সাধারণ মানুষের কাছে আইসিডিডিআর,বি মূলত মহাখালীতে অবস্থিত কলেরা হাসপাতাল নামে পরিচিত। এক সময়ে উদরাময় রোগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটতো হরহামেশা। এখন ডায়রিয়া-কলেরাতে মৃত্যু এক রকমের নেই বললেই চলে। মূলত আইসিডিডিআর,বি’র খাওয়ার স্যালাইন বা ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস) উদ্ভাবন বাঁচিয়েছে লাখ লাখ মানুষের জীবন।
১৯৬০ সাল থেকে সেবা দিয়ে আসা আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) প্রথম বাংলাদেশি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান ড. তাহমিদ আহমেদ। মূলত করোনাকালে বিদেশি পরিচালকরা তাদের নিজ দেশে ফিরে গেলে বোর্ড অব ট্রাস্টির সিদ্ধান্তে তাহমিদ আহমেদকে এ পদে নিযুক্ত করা হয়। পুষ্টি বিষয়ক গবেষণায় ড. তাহমিদ আহমেদ একজন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী। এক্ষেত্রে তার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার গবেষণা এবং এর বাস্তবায়নে শিশুদের অপুষ্টি, যক্ষ্মা এবং ডায়রিয়া রোগের চিকিৎসা সহজ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একইসঙ্গে তিনি শিশুদের তীব্র অপুষ্টি ও ডায়রিয়া চিকিৎসায় একটি প্রোটোকল তৈরি করে সুনাম কুড়িয়েছেন ব্যাপক। ড. তাহমিদ ১৯৮৫ সালে আইসিডিডিআর,বিতে যোগদান করেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আইসিডিডিআর,বি’র নিউট্রিশন ও ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেস বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। কোভিড-১৯ মহামারির শুরু থেকে নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক জন ক্লেমেন্সের নির্দেশনায় ড. তাহমিদ আইসিডিডিআর,বি’র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দায়িত্ব নেয়ার পর পরই ২০২১ সালের শেষ দিকে তাহমিদ আহমেদ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে তৎকালীন সরকারের প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু হেলথ সিটি নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করেছিলেন। তাতে তখন ওই সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নানা সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। সূত্র বলছে, বর্তমানে সমালোচনার মধ্যে আরও রয়েছে তৎকালীন রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ফটোসেশন। সংস্থাটিতে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে স্বজনপ্রীতিসহ তার নেতৃত্ব নিয়ে আছে কিছু প্রশ্নও।
প্রাথমিকভাবে এ হেলথ সিটির নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয় প্রফেশনাল এসোসিয়েটস লিমিটেডকে। কিন্তু নকশার কাজ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্থপতি মনজুর কে এইচ খান একটি গেটের কাঠামোগত পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে আইসিডিডিআর.বি’র বাধার সম্মুখীন হন। আর তাতে আইসিডিডিআর,বি তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনাতেই যেতে চায়নি। আইসিডিডিআর,বি’র নির্বাহী পরিচালক তাহমিদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি তাদের। আইসিডিডিআর,বি’র সার্ভিস গেট এ প্রকল্পের আওতায় আনতে চেয়েছিল প্রকল্পের লোকজন। কিন্তু তাতে তখন আইসিডিডিআর,বি সহযোগিতা করেননি বলে অভিযোগ ওঠে।
২০২১ সালের ২৮শে ডিসেম্বর ডিজি হেলথ কনফারেন্স রুমের টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট প্রপোজাল (ট্যাপ) মিটিংয়ের শেষে ওইদিনই আইসিডিডিআর,বি’র সিনিয়র লিডারশিপ টিমের এক ব্রিফিংয়ে সবার সামনে তাহমিদ আহমেদ বলেছিলেন, ‘সরকারেরই ঠিক নাই, কিসের বঙ্গবন্ধু হেলথ সিটি।’ পরদিন আরেক মিটিংয়ে হেলথ সিটির কথা উঠলে একই মন্তব্য করেন তাহমিদ— এমনটাই অভিযোগ সেদিনকার মিটিংয়ে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের।
