লাইসেন্স নেই, পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেয়ার পরও চলছে রিসোর্টের ব্যবসা। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী ও পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় গড়ে ওঠা হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। মেরিন ড্রাইভের ২০০টির বেশি স্থাপনাকে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকায় নোটিশ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৫০টি স্থাপনার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। অথচ এসব স্থাপনার মধ্যে অনেকগুলোই পর্যটকদের আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা নিয়ে মাসের পর মাস ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অনুমোদন ও নিরাপত্তার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এসব স্থাপনা কীভাবে চালু রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইনানী ও পাটুয়ারটেক এলাকায় একাধিক রিসোর্ট মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে ২০০টির বেশি হোটেল, কটেজ ও রিসোর্ট চালু রয়েছে। এসব স্থাপনার অনেকগুলো কাঠ, বাঁশসহ দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। ফলে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক স্থাপনায় প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। অনুমোদন নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন না করেই কিছু প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নোটিশ দিয়েও বন্ধ হয়নি কার্যক্রম:
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভের ২০০টির বেশি স্থাপনাকে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকায় সতর্কতামূলক নোটিশ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ইনানীর পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্তরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টও ছিল। গত ১১ই জুন পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেয় ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু এরপরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালু ছিল।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, গত জুনে টুপটুপ রিসোর্টকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু মালিকপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। তিনি বলেন, কাঠের স্থাপনায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের রিসোর্টে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। টুপটুপ রিসোর্টে এসব ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল এবং ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। ইনানীর এ ধরনের অনেক রিসোর্টের অনুমোদন নেই বলেও জানান তিনি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নোটিশ দেয়াসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
২৫০ স্থাপনায় পরিবেশ ছাড়পত্র নেই:
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানিয়েছেন, মেরিন ড্রাইভের প্রায় ২৫০টি স্থাপনার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। টুপটুপ রিসোর্টেরও কোনো ছাড়পত্র ছিল না। এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেনি বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে এক হাজারের বেশি স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনার অনুমোদন যাচাইয়ের কাজ চলছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, টুপটুপ রিসোর্ট নির্মাণে কউকের অনুমোদন নেয়া হয়নি। অন্যান্য স্থাপনার কাগজপত্রও যাচাই করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলে পরবর্তী নোটিশ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযানের পদক্ষেপ নেয়া হবে।
রিসোর্টের সঠিক হিসাব নেই প্রশাসনের কাছে:
ইনানীতে ঠিক কতোটি হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে- তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই উপজেলা প্রশাসনের কাছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানান, এসব স্থাপনার নির্মাণ ও পরিচালনার বিষয়টি জেলা প্রশাসনের বাণিজ্য শাখা, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও কউকের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি জানান রিসোর্টগুলোর সঠিক তালিকা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টে পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টি জেলা প্রশাসনের উদাসীনতার পরিচয়। কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়া হয়। অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব বেলাল আবেদিন বলেন, পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ১০ জনের মৃত্যুর পর শুধু একটি রিসোর্টের অনুমোদনহীনতার কথা বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না।
নোটিশ দেয়ার পরও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ না হওয়া এবং বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও ছাড়পত্রের ঘাটতি- দু’টি বিষয়ই এখন সামনে এসেছে। নোটিশ পাওয়া স্থাপনাগুলোর কতোটি নিয়ম মেনেছে, কতোটি এখনো অনুমোদনহীন অবস্থায় চলছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে- তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে। পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সতর্কবার্তা নয়, নিয়মিত তদারকি ও আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
