কুমারী পূজায় পুণ্যার্থীদের ভিড়

আজ মহানবমী

কুমারী পূজায় পুণ্যার্থীদের ভিড়

ফন্ট সাইজ:

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ। ভোর থেকেই আড়ম্বরতার সঙ্গে শুরু 
চণ্ডীপাঠ। শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাষ্টমীতে দেবীজ্ঞানে কুমারীকে পূজার মধ্য দিয়ে ভক্তি-শ্রদ্ধায় মেতে ওঠেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সোমবার গোটা দেশে ধর্মীয় আবহে পালিত হয়েছে কুমারী পূজা। রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশনে দেবীর আরাধনায় শামিল হতে ভক্তদের ঢল নামে। প্রার্থনা, অঞ্জলি আর ভক্তির আবহে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ।

আজ মঙ্গলবার পালিত হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী।
গতকাল অঞ্জলি আর কুমারী পূজার আয়োজনে সুগন্ধি চন্দন, পুষ্পমালা, ধূপদীপে সমারোহে উদ্যাপিত হয়েছে মহাষ্টমীর অর্চনা। গঙ্গাজল, শুদ্ধ বস্ত্র আর পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র- নিয়ে সবার মঙ্গল কামনার মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে চলে অঞ্জলি দেয়ার আচার আচরণ। এদিন সকাল থেকেই কুমারী পূজাকে ঘিরে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের ঢল নামে। রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠে কুমারী মায়ের দর্শন, প্রার্থনা আর আরাধনায় সকাল থেকেই ভিড় জমান হাজারো পুণ্যার্থী। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তির আবহে মুখর হয়ে ওঠে পূজাঙ্গন। ভক্তরা কুমারী মায়ের আরাধনায় প্রাণভরে দিয়েছেন উলুধ্বনি। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনিতে পুরো মঠ, মিশন এলাকায় ছড়িয়ে যায় শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ। অত্র এলাকায় নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল বেশ কড়া। দীর্ঘ লাইন ধরে প্রবেশ করতে হয়েছে আগতদের। পূজা মণ্ডপগুলোতে আনসার, পুলিশ ও এসআরবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ ও এসআরবি’র পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।

শাস্ত্রমতে, কোলাসুরকে বধ করার মধ্য দিয়ে কুমারী পূজার উদ্ভব। কোলাসুর এক সময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করায় বাকি বিপন্ন দেবগণ মহাকালীর শরণাপন্ন হন। সেই সব দেবগণের আবেদনে সাড়া দিয়ে দেবী পুনর্জন্মে কুমারীরূপে কোলাসুরকে বধ করেন। এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন হয়।

মহাষ্টমীর আধ্যাত্মিক আবহের কেন্দ্রবিন্দু কুমারী পূজা। কুমারীকে পূজা করার সময় দেখা হয় না তার জাত-পাত। এখনো ঋতুবতী হয়নি, এমন ১ থেকে ১৬ বছর বয়সী যে কোনো মেয়েই কুমারীরূপে পূজিত হন। কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে কন্যাশিশুর মাঝে দেবী দুর্গার প্রতিচ্ছবি কল্পনা করে নারীকে মাতৃরূপে সম্মান জানানোর বার্তা দেয়া হয়। ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত কন্যার মধ্যে দেবিত্ব ও মাতৃসত্তার প্রকাশ উপলব্ধি করাই এ পূজার অন্যতম মূল তাৎপর্য। কিশোরী কন্যাকে দেবীর আসনে বসিয়ে শঙ্খের ধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে কুমারী মা’কে পুষ্পমাল্য পরিয়ে দেয়া হয়। অষ্টমী তিথির পূজা শেষে হয় কুমারী পূজা। প্রথমে গঙ্গাজল ছিটিয়ে কুমারী মা’কে পরিপূর্ণ শুদ্ধ করা হয়। এরপর কুমারী মা’র চরণ যুগল ধুয়ে তাকে দেয়া হয় বিশেষ অর্ঘ্য। অর্ঘ্যরে শঙ্খপাত্রে থাকে গঙ্গাজল, বেল পাতা, আতপ চাল, চন্দন, পুষ্প ও দুর্বাঘাস দিয়ে। এরপর অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বায়ু এই পাঁচ উপকরণ দেয়া হয়।

পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আগমন করবেন। অন্যদিকে, দেবী নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে গমন করবেন। আজ মহানবমী। মহাষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে পালিত হয় সন্ধিপূজা। এ সময় ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বালন ও পদ্মফুল নিবেদনের প্রচলন রয়েছে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও চণ্ডীপাঠে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। ভক্তরা দেবীর কাছে নিজেদের ও জগতের মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করেন। মহানবমীতে দেবী দুর্গার পূজা-অর্চনা, মন্ত্রপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি ও বিশেষ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্যাপন করা হবে। নবমী তিথিতে দেবীর কাছে কামনা করা হবে জগতের মঙ্গল ও অশুভ শক্তির বিনাশ। পূজামণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও চণ্ডীপাঠে সৃষ্টি হয় ভক্তিময় পরিবেশ। বিভিন্ন মণ্ডপে চলে প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। মহানবমীর পূজার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব বিদায়পর্বের দিকে এগিয়ে যায়, আর ভক্তদের মনে বাজতে শুরু করে দেবী বিসর্জনের বিষাদের সুর।