প্রথম আলো
‘চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে, ৩ বছরে ৫৪ জনের মৃত্যু’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে উন্নত চাকরির আশায় রাশিয়ায় যান লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। দেশটিতে গিয়ে তাঁর ঠাঁই হয় যুদ্ধের ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধে পাঠানোর আগের দিন দেশে থাকা ছোট ভাই মো. রনিকে ফোন করে মামুন বলেন, ‘যুদ্ধে পাঠিয়ে দিচ্ছে, আর দেখা না-ও হতে পারে। দুনিয়ায় দেখা না হলে দেখা হবে হাশরের মাঠে।’
প্রথম আলোকে কথাগুলো বলছিলেন মামুনের বাবা আবদুল মজিদ। তিনি বলেন, যুদ্ধে নেওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। পরে তাঁর সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া আল আমিনকে আবার ফোন করেন রনি। আল আমিন জানান, মামুন মারা গেছেন। এরপর গ্রামে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়। কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় লোকজন এসে জানাজা না পড়ে মোনাজাত করেন। এরই মধ্যে পাঁচ মাস পার হয়ে গেছে। ঋণগ্রস্ত পরিবার এখন অসহায় হয়ে পড়েছে। এক বছরের একটি ছেলেশিশুকে নিয়ে মামুনের স্ত্রীর সামনে শুধুই অন্ধকার।
ভালো বেতনে চাকরির আশায় গত ৭ মে ঢাকা থেকে মামুনসহ ৩০ জন বাংলাদেশি যান রাশিয়ায়। কিন্তু সেখানে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ১৬, ৮ ও ৬ জনের গ্রুপে ভাগ করে তাঁদের যুদ্ধে পাঠানো হয়। তাঁদের অনেকেই ১২ ও ১৩ জুনের দিকে মারা যান। দুজন হাসপাতালে ভর্তি হন, পরে পালিয়ে দেশে ফেরেন। এদের একজন নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেন ও আরেকজন ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। তাঁরা অন্যদের মৃত্যুর তথ্য প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
কয়েক বছর ধরেই রাশিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তাঁদের অনেকেই প্রতারিত হয়ে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে তাঁদের মরদেহ পাওয়া যায় না। কাগজে–কলমে নিখোঁজ বলা হলেও পরিবার জানে, তাঁরা মৃত। এখন পর্যন্ত গত তিন বছরে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে প্রথম আলো। যদিও বর্তমান সরকার রাশিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
প্রথম আলোকে আদনান বলেন, যুদ্ধে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে না রাশিয়া। মরদেহও আনে না। যুদ্ধের সম্মুখসারি থেকে কেউ না ফিরলে তাঁকে নিখোঁজ বলে দেয়। কিন্তু নিখোঁজ মানেই মৃত্যু। এ ছাড়া না ফেরার আর কোনো কারণ নেই।
যুদ্ধক্ষেত্রে পেটে স্প্লিন্টার নিয়ে মস্কোর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আদনান। তাঁর তিন দফা অস্ত্রোপচার করা হয়। দেড় মাস বিছানা থেকে উঠতেই পারেননি। টানা দুই মাস হাসপাতালে কাটানোর পর পালিয়ে দূতাবাসে যান। এরপর ট্রাভেল পাস (ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র) নিয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।
রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস বিভিন্ন সময়ে যাচাই–বাছাই ছাড়া কর্মী পাঠানো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। গত ২৫ মে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দূতাবাসের শ্রম উইং থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সি জাবালে নূর গত ৫ মে ৭০ জন কর্মী পাঠানোর অনুমতি চাইলেও সত্যায়ন করেনি দূতাবাস। প্রাথমিকভাবে আর এস ইন্টারন্যাশনালকে ১০ জন কর্মী নিয়ে আসার কথা বলা হলেও সন্দেহ তৈরি হলে তা স্থগিত করা হয়। এরপর ১৮ মে এক কর্মীর পরিবার থেকে ফোন করে দূতাবাসে জানানো হয়, জাবালে নূর ও আর এস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে রাশিয়ায় এসেছে ৩০ জন, যাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, দুটি এজেন্সি সত্যায়ন করাতে না পারায় টিএস ওভারসিজের নামে কর্মীদের পাঠিয়েছে। দূতাবাসের অনুমতি ছাড়া কর্মী পাঠানোর বিষয়টি যাচাই করতে বলা হয়েছে চিঠিতে। আর কর্মীদের যুদ্ধে না পাঠিয়ে নিয়োগপত্র অনুসারে কাজে ফিরিয়ে আনতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চার–পাঁচ মাস ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ ও নিহত বাংলাদেশিদের তথ্য দূতাবাসকে জানাচ্ছে রাশিয়ার সরকার। এখন পর্যন্ত ৪০ জনের তথ্য জানিয়েছে তারা। যদিও এর মধ্যে নিহত কতজন, নিখোঁজ কতজন; তা আলাদা করে বলেনি তারা। সবশেষ ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে দেশটির পক্ষ থেকে এখনো কিছু জানায়নি। যুদ্ধে কেউ মারা গেলে বা ছয় মাসের বেশি নিখোঁজ থাকলে ক্ষতিপূরণ দাবির সুযোগে আছে। কিন্তু রাশিয়া থেকে ক্ষতিপূরণ নিতে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা, উত্তরাধিকারের রাশিয়ায় গিয়ে অন্তত ছয় মাস থাকাসহ বেশ জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আর মরদেহ উদ্ধার করা যায় না। রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে নিয়মিত আলোচনা চলছে।
রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী নিজে থেকেই যুদ্ধে যান। সবশেষ ৩০ জনের বিষয়েও রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে গিয়েছেন। এর লিখিত প্রমাণ আছে রাশিয়ার কাছে। আর রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ মরদেহ হস্তান্তর করছে না, তাই দেশেও পাঠানো যাচ্ছে না।
ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি সংগঠন গত মার্চে জানায়, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে সে সময় পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। আর ১৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, ৩০ জন বাংলাদেশিকে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে জুনে যুদ্ধে পাঠানো হয়। তাঁদের অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে এসআরবি।
আহত হয়ে দেশে ফেরত আসা দুজন এবং আরও ছয়জনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলছেন, জুনে যুদ্ধে পাঠানোর আগেই পরিবারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন কর্মীরা। পরিবারের পক্ষ থেকে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দায়িত্ব নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এরপর জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকেই তাঁরা নিখোঁজ হতে থাকেন। মারা যাওয়ার খবর পেলেও কোনো প্রমাণ পায়নি। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত বিদেশিদের মরদেহ উদ্ধার করা হয় না, মাঠেই ফেলে রাখে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব নেয় কল্যাণ বোর্ড। মৃত্যুর পর কর্মীর পরিবার থেকে আবেদন করতে হয়। কর্মী যদি দেশ থেকে বিএমইটি ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গিয়ে থাকেন বা বিদেশে যাওয়ার পর দূতাবাস থেকে মেম্বারশিপ নিবন্ধন নেন; তাহলে তাঁর মরদেহ আনার খরচ বহন করে কল্যাণ বোর্ড। এর কোনোটি না থাকলেও বোর্ডে আবেদন করতে পারে পরিবার। সে ক্ষেত্রে বোর্ড থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে মরদেহ দেশে আনতে খরচ দেওয়া হয়, এটি প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ থাকে।
