স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে: চট্টগ্রামে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাষ্টমী উদ্যাপিত হয়েছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসবমুখর পরিবেশে। এদিন নারীশক্তির আরাধনা এবং দেবী দুর্গার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে তিন কুমারীকে দেবীরূপে পূজা করা হয়। পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে বিহিত পূজা, পুষ্পাঞ্জলি ও সন্ধিপূজায় অংশ নেন ভক্তরা।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরের পাথরঘাটার রাধাগোবিন্দ ও শান্তনেশ্বরী মাতৃমন্দিরে কুমারী পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ সময় ছয় বছর বয়সী রাধেশ্রী দত্ত বৃন্দা, ১১ বছর বয়সী ঋত্বিকা দাশ ও সাত বছর বয়সী অদিশ্রী করকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, ফুল, চন্দন, বেলপাতা ও তুলসীপাতা দিয়ে পূজা-অর্চনা করা হয়। মাটির প্রতিমায় যে দেবীর আরাধনা করা হয়, কুমারী পূজায় সেই দেবীর জীবন্ত রূপের প্রতীক হিসেবে কুমারীদের পূজা করা হয়। এ সময় কয়েকশ’ ভক্ত মন্দিরে সমবেত হন। রাধেশ্রী দত্ত বৃন্দা সেন্ট স্কলাস্টিকাস কিন্ডারগার্টেন স্কুলের কেজি শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা রাজীব দত্ত ও মা জুঁই চৌধুরী। ঋত্বিকা দাশ সেন্ট জন’স গ্রামার স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা রনি দাশ ও মা রুমা সেনগুপ্ত। অন্যদিকে অদিশ্রী কর বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলের কেজি শ্রেণিতে পড়ে। তার বাবা অভিজিৎ কর ও মা মৌরী কর।
রাধাগোবিন্দ ও শান্তনেশ্বরী মাতৃমন্দিরের অধ্যক্ষ ও চার সম্প্রদায়ের মহন্ত শ্রীল ১০৮ শ্যামানন্দ দাশ বাবাজি বলেন, তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, অনধিক ১৬ বছর বয়সী এবং ঋতুমতী হয়নি— এমন কুমারীকে পূজার বিধান রয়েছে। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসরণ করেই এবার তিন কুমারীকে পূজা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কুমারী পূজার মাহাত্ম্য অনেক ব্যাপক। সেই সত্যযুগ থেকে কুমারী পূজা চলে আসছে। সত্যযুগে কোলাসুরকে বধ করেছিলেন মা কুমারী রূপে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনকে মা দেখা দিয়েছিলেন কুমারী রূপে। ত্রেতাযুগে শ্রী রামচন্দ্রকে কুমারী রূপে মা দর্শন দিয়ে রাবণ বধের উপায় বলে দিয়েছিলেন। কলিযুগে শ্রীশঙ্করাচার্য কুমারী মায়ের পূজা করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দও কুমারী মায়ের পূজা করেছিলেন।’
মন্দিরের পুরোহিত জুয়েল দেবনাথ বলেন, মহাষ্টমী দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তিথি। এদিনের কুমারী পূজার মধ্যদিয়ে ভক্তরা নারীর মধ্যে দেবীশক্তির প্রকাশকে শ্রদ্ধা জানান। কুমারী পূজা আমাদের শেখায়, নারীকে শুধু দেবীর প্রতীক হিসেবে নয়, বাস্তব জীবনেও যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সবার মধ্যে শক্তি, পবিত্রতা ও কল্যাণের প্রকাশ উপলব্ধি করাই এ পূজার অন্যতম শিক্ষা। প্রাচীন শাস্ত্রে কুমারী পূজার উল্লেখ থাকলেও রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দর্শনে এ পূজার পুনর্জাগরণ ঘটে। তিনি তার স্ত্রী সারদাদেবীকে মাতৃজ্ঞানে পূজা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে কুমারী পূজার প্রচলন করেন। কুমারী পূজার পাশাপাশি সোমবার সকালে নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে মহাষ্টমীর বিহিত পূজা ও পুষ্পাঞ্জলি অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা ফুল, বেলপাতা ও অর্ঘ্য নিবেদন করে দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। অনেকেই উপবাস ও ব্রত পালনের মধ্যদিয়ে দিনটি উদ্যাপন করেন। মহাষ্টমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সন্ধিপূজা। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিটের সন্ধিক্ষণে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এ সময় দেবী চামুণ্ডা রূপে চণ্ড ও মুণ্ড নামের দুই অসুরকে বধ করেছিলেন। সন্ধিপূজায় ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদন ও ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানোর প্রচলন রয়েছে। পূজার আনুষ্ঠানিকতায় দেবীকে অন্নভোগ, খিচুড়ি ও পায়েসসহ বিভিন্ন পদ নিবেদন করা হয়। পরে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। সন্ধ্যায় আরতি, ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনি ও ধুনুচি নাচে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপগুলো। চলতি বছর চট্টগ্রাম নগরীর ২৯৪টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মহাষ্টমীর আনুষ্ঠানিকতায় দেবীর আরাধনার পাশাপাশি নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও মর্যাদার বার্তাও তুলে ধরেন আয়োজক ও ভক্তরা।
