প্রমাণ করুক কোথায় কখন, কার সঙ্গে, কীভাবে? গোয়েন্দা তথ্যের রেফারেন্স দিয়ে তিনি এভাবে কথা বলতে পারেন না। আমরা তার প্রমাণের অপেক্ষায় আছি। দেখি সাহস থাকলে আমাদের চ্যালেঞ্জ উনি গ্রহণ করুক। তিনি বলেন, বিএনপি বলছে আওয়ামী লীগ আমাদের দুশমন নন। আমাদেরকে আপনারা ভোট দিয়ে বিজয়ী করুন। আমরা বিজয়ী হলে আপনাদের সবগুলো অফিস খুলে দেয়া হবে এবং সবগুলো মামলা প্রত্যাহার করা হবে। অতি সম্প্রতি বরকতউল্লাহ বুলু সাহেব কী বললেন? নাটোরের এমপি সাহেব কী বললেন? এইটা তো প্রতিদিনের ঘটনা। পুলিশের কর্মরত একজন ডিআইজির মালিকানাধীন বাড়ি থেকে এই কয়দিন আগে কি উদ্ধার করা হয়েছে আপনারা তার সাক্ষী। যে বেড়া আমাদেরকে রক্ষা করবে স্বয়ং বেড়াই যদি আমাদের সমস্ত ফসলকে বিনষ্ট করে দেয় তাহলে হু উইল প্রটেক্ট আস? এই জাতিকে দেখে রাখবে কে? এইজন্য আমি এটা বলছি না যে পুলিশে সকল সদস্য তারা বোধহয় এই ধরনের কাজ করেন। না তাদের মধ্যে প্রচুর দেশপ্রেমিক ভালো মানুষ আছেন।
অনেকে বলেন আমরা কেন এত দ্রুত আন্দোলনে গেলাম। লংমার্চ করলাম। গণভোটের রায় মেনে নিলে আমরা লংমার্চ করতাম না। মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজে মুন হলে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। জেলা আমীর ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহেদ আলীর সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মো. ইয়ামীর আলীর সঞ্চালনায় এ সময় উপস্থিত ছিলেন- কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, হবিগঞ্জ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি কাজী মহসিন আহমদ। বিকালে ডা. শফিকুর রহমান জেলা জামায়াতের দায়িত্বশীল সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