দেশে আসা প্রতিটি মৃতদেহ দাফনে ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয় কল্যাণ বোর্ড। এরপর ৩ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এর বাইরে এখন জীবনবিমার সুবিধা পায় কর্মীর পরিবার। আর বিদেশে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি থাকলে তা দূতাবাসের মাধ্যমে আদায় করে দেওয়া হয়। মৃত কর্মীর বকেয়া থাকলে তা-ও আদায়ের উদ্যোগ নেয় দূতাবাস। কিন্তু রাশিয়া থেকে মরদেহ আনার কোনো আবেদন এখন পর্যন্ত কল্যাণ বোর্ডে আসেনি। মৃত্যুর প্রমাণ না থাকায় কেউ আবেদন করতে পারছেন না। ফলে কেউ কোনো ক্ষতিপূরণও পাচ্ছেন না।
এসআরবি, গোয়েন্দা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যাঁরা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছেন, আসলে তাঁরা কেউ যুদ্ধের জন্য যোগ্য নন। যুদ্ধের জন্য শারীরিক সামর্থ্য, প্রশিক্ষণ বা কৌশল—কোনোটাই তাঁদের নেই। মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের সামনে পাঠিয়ে একধরনের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যখন প্রতিপক্ষ তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা করে, তখন শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে রাশিয়ার সেনারা। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এটি এসআরবিও নিশ্চিত হয়েছে। জীবন বাঁচাতে সুযোগ পেলে কেউ কেউ পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন।
এসআরবি জানিয়েছে, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজের কথা বলে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে ১৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বাংলাদেশি ওই ৩০ জনের মধ্যে একজন হলেন মো. পলাশ শেখ। যুদ্ধে গিয়ে পলাশ প্রথম দফায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সুস্থ হয়ে দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধে গিয়ে হাত হারান। এখন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পলাশ শেখ চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত হয়েছেন, ২২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ে বলেও কোনো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। সেনা পাহারা থাকায় হাসপাতাল থেকে পালাতেও পারছেন না। ১০ লাখ টাকা খরচ করে পাঠালেও কোনো টাকাপয়সাও পায়নি পরিবার।
নিখোঁজ স্বজনকে ফিরিয়ে আনতে গত জুলাইয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আলাদা করে জমা দেওয়া ২৮টি চিঠি প্রথম আলোর হাতে এসেছে। এসব চিঠিতে বলা হয়, উন্নত জীবনের আশায় কর্মসংস্থানের জন্য দালালের মাধ্যমে রাশিয়া যান তাঁরা। খিলক্ষেতের জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল ও আশুলিয়ার আর এস ইন্টারন্যাশনাল তাদের রাশিয়া পাঠায়। উচ্চ বেতনের প্রলোভনে তাঁদের নিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তাঁদের যুদ্ধে নেওয়ার প্রস্তুতি শেষ করা হয় এবং যেকোনো সময় যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য করা হতে পারে। দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে অনুরোধ করা হয় চিঠিতে। তাঁরা আর্থিক সহায়তারও আবেদন জানান সরকারের কাছে।
গত ৭ মে ৩০ জনের দলে রাশিয়া যান ২১ বছর বয়সী ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। উচ্চ বেতনের চাকরির লোভে দালালকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে গেলেও পাননি চাকরি। চার দিন হোটেলে রাখার পর একটি কাগজে সই নিয়ে পাঠানো হয় সেনাক্যাম্পে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে আরও পাঁচ বাংলাদেশির সঙ্গে তাঁকেও পাঠানো হয় যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। ড্রোন হামলায় মারা যান চারজন। তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, সেখান থেকে পালিয়ে দেশে আসেন।
রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার হয়ে উঠেছে। মূলত ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশটিতে কর্মী পাঠানো বাড়তে শুরু করে। এ সুযোগে একটি চক্র বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পাঠাচ্ছে। নিয়মিত কেউ কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসছেন। কেউ কেউ সেখানেই মারা যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন। তবু কমছে না রাশিয়া–যাত্রা। যুদ্ধে গিয়ে ছয় মাস থাকতে পারলে রাশিয়ার নাগরিকত্বের সুযোগ, মাসে বেতন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। এ কারণে অনেকে নিজ থেকেই যুদ্ধে যাচ্ছেন।
বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে রাশিয়া যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন মাত্র ৩৭ জন। পরের বছর এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৫ জনে। ২০২৫ সালে দেশটিতে যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৪ হাজার ৭২৫ জন। এক বছরেই রাশিয়া যাওয়া তিন গুণের বেশি বেড়েছে। এ বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত রাশিয়ায় যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ১০৫ জন।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মানব পাচারে অভিযুক্ত এজেন্সি সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠাচ্ছে রাশিয়ায়। কতজন গিয়ে কাজ পেয়েছেন, বাকিরা কোথায় আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই। মৃতদেহও পায় না পরিবার, পায় না কোনো ক্ষতিপূরণ। কতজন মারা গেছেন, সেটাও কেউ জানে না। হটলাইন চালু করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির পরামর্শ দেন তিনি।
২৭% কর্মী পাঠিয়েছে একটি এজেন্সি
প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, গত চার বছরে এখন পর্যন্ত রাশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ৯৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এসআরবির অভিযুক্ত তিনটি এজেন্সির মধ্যে টিএস ওভারসিজ নামের একটি এজেন্সি ২৬৬ জনের নামে ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকি দুটির নাম বিএমইটি ডেটাবেজে পাওয়া যায়নি। রাশিয়া পাঠাতে সবচেয়ে বেশি ছাড়পত্র নিয়েছে বন্যা বিজয় ওভারসিজ। এরা একাই পাঠিয়েছে ২৭ শতাংশ কর্মী, যা প্রায় আড়াই হাজার। এই এজেন্সির বিরুদ্ধে আলজেরিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে পাচারের অভিযোগ আছে। মানব পাচারের মামলাও আছে। রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামেও অভিযোগ আছে। সব মিলে শতাধিক কর্মীর ছাড়পত্র নিয়েছে মাত্র ১৭টি এজেন্সি।
৩০ কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত জাবালে নূর, টিএস ওভারসিজ ও আরএস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠানো বন্যা বিজয়ের সার্ভার বন্ধ (লক্ড) করে দেওয়া হয়েছে। তারা নতুন করে আর ছাড়পত্র নিতে পারছে না। এসব এজেন্সি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসা করে আসছে।
বন্যা বিজয় ওভারসিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরুণ দেবনাথের সঙ্গে কথা বলতে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিএমইটির তথ্য বলছে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৭১ জন কর্মীর ছাড়পত্র নিয়েছে সরকারি এজেন্সি বোয়েসেল। এ কোম্পানির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা রাশিয়ার তিনটি কোম্পানিতে কর্মী পাঠাচ্ছিলেন। এর মধ্যে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এক কর্মী গিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান। একজন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এরপর দুটি কোম্পানি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। আর একটি কোম্পানিতে এখনো যাচ্ছে, তাদের পুরোনো চাহিদাপত্র অনুসারে আরও ১৪ জনের রাশিয়া যাওয়া বাকি আছে। তবে এক বছর ধরে নতুন কোনো চাহিদাপত্র পায়নি বোয়েসেল।