এদের মধ্যে একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘তাহমিদ আহমেদ মূলত একজন বিএনপি ঘরানার লোক। তিনি শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু হেলথ সিটির বিরোধিতা করে আসছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হওয়া। মূলত তাহমিদ চেয়েছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে যেন বঙ্গবন্ধু হেলথ সিটির কাজে হাত দিতে না পারে। এজন্য নামকাওয়াস্তে আওয়ামী ঘরানার কয়েকজনকে হাতে রেখে লবিং পর্যন্ত করেন। এদের মধ্যে একজন ফেরদৌসী কাদরী। তিনি আরও বলেন, তার ওঠাবসা সব বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সঙ্গে। এমনকি আইসিডিডিআর,বিতে তার নিয়োগ দেয়া বেশির ভাগ কর্মীই বিএনপি ঘরানার।
এ ব্যাপারে আইসিডিডিআর,বি’র সাবেক সহযোগী গবেষক ও স্টাফ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ ওই সময়ে একটি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, তাহমিদের বিএনপিপ্রীতি আজকের না। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে থাকা অবস্থায় ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে এটিকে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এরপর ১৯৭৯ সালের জুন মাসে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিডিডিআর,বি নামে তার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করে। আইসিডিডিআর,বি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং এটি পর্যায়ক্রমে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গৌরব হলো— ডায়রিয়া চিকিৎসায় জীবনরক্ষাকারী খাবার স্যালাইনের (ওআরএস) সফল গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, যা বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। অবশ্য ডায়রিয়া ছাড়াও পুষ্টিহীনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, সংক্রামক ব্যাধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বমানের গবেষণায় সুনাম রয়েছে।
সূত্রমতে, ড. আহমেদ ২০২১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি নির্বাহী পরিচালক পদে প্রফেসর ক্লেমেন্সের স্থলাভিষিক্ত হন, যিনি ২০১৩ সাল থেকে এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ড. তাহমিদ গবেষণামূলক কাজ এবং শিশুর অপুষ্টি রোধ ও এর সহজ চিকিৎসা ব্যবস্থার সন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তিনি ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এম্বুলেটরি পেডিয়াট্রিক এসোসিয়েশন, কমনওয়েলথ সোসাইটি ফর পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রো-এন্টারোলোজি অ্যান্ড নিউট্রিশন এবং ভারতীয় পেডিয়াট্রিক এসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য সংস্থার পদক পেয়েছেন। তিনি শিশুদের তীব্র অপুষ্টি ও ডায়রিয়া চিকিৎসায় একটি প্রোটোকল তৈরি করেছেন, যার ফলে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়াও তিনি স্থানীয় খাদ্য উপাদান দিয়ে সহজে ব্যবহারযোগ্য (রেডি-টু-ইউজ) এক ধরনের খাদ্য তৈরি করেছেন, যা তীব্র অপুষ্টি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়। তিনি অপুষ্টি, আন্ত্রিক রোগ এবং মানসিক বিকাশের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কয়েকটি দেশে পরিচালিত ম্যালনিউট্রিশন-এন্টেরিক ডিজিজ (ম্যাল-এড) প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশের প্রধান গবেষক। আন্তর্জাতিক জার্নাল এবং বইয়ে তার ৩৬০টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ড. তাহমিদ আহমেদ ৫৪টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের শিশু পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের সংগঠন পেডিয়াট্রিক গ্যাস্ট্রো-এন্টারোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনের (ক্যাপগান) সভাপতি ছিলেন। ড. তাহমিদ আহমেদ ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল এবং নটর ডেম কলেজের পড়া শেষে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ শুরু করলেও ১৯৮৫ সালে আইসিডিডিআর,বিতে যোগ দেন। ঢাকা শিশু হাসপাতালে আবাসিক প্রশিক্ষণ শেষে জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ড. তাহমিদ আহমেদকে মেডিকেল সায়েন্সে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ড. সুলতান আহমেদ চৌধুরী স্বর্ণপদক প্রদান করে। ২০১৮ সালে ড. আহমেদ ইসলামী ব্যাংক ডেভেলপমেন্ট ট্রান্সফর্মার্স পুরস্কার লাভ করেন।
