স্থানীয় সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের অভিযানের পর থেকেই আলোচনায় গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর মাদকের আস্তানা। রেললাইনের পাশের ঝুপড়ি ঘর, আশপাশের ভবন, ছাদ ও অলিগলিতে প্রকাশ্যেই চলছে মাদক কেনাবেচা ও সেবন। জায়গাটি যেন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের সাম্রাজ্য। এখানে প্রবেশ করা, ছবি তোলা, ভিডিও করা এক প্রকার নিষিদ্ধ। অপরিচিত কেউ ঢুকলেই পড়তে হয় মাদক ব্যবসায়ীদের রোষানলে। মাদক ব্যবসায়ীরা সংঘবদ্ধ। তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে স্থানীয়রা কেউ কথা বলার সাহস পান না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা সাময়িক তৎপরতা- কোনো কিছুতেই থামছে না এই কারবার। অভিযান শেষে বাহিনীর সদস্যরা এলাকা ছাড়তেই আবারো পুরনো চিত্র ফিরে আসছে।
বুধবার দুপুর ১টা। রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ রেলক্রসিংয়ের পাশে কয়েকটি চায়ের দোকান। সেখানে বসে চা খাচ্ছেন বেশ কিছু পথচারী। প্রথম দোকানটির পাশেই ছোট একটি ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী। কিছুক্ষণ পর রিকশায় চড়ে সেখানে আসেন দুই যুবক। আশপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। ওই নারীর কাছাকাছি গিয়ে কানে কানে কিছু বলেন। এরপর হাতে টাকা তুলে দিতেই পার্স থেকে ইয়াবা ও গাঁজার পোঁটলা বের করে দেন ওই নারী। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করতেই দেখা যায়, ওই নারীর সঙ্গে আরও একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি মাদক বিক্রিতে জড়িত। কিছুক্ষণ পর পর রিকশায় করে লোকজন আসছেন, তাদের হাতে টাকা দিচ্ছেন, বিনিময়ে নিয়ে যাচ্ছেন মাদক। মাদক বিক্রির এই লেনদেন চলছে সবার চোখের সামনেই, প্রকাশ্য দিবালোকে। পার্সের মাদক শেষ হলেই রাস্তার পাশের ময়লার স্তূপে যাচ্ছেন দু’জন মাদক বিক্রেতা। এরপর সেখান থেকে পলিথিন ও শপিং ব্যাগে করে লুকিয়ে রাখা মাদক পার্সে নিচ্ছেন। আবার বড় গ্রাহককে সরাসরি ওখান থেকে দিচ্ছেন। ক্রেতা এলে সে স্তূপ থেকে ময়লা সরিয়ে মাদক বের করে তুলে দিচ্ছেন তিনি। বুধবার সরজমিন জনসমাগমপূর্ণ এই এলাকায় এভাবেই চলছে মাদকের প্রকাশ্য কারবার।
কিছুক্ষণ পর প্রতিবেদক রেললাইন ধরে ঘুণ্টিঘর রেলস্টেশনের দিকে হাঁটতে থাকেন। যেখানে গত সোমবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের পাশে ঝুপড়ি ঘর ও রেললাইন সংলগ্ন বাড়ির ছাদে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মাদক। প্রায় দুইশত মাদকসেবী বসে আছে রেললাইনের পাশে। অপরিচিত কাউকে দেখলে তেড়ে আসছেন তারা। একটু পর এ প্রতিবেদককে দু’জন সামনে যেতে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ভাই সামনে যাইয়েন না সামনে গেলে বিপদ হতে পারে। কিছুটা সামনে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির ছাদ থেকে নিচে মাদক ছুড়ে দেয়া হচ্ছে। নিচে থাকা ব্যক্তিরা টাকা দিয়ে তা সংগ্রহ করছেন। আবার অনেকে আশেপাশে অবস্থান নিয়ে অপরিচিত কেউ রেললাইন ধরে হাঁটলে ফোনে সতর্ক করে দিচ্ছেন মাদক ব্যবসায়ীদের। সেদিকে তাকাতেই একজন মধ্যবয়স্ক পথিক বলে বসলেন, ওদিকে তাকাইয়েন না।
ওদিকে তাকানো নিষেধ। এর মধ্যেই এক যুবক মোবাইল ফোন বের করে হাঁটছিলেন। তার হাতে ফোন দেখেই তিনজন যুবক তেড়ে যান। সবার বয়স ১৮ থেকে ২০। এ সময় ওই যুবককে আটকে একজন বলেন, ‘ভিডিও করছিস?’ যুবকটি বলেন, ‘না, আমি ফোনে সময় দেখছিলাম।’ এরপর আরেকজন মাদকসেবী বলেন, ‘ভিডিও করিস? সাংবাদিক? মন্ত্রী হারিয়ে গেছে। আর তুই সাংবাদিক কি করবি?’ একটু সামনে এগোতেই দেখা যায়, রেললাইনের পাশের ঝুপড়ি ঘরগুলোতেও চলছিল মাদকসেবন। এ সময় কয়েকজন ফটোগ্রাফার যেতে চাইলে সেখানে যেতে নিষেধ করা হয়। এমনকি সামনে গেলে হামলা ও ক্যামেরা ভাঙচুর করা হবে বলে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া হয়। মাদকসেবীদের অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, জায়গাটি যেন তাদের সাম্রাজ্য।
এদিকে দয়াগঞ্জ রেলক্রসিংয়ের পাশে একটি চায়ের দোকানে এসে চা খাচ্ছেন কয়েকজন পথচারী। তার পাশেই দুই যুবক একটি গাছের নিচে প্রকাশ্যে দিবালোকে মাদকসেবন করছেন। একটু পর পুলিশের গাড়ি এলে মাদকসেবন বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকেন তারা। পুলিশের গাড়ি চলে যাওয়ার পর আবারো শুরু হয় মাদকসেবন। দয়াগঞ্জ সেতুসংলগ্ন এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক সোবহানের সঙ্গে। তার ভাষ্য, ঘুণ্টিঘর পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আশপাশেই পাওয়া যাবে মাদক। সোবহানের কথায়, এ এলাকায় হাত বাড়ালেই মাদক মেলে। কিছু কিছু জায়গায় পুলিশের ভয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সহজে প্রবেশ করতে পারেন না বলেও দাবি করেন তিনি। স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী জাহিদ হোসেন বলেন, এ এলাকায় হাত বাড়ালেই মেলে মাদক। কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না। রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় সব মাদক ব্যবসায়ী। গত সোমবারের অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অভিযানে কয়েকজনকে আটক করা হলেও পরদিন আবার মাদক কেনাবেচা শুরু হয়েছে। এতে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক হোসেনের ভূমিকার পক্ষেও মত দেন তিনি। তিনি বলেন, ইশরাক ভাই সেদিন ঠিক কাজই করেছেন।