রাশিয়ায় শ্রম অভিবাসন নিয়ে গত বছরের নভেম্বরে একটি গবেষণা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশন কর্মসূচি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোট কতজন বাংলাদেশি জড়িয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন কিংবা কতজন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই। প্রতারণার প্রক্রিয়া শুরু হয় বাংলাদেশ থেকেই। বৈধ ভিসা, চাকরির চুক্তি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েই দেশ ছেড়েছিলেন তাঁরা। ওখানে নেওয়ার পর যুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাশিয়ায় বাংলাদেশিদের পাচারের অভিযোগে অন্তত ছয়টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি সূত্র।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কর্মীদের এভাবে যেতে নিরুৎসাহিত করছে সরকার। নিশ্চিত চাকরির তথ্য যাচাই-বাছাই ও সত্যায়ন না করে কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। অনেকে বিভিন্ন দেশ হয়ে নানাভাবে যাচ্ছেন। সব দূতাবাসকে সতর্ক করা হয়েছে, প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নজরদারি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাঁরা মারা গেছেন বলে পরিবার খবর পেয়েছে; তাঁদের মরদেহ খুঁজে বের করা কঠিন কাজ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘তিন কোটি টাকার মাছ ছাড়তে খরচ ৪৫ কোটি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাছের পোনা কিনতে ব্যয় হবে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা (প্রায় ৩ কোটি)। অথচ সেই পোনা বাঁওড়ে ছাড়তে খরচ হবে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ পোনা কেনার তুলনায় অন্যান্য খাতে ১৫ গুণ বেশি ব্যয় হবে। সহজভাবে বললে, এক টাকার পোনার বিপরীতে ১৫ টাকা খরচের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে মৎস্য অধিদপ্তরের ‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পে। যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ২৯টি বাঁওড়ে মাছের উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়াতে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির নানা খাতের ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। নাম প্রকাশ না করে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাঁওড়ে (নদীর পরিত্যক্ত বাঁক থেকে সৃষ্ট জলাশয়) মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এর জন্য এসি, কম্পিউটারসহ যেসব ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে সেটা অস্বাভাবিক। এতে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পোনা কেনার বাইরে এত বিপুল ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে এসব খাতের অবদান কতটা, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৪টি কম্পিউটার কিনতে ৮ লাখ টাকা : প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাবে ৪টি কম্পিউটার কেনার জন্য ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিটি কম্পিউটারের গড় দাম দুই লাখ টাকা। এছাড়া এসি ও ফটোকপি মেশিন কেনা, অফিস ভাড়া এবং সভা-সেমিনার আয়োজনের ব্যয়ও রয়েছে এতে। তবে কম্পিউটারের কনফিগারেশন, যন্ত্রাংশ ও কেনাকাটার শর্ত না থাকায় এর দাম বাজারদরের তুলনায় বেশি কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ফলে এসব সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা, ব্যবহারকারী এবং ব্যবহারের পরিকল্পনা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
একইভাবে অফিস ভাড়া ও সভা-সেমিনারের জন্য মোট কত টাকা বরাদ্দ রয়েছে এবং এসব ব্যয় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা জানতে চাওয়া হবে মূল্যায়ন কমিটির বৈঠকে।
পোনার পেছনে ব্যয় ৬ শতাংশ : প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব অনুযায়ী, মোট ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার মধ্যে পোনা কেনার জন্যই রাখা হয়েছে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বাকি ৪৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে অন্যান্য খাতে। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৬ দশমিক ১০ শতাংশ পোনা কেনার জন্য, বাকি ৯৩ দশমিক ৯০ শতাংশ অন্যান্য খাতে।
প্রকল্পের আওতায় ২৯টি বাঁওড়ে রুই ও দেশি ছোট প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে মাছের উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এসব বাঁওড়ে বর্তমানে বছরে কত মাছ উৎপাদিত হয়, উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়লে অতিরিক্ত কত মাছ পাওয়া যাবে এবং এ লক্ষ্য নির্ধারণের ভিত্তি কী, তার বিস্তারিত বলা হয়নি। একই সঙ্গে কত পোনা কেনা হবে, প্রজাতিভেদে পোনার সংখ্যা ও দাম কত এবং অবমুক্ত করা পোনার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠা কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, সেসব তথ্যেরও ঘাটতি রয়েছে।
৬ পদে জনবল : প্রকল্প বাস্তবায়নে ৬টি পদে জনবল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি পদে প্রেষণে, একটি পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে এবং ২টি পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, এসব পদে দায়িত্ব কী হবে, জনবল বাবদ মোট কত টাকা ব্যয় হবে এবং তাদের কাজের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কী ধরনের ফল পাওয়া যাবে, তা প্রকল্পের ব্যয় মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ৫ বছর মেয়াদি প্রকল্পে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
এডিপিতে বরাদ্দ নেই: প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। অর্থাৎ এখনো প্রকল্পটির জন্য এডিপিতে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়নি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১ অক্টোবরের চিঠি অনুযায়ী, প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এর আগে ৬ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে প্রকল্পটি নিয়ে যাচাই কমিটির সভা হয়। পরে ২২ এপ্রিল অর্থ বিভাগে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় প্রকল্পের জনবল নির্ধারণ নিয়ে সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশ ডিপিপিতে যুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক বলেন, এখনো ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) দেখেননি। না দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাহেদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। সাহেদ আলী প্রস্তাবিত প্রকল্পটি তৈরি করেছেন। তবে সাহেদ আলীর মুঠোফোনে কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাই তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কালের কণ্ঠ
‘মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদন বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের প্রতি ব্যারেলের দাম ১.৫ শতাংশ বেড়ে ১১১.২৭ ডলারে দাঁড়ায়।
গত পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডাব্লিউটিআই) দামও ২ শতাংশ বেড়ে ১০০.৬০ ডলারে ওঠে। পরে দিনের এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড ও ডাব্লিউটিআইয়ের দাম কমে ১০৯.২৭ ও ৯৮.৪৬ ডলারে নেমে আসে।
