নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর তার পরিবার জানতে পারে টিভি থেকে। ভাইয়ের কাছ থেকে এই খবর শুনে হার্ট অ্যাটাক করে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ফুপু আবেদা বেগম। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান নজরুলের বাবা ও মা। গতকাল দুপুরে নজরুলের বাড়িতে গিয়ে তার পিতাকে শয্যাশায়ী দেখা গেছে। পাশের বাড়িতে ৫ দিনের মাথায় চলছে মৃত ফুপুর
জন্য দোয়া ও খাবার আয়োজনের প্রস্তুতি। দলে দলে মানুষ আসছেন নজরুলের বাড়িতে।
সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আবদুল বাছিরের ছেলে নজরুল ইসলাম (২৫)-এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে গত ১৪ই অক্টোবর। তার চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন নজরুল। ৩ বছর ৩ মাস সৌদির জেলে থাকলেও তার কি অপরাধ সেটি জানতো না পরিবার। মৃত্যুদণ্ড হবে সেটি তো ভাবনার মধ্যেই ছিল না।
এক প্রতিবেশী জানান, নজরুল জেলে যাওয়ার পর তাকে ছাড়াতে সৌদিতে ৩ লাখ টাকাও পাঠিয়েছিলেন তার বাবা। উকিল ধরে যাতে নজরুলকে বের করা হয়। ২০২২ সালের ১০ই নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান নজরুল ইসলাম। সেখানে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। মাত্র ছয় মাসের মাথায় পরিবারের লোকজন জানতে পারে সে জেলে আছে। মা ও বাবাকে সে জেলে আছে জানালেও কি কারণে জেলে আছে তা জানায়নি। জেলে থাকাকালীন মাঝেমধ্যে মা’কে ফোন দিতো সে। গত রোববারও ফোন দিয়ে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে নজরুল।
নজরুলের পিতা আবদুল বাছির বলেন, ‘প্রশাসন থেকে এ পর্যন্ত আমি কোনো খবর পাইনি। বিদেশ পাঠানোর পর ৬ মাস ডিউটি করছে সুন্দরভাবেই। ৬ মাস পর আর কোনো খবর নেই। এরপর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ১ মাস পর জানাইছে সে জেলে আছে। কী দোষে জেলে গেছে কইতে পারে না। ৩ বছরের মতো হইয়া গেছে হঠাৎ করে টিভির মধ্যে খবর দেখি। গত রোববার ফোনে কথা হয়েছিল। হে নিজেই জানতো না।’
মা রহিমা বেগম বলেন, ‘সংসারের বড় ছেলে, সংসারের হাল ধরার জন্যই বিদেশ গেছিল। হঠাৎ একদিন ফোন করে কান্নাকাটি করছে। মা আমি জেলে আছি। আমি নিজেও বলতে পারি না আমার কি হইছে। ৩ বছর ৩ মাস জেলে থাকার সময় আমার কাছে একটু একটু ফোন দিতো। গত রোববারও (১১ই অক্টোবর) ফোন দিয়েছিল। এই ফোন যে আমার ছেলের শেষ ফোন তা বুঝতে পারিনি। আমার অনেক কষ্ট।’ রহিমা বেগম আরও বলেন, ‘আমরা মনে করেছি যেহেতু তিন বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে, হয়তো পাঁচ বছর হলে আমার ছেলেকে দেশে পাঠিয়ে দেবে। আমি শেষবারের মতো আমার ছেলেকে দেখতে চাই, একবার ওর লাশটা ছুঁয়ে দেখতে চাই। সরকারের কাছে আমাদের দাবি যেন আমার ছেলের লাশটা ফিরিয়ে আনে।’
মসজিদ কম্পাউন্ডে বাংলাদেশি আরেক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে গত ১৪ই অক্টোবর নজরুলের শিরñেদ করা হয়। একই অভিযোগে আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় সিতি আক্তার নামে ওই তরুণীরও। তবে ওই তরুণীর বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। এদিকে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ই অক্টোবর রাতে মারা গেছেন তার ফুপু আবেদা বেগম। নজরুলকে ছোটবেলা থেকেই আদর-যত্নে বড় করেছেন তিনি। নজরুলের মৃত্যুদণ্ড মেনে নিতে পারছেন না তার সহপাঠী ও এলাকাবাসী।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধুমাত্র বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার কারণে আইনি সহায়তা নিশ্চিত না করে অনেকটা তড়িঘড়ি করেই দুইজনের শিরñেদ করা হয়েছে। ক্ষোভ জানিয়েছেন সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও। নজরুলের সহপাঠী মো. মাহফুজ বলেন, জেলখানা থেকে আমাকে ফোন করেছিল নজরুল। সে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। ঘটনাস্থলে নজরুল উপস্থিত থাকলেও ঘটনার সঙ্গে সে জড়িত ছিল না। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। তাছাড়া ভাষাগত জটিলতার কারণেও সে নির্দোষ তা প্রমাণ করতে পারেনি। নজরুলের প্রতিবেশী ও সৌদি প্রবাসী মো. আনোয়ার বলেন, বাংলাদেশি বলেই সৌদি সরকার এ কাজটা করতে পেরেছে। যদি আমেরিকা বা ভারতীয় অথবা অন্য কোনো শক্তিশালী দেশের নাগরিক হতো— তাহলে হয়তো মৃত্যুদণ্ড দেয়ার আগে বহুবার চিন্তা করতো।
বিরামপুর গ্রামের ইয়াছিন মিয়া বলেন, আমার ছেলের সঙ্গে পড়াশুনা করতো নজরুল। ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো। এই ছেলেকে দিয়ে এমন কাজ হবে এটা আমরা মনকে বুঝাইতে পারি না। ফাঁসি হয়েছে শুনে আমার শরীর কাঁপতে শুরু করে। সহ্য করতে পারছি না। একই গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা নিয়াজুল করিম বলেন, এতে বাংলাদেশ দূতাবাসের অবহেলা আছে। ৩ বছরের ওপরে সে ঝামেলায় আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত ছেলের পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নাই। অপরাধী হয়ে থাকলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হতো। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়নি।
এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বলেন, যে দু’জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে তাদের একজনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, এটি জানতে পেরেছি। তবে এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী লাশ দেশে আসলে বাড়িতে আনার ব্যাপারে প্রশাসন সহযোগিতা করবে।