ঘুণ্টিঘর রেললাইন সংলগ্ন দীননাথ সেন রোডে কথা হয় স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইশরাক ভাই এসে সবাইকে দৌড়ানি দিয়েছিল। এরপর উনি যাওয়ার পর আবার বিক্রি শুরু হয়। নামাপাড়ার দিকে মাদক বেশি বিক্রি হয়। স্থানীয় কারা শেল্টার দেয় এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা কারও নাম বলতে পারবো না। পরে এসে আমাদের ওপর হামলা করবে। প্রশাসন আসলে ওরা চলে যায়, আবার প্রশাসনের লোক চলে গেলে আবার বিক্রি শুরু করে। ওরা অনেক সংঘবদ্ধ। তাদের কেউ কিছু করতে পারে না। আমরা এর থেকে পরিত্রাণের উপায় চাই। পুরো এলাকা তারা নষ্ট করে ফেলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের উৎস, সরবরাহকারী ও কারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হচ্ছে না। অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরে আবারো আগের চিত্র ফিরে আসে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, মাদকের সহজলভ্যতা তরুণদের একটি অংশকে আসক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। পাশাপাশি মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহের উৎস শনাক্ত, কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়ারও প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে গত সোমবার গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর রেলস্টেশন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে অন্তত ১৫ জনকে আটক করে কারাদণ্ড ও জরিমানা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও এসআরবি-১০। মঙ্গলবারও প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও সেবনের খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করে পুলিশ। এর আগে গত ১৭ই অক্টোবর ওই এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে নিজের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় আলোচনায় আসেন ইশরাক হোসেন। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে সোমবার দুপুরে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, এসব এলাকায় মাদকসেবী ও কারবারিদের অনেকে ভাসমান। তারা হঠাৎ এসে মাদক কেনাবেচা বা সেবন করে আবার চলে যান। অভিযানের সময় যাদের পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু অভিযান শেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চলে গেলে আবারো অনেকে সেখানে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, রেলস্টেশনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। সীমিত জনবল দিয়ে একসঙ্গে অনেক এলাকা নজরদারিতে রাখতে হয়। ফলে একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অন্য এলাকায় দায়িত্ব পালনে গেলে আগের এলাকায় আবারো মাদকসেবী ও কারবারিদের আনাগোনা শুরু হতে পারে। এ প্রসঙ্গে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির মানবজমিনকে বলেন, এসব এলাকায় মাদকসেবী ও কারবারিদের অনেকে ভাসমান। তারা হঠাৎ এসে মাদক কেনাবেচা বা সেবন করে আবার চলে যান। আমরা তাদের গ্রেপ্তার করার পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার এখানে মাদক কারবারে লিপ্ত হয়। তাই তাদের নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমি এখানে জয়েন করার পর এখন পর্যন্ত মাদকের ৫৯টি মামলা হয়েছে। ১ হাজার ২৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৮ হাজার ২৪১ পিস ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, অস্ত্রসহ বিভিন্ন মাদক জব্দ করা হয়েছে। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত আছে। স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে ওসি বলেন, বর্তমানে পূজার ডিউটি থাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ ফোর্স এ এলাকায় মোতায়েন করা যাচ্ছে না। পূজা শেষে সেখানে স্থায়ীভাবে ২ ভ্যান পুলিশ মোতায়েন করা হবে। আশা করি পুরো এলাকাটি আমরা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবো।