চলতি বছরের মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে উঠেছিল।
তবে জুনের শেষে ৭৩ ডলারে নেমে আসে। এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতে শুরু করে। তবে জুলাই থেকে ওই অঞ্চলে আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসায় বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। এর পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প-কারখানার উৎপাদন খরচেও চাপ তৈরি হতে পারে। তেল সরবরাহে পরবর্তী বড় ধরনের ধাক্কাটা আসতে পারে সৌদি আরব থেকে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে চলমান সংঘাত এ সপ্তাহের তেল সরবরাহ পরিস্থিতির মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাদের হামলার পরিধি কেবল অবকাঠামোগত স্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে শাইবাহ তেলক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। এতে ঝুঁকিটা এমন হয়েছে যে সৌদিকে হয়তো তাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু তেল উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে।
বিশ্ববাজারভিত্তিক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, তেলবাহী ট্যাংকারে ধারাবাহিক হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি প্রায় যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন করে হামলার পর সরবরাহ আবারও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে কেপলার জানায়, পারস্য উপসাগর থেকে দৈনিক গড়ে তেল সরবরাহ কমে ৮৫ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও দৈনিক সরবরাহের পরিমাণ ছিল দুই কোটি ব্যারেলের বেশি।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় তেলের দাম বাড়ছে। অনিশ্চয়তার কারণে বাজারে তেলের দামের সঙ্গে ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হচ্ছে। তেল পরিবহনে ট্যাংকারের ভাড়া রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিও বেড়েছে। বিশ্লেষক ওয়ারেন প্যাটারসন ও ইওয়া মান্থের মতে, তেল সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত মূল্য ধীরে ধীরে কমে যেত। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির তেমন উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘ডেঙ্গু সংক্রমণ ২৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের প্রথম সাড়ে ৯ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০০০ সালে ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর সংক্রমণের হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ভাইরাসজনিত এই রোগে প্রাণ গেছে ৩৫৭ জনের। মৃত্যুর দিক থেকে ২৬ বছরের মধ্যে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ।
সংক্রমণের এই হিসাব শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের। ফলে উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া, পরীক্ষা না করানো কিংবা হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের সংখ্যা এতে অন্তর্ভুক্ত নেই। প্রকৃত সংক্রমণ আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই বছর প্রাণ হারান এক হাজার ৭০৫ জন। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ২০২৪ সালে, ৫৭৫ জনের।
এদিকে ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যু বাড়তে থাকলেও সরকার বলছে, এ রোগ নিয়ন্ত্রণে তাদের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই। সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার ধরন বদলানোর পাশাপাশি এডিস মশার বিস্তার ও আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। এ ছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং মশক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ ছিটানো ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চললেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রচলিত কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০০০ সালে দেশে পাঁচ হাজার ৫৫১ জন রোগী শনাক্ত হন, মারা যান ৯৩ জন। এর পর বিভিন্ন সময়ে সংক্রমণ বাড়লেও ২০২৩ সালে তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। পরের বছরগুলোতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক ছিল। ২০২৪ সালে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, মারা যান ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজার ৮৬১, মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।
ইত্তেফাক
‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় উন্নতি, কমেছে সহিংসতা’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলি ও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উন্নতি হয়েছে, একই সঙ্গে কমেছে সহিংসতা। ‘রিপোর্ট অব অ্যা ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বাংলাদেশ: পলিটিক্যাল সিচুয়েশন, অক্টোবর ২০২৬’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম (সিপিআইটি) ২০২৬ সালের ৭ জুন থেকে ১৫ জুন বাংলাদেশে একটি তথ্য-অনুসন্ধান মিশন পরিচালনা করে। এই মিশনে সরকারি কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক ও গবেষকদের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার উন্নতি ঘটেছে। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে এ পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সাধারণভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল এবং আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এতে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে।
প্রতিবেদনে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা কমার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বর্তমানে আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। তারা নিজেদের মতামত প্রকাশ ও আলোচনায় অংশগ্রহণেরও বেশি সুযোগ পাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্যে আগের সময়ের তুলনায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তারা তথ্য-অনুসন্ধান মিশনকে জানিয়েছেন, সামগ্রিকভাবে কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বড় বড় ধর্মীয় উত্সবের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তারা তুলে ধরেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা কমেছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যেসব রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা এখনো ঘটছে, সেগুলো সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। এসব ঘটনার সঙ্গে প্রায়ই স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, ব্যাবসায়িক স্বার্থ, সম্পত্তি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো জড়িত থাকে।
