ফ্রান্সে আগামী শনিবার ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর পুলিশ ও জেন্ডারমেরির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সেনতিনেল ইউনিটকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু মঙ্গলবার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের ঘোষণা দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, সেনতিনেল বাহিনীর সদস্যদের মূলত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার স্থির নিরাপত্তায় নিয়োজিত করা হবে। এতে পুলিশ ও জেন্ডারমেরির সদস্যরা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ এবং সহিংসতা মোকাবিলায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
রয়টার্সের ২০ ও ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদন এবং এএফপির বরাতে ইউরোনিউজের প্রকাশিত সংবাদেও সেনা মোতায়েনের এই পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
শনিবারের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠী ও শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো। তবে কর্মসূচিতে কতজন অংশ নেবেন এবং প্যারিসের বাইরে কতগুলো শহরে বড় জমায়েত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় সেনা
ফ্রান্সের সেনতিনেল অভিযান ২০১৫ সালে শুরু হয়। সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সংবেদনশীল এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই অভিযানের অন্যতম দায়িত্ব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, শনিবারের নিরাপত্তা কার্যক্রমে সেনতিনেল বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর বিকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট স্থানে দায়িত্ব দেওয়া হবে। এর ফলে পুলিশ ও জেন্ডারমেরির সদস্যদের জনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা সম্ভব হবে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম টিএফ১ ইনফোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা অভিযানে পুলিশের বিশেষ ইউনিট, জেন্ডারমেরির বিশেষ বাহিনী, হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও জলকামানও প্রস্তুত রাখা হবে।
তবে অতিরিক্ত কতজন সেনা সদস্য মোতায়েন হবেন, তার নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। সেনাবাহিনীকে সরাসরি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।
প্যারিসে নতুন মিছিলের পরিকল্পনা
রয়টার্সের ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি সমন্বয়ক গোষ্ঠী শনিবার প্যারিসে মিছিলের পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। প্রস্তাবিত পথ বাস্তিল থেকে অপেরা পর্যন্ত। শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোও একই দিনে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং সরকারি পরিষেবার উন্নয়নের বিষয় রয়েছে। গত সপ্তাহের বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা চলছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের আয়োজকেরা শনিবারের কর্মসূচির জন্য প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জমা দিয়েছেন। তবে কর্মসূচির চূড়ান্ত অনুমোদন, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং দেশজুড়ে আন্দোলনের বিস্তার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনো সীমিত।
বিক্ষোভ নিষিদ্ধের উদ্যোগ
শনিবারের কর্মসূচিকে ঘিরে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে ফরাসি প্রশাসন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্থানীয় প্রশাসনকে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে ফরাসি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট শহর বা এলাকায় বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হলে তা পুরো ফ্রান্সে সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ নয়। একইভাবে, নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউ জারি হলে সেটিও সংশ্লিষ্ট এলাকার জন্য প্রযোজ্য হবে।
গত সপ্তাহের সহিংসতার পর চাপের মুখে সরকার
গত ১৭ অক্টোবর
জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবাসংক্রান্ত
অসন্তোষের প্রতিবাদে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়। অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু এলাকায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সহিংসতার পর সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু আগের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। এরপর শনিবারের কর্মসূচিতে নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েন ও কার্যক্রমের ধরন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেনা মোতায়েনের অর্থ কী?
ফ্রান্সে সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও বিষয়টি সামরিক শাসন বা দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির সমতুল্য নয়। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেনতিনেল বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে, যাতে পুলিশ ও জেন্ডারমেরি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বেশি সদস্য নিয়োজিত করতে পারে।
শনিবারের কর্মসূচি কতটা বড় হবে, পরিস্থিতি নতুন করে সহিংস হয়ে উঠবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত নির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা।
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশিদের স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা, গণপরিবহন চলাচল এবং বিক্ষোভসংক্রান্ত ঘোষণার দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় জমায়েত বা চলাচলে বিধিনিষেধ থাকবে, সেখানে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