প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, আগের সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় গ্রেফতার হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তিকে মুক্তি ও এ ধরনের অধিকাংশ মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা হিসেবে বিবেচিত ২১ হাজারেরও বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে পুরোনো মামলাগুলো পর্যালোচনার কাজ এখনো চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, জবাবদিহি ও সংস্কারের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগের সময়ের তুলনায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে সাধারণ নাগরিকদের নিজেদের মতামত প্রকাশ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও জন আলোচনায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলি ও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির একটি চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলোর চলমান পর্যালোচনা ও প্রত্যাহারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘ঘরপোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘে ভয়’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বহুজাতিক কোম্পানিসহ দেশী-বিদেশী মৌলভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ উন্মুক্ত করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত সোমবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, উদ্যোগটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের বিকল্প সম্প্রসারণ এবং ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের অতীত অভিজ্ঞতা বিনিয়োগকারীদের মনে যে সংশয় তৈরি করেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কারণ, পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির প্রবেশের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই কোম্পানির শেয়ার কী দামে বিক্রি হচ্ছে, উদ্যোক্তারা কতটুকু শেয়ার ছাড়ছেন, উত্তোলিত অর্থের ব্যবহার কী, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কতটা ঝুঁকি নিচ্ছেন এবং তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিটির কার্যক্রম কিভাবে তদারক করা হচ্ছে- এসব প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট জবাব থাকতে হবে। অতীতে বেসরকারি কোম্পানির ডিরেক্ট লিস্টিং নিয়ে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, তার আলোকে এবার নতুন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর।
ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ ও অতীতের অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয় এবং কোম্পানির শেয়ার ইস্যু ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। অন্যদিকে, ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিমালার আওতায় কোনো কোম্পানির শেয়ার সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির সুযোগ তৈরি হয়। তবে সরাসরি তালিকাভুক্তি মানেই সব ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় শেয়ার ইস্যু, একইভাবে অর্থ উত্তোলন কিংবা আইপিওর সব ধাপ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নয়। সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও অনুমোদনের শর্তের ওপর নির্ভর করে প্রক্রিয়াটির প্রকৃত ধরন নির্ধারিত হয়।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বাইরের কোম্পানির জন্যও ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ দেয়া হয়। ২০০৮ সালে এসিআই ফরমুলেশন ও শাইনপুকুর সিরামিকস এ পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির সুযোগ পায়। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি আবার বন্ধ করা হয় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য তা সীমিত রাখা হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেসরকারি কোম্পানির জন্যও ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ আবার চালু করা হয় বলে তৎকালীন বাজারসংশ্লিষ্টদের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের খুলনা পাওয়ার কোম্পানি এবং সেবা খাতের ওশান কনটেইনার্স লিমিটেড এ পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানি দু’টিকে সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
এই তালিকাভুক্তিগুলো ঘিরে পরবর্তী সময়ে যেসব প্রশ্ন তৈরি হয়, সেগুলো শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করে। ফলে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের বিষয়টি আবার সামনে আসার সাথে সাথে অতীতের অভিজ্ঞতাও নতুন করে আলোচনায় আসছে।
খুলনা পাওয়ার: উচ্চমূল্যে তালিকাভুক্তি, পরবর্তী দরপতন : ডিরেক্ট লিস্টিং নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে খুলনা পাওয়ার কোম্পানির শেয়ারদরের দীর্ঘমেয়াদি পতনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ২২০ থেকে ৩৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শেয়ারটির দর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যে শেয়ারটির দর ৪০ টাকায় নেমে আসে এবং পরবর্তী সময়ে ৯ দশমিক ৯ টাকায় দাঁড়ায়। তালিকাভুক্তির সময় উদ্যোক্তারা কোম্পানিটির ৩০ শতাংশের বেশি শেয়ার বিক্রি করেন এবং শেয়ার বিক্রি থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেন।
ওশান কনটেইনার্সের বিলুপ্তি ও করপোরেট সুশাসনের প্রশ্ন: ওশান কনটেইনার্স লিমিটেড ২০১৩ সালে একই গ্রুপের আরেকটি কোম্পানির সাথে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে স্বতন্ত্র সত্তা হারায়। তালিকাভুক্তির অল্প সময়ের মধ্যে কোনো কোম্পানি একীভূত হয়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: একীভূত হওয়ার পরিকল্পনা তালিকাভুক্তির আগে ছিল কি না, এ-সংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, একীভূতকরণের বিনিময় অনুপাত কিভাবে নির্ধারিত হয়েছিল এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না।
বণিক বার্তা
‘নগদনির্ভর লেনদেনে বছরে ৯৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তার নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এ ধরনের লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংরক্ষণ ও যাচাই করা কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড করের আওতার বাইরে থেকে যায়
দেশে নগদ টাকায় লেনদেনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে নগদ টাকা ছাপানো, পরিবহন, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায়। ব্যাংক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাকেও নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনায় গুনতে হচ্ছে বড় অংকের পরোক্ষ ব্যয়। সব মিলিয়ে দেশে নগদনির্ভর অর্থনীতির বার্ষিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণই ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। নগদ লেনদেনের প্রকৃত ব্যয় খালি চোখে দৃশ্যমান না হলেও এর প্রভাব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরেই পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে ওপরের চিত্র উঠে এসেছে। ‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় নগদ ও ডিজিটাল লেনদেনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয় তুলনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক বিস্তার নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এ ধরনের লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংরক্ষণ ও যাচাই কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড করের আওতার বাইরে থেকে যায়। গবেষণায় ব্যবহৃত প্রাক্কলন অনুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির (শ্যাডো ইকোনমি) আকার জিডিপির প্রায় ২৭ দশমিক ২ শতাংশ। আর এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিদ্যমান করের হার প্রয়োগ করে সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি নিরূপণ করা হয়েছে।
নগদনির্ভর ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি বাদ দিলেও নগদ লেনদেনের বার্ষিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর ভোক্তাদের ২৮ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৬ হাজার ২০০ কোটি এবং ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এবং দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্যের খুচরা বিক্রেতাদের ব্যয় ৬০ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ব্যয়ের মধ্যে নগদ অর্থ পরিবহন ও সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, লেনদেনের হিসাব মেলানো এবং নগদ টাকা নিয়ে ব্যাংক বা আর্থিক সেবাদাতার কাছে যাতায়াতের মতো বিষয় রয়েছে।
গবেষণায় ভোক্তাদের নগদ টাকা ব্যবহারের খরচের মধ্যে অর্থ সংগ্রহে ব্যয় হওয়া সময়ের মূল্য প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, হাতে নগদ রাখার কারণে হারানো সুদ প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিজনিত ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়েছে। বিপরীতে ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর বার্ষিক ব্যয় মাত্র ৫ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা নগদ টাকা ব্যবস্থাপনার মোট ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম।
দেশে ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নগদবিহীন লেনদেনই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ৫০ শতাংশ লেনদেনকে নগদবিহীন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহ দিতে এরই মধ্যে প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আশা করছি এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী এবং সেবাদাতাদের মধ্যে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনে আগ্রহী করে তুলবে।’
সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি নগদ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর ব্যয়ও বিপুল। নগদ লেনদেনের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। শাখা ও এটিএম নেটওয়ার্ক পরিচালনা, নগদ টাকা সংরক্ষণ, পরিবহন, নিরাপত্তা এবং নগদ ব্যবস্থাপনায় কর্মীদের সময় ব্যয় এর অন্তর্ভুক্ত। নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যাংকগুলোকে বিপুল অবকাঠামো ও জনবল ধরে রাখতে হয়। এ অর্থ ও শ্রম উৎপাদনশীল অন্য কাজে ব্যবহার করা গেলে অর্থনীতিতে বাড়তি মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি হতো।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘বাংলাদেশি ওষুধ যাচ্ছে দেড় শর বেশি দেশে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক দশকে দেশের ওষুধশিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এখন দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওষুধে মেটে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও বাড়ছে বাংলাদেশে তৈরি ওষুধের উপস্থিতি। বর্তমানে বিশ্বের দেড় শর বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে দেশে তৈরি ওষুধ। গত পাঁচ বছরে রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য ও নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ায় রপ্তানি আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ ১৬২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার ৭৭৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ওষুধ রপ্তানি করে। এর পর থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য হারে তা বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি ৩ হাজার ২৫০ কোটি ১৭ লাখ টাকায় পৌঁছায়। ২০৩০ সালের মধ্যে ওষুধ রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা উদ্যোক্তাদের।
রপ্তানিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানি
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনের জন্য ৩২৩টি ইউনিট নিবন্ধিত রয়েছে। এর মধ্যে ২৫১টি কার্যকর রয়েছে। এ ছাড়া ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক ইত্যাদি ওষুধ উৎপাদনের আরও পাঁচ শর বেশি ইউনিট রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ রপ্তানি আয়ে শীর্ষে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি আয় ছিল ৪০৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা একমি ল্যাবরেটরিজের রপ্তানি ৪০১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। নিপ্রো জেএমআইয়ের রপ্তানি আয় ৩৭২ কোটি টাকা, চতুর্থ ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ৩১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং পঞ্চম অবস্থানে থাকা রেনাটার ২৫৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। শীর্ষ পরবর্তী পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এরিস্টোফার্মা, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস, বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং জেনারেল ফার্মাসিউটিক্যালস।
সম্ভাবনার সঙ্গে নানা প্রতিবন্ধকতা
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা ও রপ্তানির গন্তব্য বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠোর শর্তের বাজারেও বাংলাদেশি ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এ অগ্রগতি ধরে রাখতে পণ্যের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জটিল ও উচ্চমূল্যের ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কমাতে হবে কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার গড়ে তোলা এবং বিদেশে ওষুধ নিবন্ধনের ব্যয় ও জটিলতা মোকাবিলা করাও জরুরি।
ওষুধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিদেশে পেটেন্ট করা ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ উৎপাদনে বাংলাদেশ সাফল্য পেয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এই সুবিধার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি, কাঁচামাল (এপিআই) উৎপাদন ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এই খাতের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা এবং গবেষণা ও উন্নয়নে সীমিত বিনিয়োগের বিষয়টি উঠে এসেছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে বাজারভিত্তিক গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার গড়ে তোলা দরকার। বর্তমানে জৈবসমতুল্যতা পরীক্ষার জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক মান পূরণকারী পরীক্ষাগার দেশে প্রতিষ্ঠা করা গেলে ব্যয় কমবে ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে।’ অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাব্বির হায়দার রপ্তানি প্রণোদনার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন।
ওষুধশিল্পের উদ্যোক্তারা যা বলছেন
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ওষুধের গুণগত মান, গবেষণা, পণ্য উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ জরুরি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। তাঁরা মনে করেন, নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ওষুধের বাজারের আলোচনায় পিআইসি/এস এবং আরওডব্লিউ গুরুত্বপূর্ণ দুটি পরিভাষা। পিআইসি/এস হলো ওষুধের উৎপাদনের মান ও কারখানা পরিদর্শন নিয়ে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহযোগিতা ব্যবস্থা। এর অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ, অস্ট্রেলিয়ার টিজিএ ও সিঙ্গাপুরের এইচএসএ। অন্যদিকে আরওডব্লিউ বলতে নির্দিষ্ট প্রধান বাজারের বাইরে থাকা অন্যান্য বাজারকে বোঝায়। এর আওতায় এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের বাজার থাকতে পারে।
দেশ রূপান্তর
‘এলএনজি আমদানিতে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে পরিত্যক্ত সাঙ্গু’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, গ্যাস আমদানির অবকাঠামো সংকটের মধ্যে বিকল্প হতে পারে পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গুর প্ল্যাটফর্ম। সাগরের মধ্যে নতুন পাইপলাইন স্থাপন না করে পড়ে থাকা পাইপলাইনটি ব্যবহার করলে সময় ও ব্যয় দুটোই বাঁচতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা রয়েছে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরকার এলএনজি আমদানি করে এই সংকট কাটানোর চেষ্টা করছে। এখন এলএনজি থেকে দেশে দৈনিক সরবরাহ করা হয় গড়ে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। একাধিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু একটির বেশি টার্মিনাল নির্মাণ করতে হলে পৃথক পাইপলাইনও নির্মাণ করতে হবে।
মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যে গ্যাস গ্রিড রয়েছে সেখান দিয়ে এখন এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল স্থাপন করা হলে এই সঞ্চালন লাইন দিয়ে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব। এর চাইতে বেশি গ্যাস আমদানি করতে হলেই নতুন পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সাগর এবং স্থলভাগ দুই জায়গায়ই নতুন পাইপলাইন স্থাপন করা ছাড়া গ্যাস আমদানি করা সম্ভব হবে না।
কিন্তু এর বিকল্প হতে পারে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের পাইপলাইনটি। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, সাঙ্গু প্ল্যাটফর্মটির অবস্থান চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে সমুদ্রবক্ষে। সেখানে সমুদ্রের গভীরতা প্রায় ১২ মিটার। গ্যাসক্ষেত্রটির প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রসেস প্ল্যান্ট পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইন রয়েছে।
কেয়ার্ন এনার্জি সাঙ্গু ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ করার জন্য ১৯৯৬ সালে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইনটি নির্মাণ করে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নির্মাণ করা সাব-সি পাইপলাইনটি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ এই পাইপলাইনটি ব্যবহার করলে নতুন করে এলএনজি আমদানি করতে আর পাইপলাইন নির্মাণের প্রয়োজন হবে না। এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব। সাঙ্গুর প্ল্যাটফর্মটি সাগরের ৫০ কিলোমিটার ভেতরে হওয়ায় এখানে এলএনজির বড় জাহাজ ভেড়ানো কঠিন নয় বলে মনে করা হয়।
কেয়ার্ন এনার্জি ১৯৯৬ সালে সাঙ্গু ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হওয়া সাগরের একমাত্র গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গুতে মোট ১১টি কূপ খনন করে এবং ওই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে। ২০১০ সালে কেয়ার্ন এনার্জি গ্যাসক্ষেত্রটির স্বত্ব অস্ট্রেলীয় কোম্পানি সান্তোসের কাছে হস্তান্তর করে। ২০১৩ সালে বাণিজ্যিক উত্তোলনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়ায় গ্যাসক্ষেত্রটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, মহেশখালী-আনোয়ারা-ফৌজদারহাট রুটে এখন এলএনজি সরবরাহ করার জন্য দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন রয়েছে। এই দুটি পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৯১ কিলোমিটার এবং ৭৯ কিলোমিটার। এর বাইরে দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আরও একটি ৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। এ ছাড়া মহেশখালী থেকে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে আরও ৭ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব পাইপলাইন নির্মাণ করতে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। নতুন করে পাইপলাইন নির্মাণ করতে হলে আবার বিপুল পরিমাণ খরচ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের বিদ্যমান স্থাপনাকে কাজে লাগিয়েই এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তাদের যুক্তি, এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে তরল গ্যাস গ্রহণ, সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের জন্য এফএসআরইউতে যে প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংযোজনের মাধ্যমে তা অন্য ধরনের টার্মিনালেও স্থাপন করা সম্ভব। ফলে সাঙ্গুর বিদ্যমান টার্মিনালকে এ কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। বিশেষ করে, গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আগে থেকেই সাঙ্গু প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকায় নতুন করে সব স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে উপযোগী করে তোলার সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কারিগরি সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করা গেলে এসব অবকাঠামোর সমন্বয়ে সাঙ্গুকে এলএনজি গ্রহণ ও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের একটি বিকল্প কেন্দ্রে রূপ দেওয়া সম্ভব।
সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্রের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে এলএনজি সরবরাহের অন্যতম বড় সুবিধা হতে পারে বছরজুড়ে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের সুযোগ। এর অন্যতম কারণ, অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরের ‘শেল্টার্ড সি’ হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের সামুদ্রিক অঞ্চল তুলনামূলকভাবে প্রবল বায়ুপ্রবাহ, উঁচু ঢেউ ও তীব্র সামুদ্রিক স্রোতের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকে।
এ কারণে সাঙ্গু অঞ্চলে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা গেলে বড় এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল ও টার্মিনালের কার্যক্রম পরিচালনায় তুলনামূলক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিকূল আবহাওয়া ও সামুদ্রিক দুর্যোগের কারণে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে। অন্যদিকে, মহেশখালী ও পায়রা অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল এবং টার্মিনালের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও এলএনজি জাহাজ ভিড়তে না পারায় কয়েক দফা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়।
তবে সাঙ্গু অঞ্চলে বছরজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব কি না, তা নির্ধারণে ওই এলাকার সমুদ্রবিজ্ঞান, আবহাওয়াগত পরিস্থিতি, নৌযান চলাচলের উপযোগিতা এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারের পরিকল্পনা বলছে, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ২০২৬ সালের পর এলএনজির ব্যবহার বহুলাংশে বাড়বে। তাই এক্ষেত্রে অবশ্যকরণীয় হলো এলএনজি আমদানির অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে জলবায়ু ও দুর্যোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেওয়া এবং টেকসই প্রযুক্তি বাছাই করা।
জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, সাঙ্গু প্ল্যাটফর্ম দিয়ে এলএনজি আনা হবে কি না এটা সরকারি সিদ্ধান্ত। পেট্রোবাংলাকে সরকার বললেই আমরা এই ব্যবস্থা করতে পারি। সাঙ্গুতে পাইপলাইন রয়েছে এটা সবাই জানে। এটা পেট্রোবাংলার তরফ থেকে সরকারকে জানানোর কিছু নেই বলেও মনে করেন তিনি।
জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, পুরনো যেসব অবকাঠামো রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করা যায় কি না তা আগে যাচাই-বাছাই করা উচিত। কিন্তু নতুন প্রজেক্ট করলেই কারও কারও লাভ হয়। এ জন্য পুরনো জিনিস ফেলেই রাখা হয়।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ঢাকায় মাদকের ১৮ ‘ঘুণ্টিঘর’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অভিযানের পর নতুন করে আলোচনায় আসে রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকা। যেখানে মাদক বিক্রি ও সেবন ওপেন সিক্রেট। প্রতিদিন সকাল থেকেই স্কুলশিক্ষার্থী থেকে রিকশাওয়ালা ও চাকরিজীবী সবারই আনাগোনা বাড়ে ঘুণ্টিঘর এলাকায়। রাত যত গভীর হয় ঘুণ্টিঘর হয়ে ওঠে ততই জমজমাট। তবে রাজধানীতে মাদক কারবারে হটস্পট শুধু এই একটি ঘুণ্টিঘর নয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঘুণ্টিঘরের মতোই আরও অন্তত ১৭টি মাদকের হটস্পট রয়েছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। যেখানে কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়া প্রশাসনের চোখের সামনেই দেদার বিক্রি হয় গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনসহ নিত্যনতুন
মাদক। এমনকি কোথাও কোথাও ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো ভয়ংকর মাদকদ্রব্যও বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে বসে। আবার নিরাপদে সেবন করার জন্য আলাদা টাকাও নিচ্ছে চক্র।
এদিকে গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর প্রকাশ্যে আসার পর কারবারি গ্রেপ্তারে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুরু হয়েছে মাদকের হটস্পট চিহ্নিতের কাজ। জোরদার করা হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। ঢাকায় মাদকের কোনো হটস্পটের অস্তিত্ব রাখা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ডিবি পুলিশ। তবে অস্ত্র ও জনবল সংকটে একক অভিযানে ঘুণ্টিঘরের মতো স্পটগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা নিজেদের জন্য হুমকি বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। তাঁরা নতুন কৌশলে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা শুরু করেছেন। যেকোনোভাবেই মাদক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অন্যদিকে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়ে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছিল। তখন ডিএমপির ৫০ থানা এলাকায় সক্রিয় সাড়ে ৩ শতাধিক শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। কিন্তু বিশেষ অভিযানটির কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও এখনো ৩ শতাধিক কারবারি ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর ও পার্শ্ববর্তী মুন্সিরটেক নয়-রাজধানীজুড়েই রয়েছে এরকম আরও বেশ কয়েকটি হটস্পট। যেখানে মাদক ক্রয়-বিক্রয় ও সেবন ওপেন সিক্রেট। প্রাণভয়ে প্রতিবাদ করেন না এসব এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা। কারণ প্রতিবাদ করলেই তাদের ওপর হামলা করে বসে কারবারিরা। এমনকি গুলি করতেও দ্বিধা করে না কারবারির সদস্যরা। ঘুণ্টিঘরের মতো অন্যতম স্পট হচ্ছে সবুজবাগের ওহাব কলোনি, কড়াইল বস্তি, পল্লবীর জেনেভা ক্যাম্প, শাহআলী মাজার, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, ভাটারা বালুর মাঠ, কারওয়ান বাজার থেকে নাখালপাড়া রেললাইন, হাজারীবাগের গণকটুলি সিটি কলোনি, উত্তরা রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশ এলাকা, কোতোয়ালি সুইপার কলোনি, স্বামীবাগ রেললাইন, লালবাগের শহীদনগরের ৪ ও ৫ নম্বর গলি, ডেমরা সারুলিয়া নদীরপাড়, শ্যামপুর আইজি গেট বস্তি, কদমতলীর ওয়াসা রেলগেট, শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি ও কাফরুল কাঁঠাল মাঠ এলাকা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কারওয়ানবাজার-নাখালপাড়া রেললাইন এলাকা আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে মাদক বিক্রি ও সেবনের হটস্পট হিসেবে। গত সোমবার সন্ধ্যার পর এফডিসি রেলগেট যেতেই দেখা যায় ভবঘুরে তিন কিশোর কাগজে মোড়া গাঁজার পুঁটলি পলিথিনে ভরে ছোটাছুটি করছে। সেখানে যাতায়াতকারী লোকদের বলছে- ১০০ না ২০০। লাগবে নাকি সিদ্ধি? অনেকে তাদের কাছ থেকে কিনেও নিচ্ছে। শুধু রেলগেট নয়, এফডিসি রেলগেট থেকে তেঁজগাও রেলগেট পর্যন্ত বিস্তৃত মাদকের বাজার। এই এলাকায় রেললাইনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বিক্রেতারা। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কয়ডা-কয়ডা বলে হাঁক দেন। ক্রেতারা টাকা হাতে দাঁড়ালেই বের করে দেন গাঁজা, ইয়াবা। কেউ কেউ রেললাইনের পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখেন মাদক। গ্রাহক এলে বের করে বিক্রি করে মুহূর্তের মধ্যে কিছুটা দূরে গিয়ে নতুন ক্রেতা খুঁজতে থাকেন।
রাজধানীর অন্যতম গলার কাঁটা হয়ে আছে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। এখানকার কয়েকজন শীর্ষ কারবারি গ্রেপ্তার হলেও এক দিনের জন্যও থামানো যায়নি মাদকের কারবার। ক্যাম্পের মুরগিপট্টি, বাবর রোড, আল ফালাহ মডেল ক্লিনিক গলি, হুমায়ুন রোডসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত চলে মাদক বিক্রি ও সেবন। ক্যাম্প এলাকায় ঢুকলেই নারী-শিশুদের হাতে ইয়াবা ও হেরোইন দেখা মেলে। অপরিচিত কেউ ক্যাম্প এলাকায় প্রবেশ করলে নজরদারিও করেন কারবারি চক্রের সদস্যরা। পল্লবীর এডিসি ক্যাম্প, কেটিসি ক্যাম্প, রহমত ক্যাম্প, মাদ্রাসা ক্যাম্প, মুসলিম ক্যাম্প, কনসাল ক্যাম্প, থার্টিনাস ক্যাম্প, কালাপানি বস্তি, কুর্মিটোলা ক্যাম্প, মুড়াপাড়া ক্যাম্প, এমসিসি ক্যাম্প, মিল্লাত ক্যাম্প, শাহপরান ক্যাম্পও মাদকের অন্যতম হাব। ফোর স্টার গ্রুপের ছত্রছাঁয়ায় কারবারিরা এসব ক্যাম্পে মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, পল্লবীতে মাদকের কলকাঠি নাড়ছে রাজিয়া বেগম, ফতেহ, লাভলী বেগম, নাদিম, জুম্মন, হালিমা, সাহাজামান, বট রনি, আফসানা, রুমা, রজনী আক্তার ও শাহিনুর বেগম। মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে গলাকাটা মনু, চোর জানু ওরফে জানে আলম, সারফু আরমান, তাজ, আনোয়ার হোসেন কাল্লু, চাপাই আরিফ, সিডি স্বপন। গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে রহিমা, মনিরুল হক রবিন, মিনু, স্বামীবাগ রেললাইনে আমির হোসেন, কড়াইল বস্তির মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে জিল্লুর রহমান, এরশাদ মিয়া, টোকাই আনোয়ার, লিটন, বরিশাইল্লা নাসির, মিজানুর রহমান, আইলশা মনির, ঘাড় কাটা বাবুল ও রনি। সবুজবাগ ওহাব কলোনির মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে ফর্মা বাবুল, মো. শামীম, আশিকুর রহমান শান্ত, সুফিয়া ও তার মেয়ে তানিয়া বেগম। শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি নিয়ন্ত্রণ করছে হারিছ মিয়া, সজল হোসেন, শাওন চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, মানিক ও কানা সোহেল।
