অসুস্থ স্ত্রীর অবসাদ কাটাতে গত বৃহস্পতিবার কক্সবাজার সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে গিয়েছেন নূর আলম। সঙ্গে নিয়েছিলেন শিশুপুত্র, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাসহ পরিবারের ১০ সদস্যকে। উঠেছিলেন সমুদ্রের কোলে গড়ে ওঠা ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে। অফিসের কাজে পরিবারের সদস্যদের রেখে শুক্রবার ফিরেছিলেন চুয়াডাঙ্গায় নূর আলম। ভায়রা আশিকুল ইসলামের কাছে পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে আসেন। কিন্তু শনিবার সকালে মুহূর্তেই তাদের পরিবারের সমুদ্রবিলাস রূপ নেয় বিষাদে। দাউদাউ আগুনের আঁচ বুঝতে পেরে দোতলা থেকে লাফ দেন আশিকুল। তিনি বেঁচে গেলেও বাঁচাতে পারেননি পরিবারের ছয় সদস্যকে। আগুনের লেলিহান শিখা ঘিরে ফেলে পুরো রিসোর্টটিকে। মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় নূর আলমের স্ত্রী, পুত্র, শ্যালক ও তিন শ্যালিকা। ভয়াবহ এই আগুনে নূর আলমের পরিবারের ৬ সদস্যের সঙ্গে প্রাণ হারান আরও চারজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীও। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ছয়জন। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। গত জুনেই কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- চুয়াডাঙ্গার নূর আলমের স্ত্রী ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফাইজান আহম্মেদ, ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭)। এরমধ্যে নাফিজ তেহামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী, লায়লা জাহান নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং মেলিতা মেহেজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। শনিবার সন্ধ্যায় নিহত ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে নেয়া হয়। সেখানে স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। মরদেহগুলো পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ায় স্বজনদের অনেকেই তাদের প্রিয়জনকে শনাক্ত করতে পারছেন না। নিহত ১০ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। অতিরিক্ত পুড়ে যাওয়ায় বাকি ৪ জনের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
এদিকে দগ্ধ ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তারা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
যেভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত:
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। তিনতলা রিসোর্টটির উপরের তলা ছিল টিনের তৈরি। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্থাপনায়। আগুন লাগার পর রিসোর্ট থেকে বিকট শব্দ শোনা যায়। পরে এসি ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে পুড়ে যায় পুরো ভবন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া পর্যটকদের খোঁজে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিস, টুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ ও সিআইডি’র সদস্যরা এতে অংশ নেন। একে একে উদ্ধার করা হয় ১০ জনের মরদেহ। দুপুর ৩টার দিকে উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হয়।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, রিসোর্টের টয়লেটের ভেতর থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগুন থেকে বাঁচতে তারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পানি ব্যবহার করে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এরমধ্যে এসি ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে। তবে শর্টসার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে কিনা, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, ঠিক কখন আগুন লেগেছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়া হয়। খবর দেয়ার কিছুক্ষণ আগেই আগুনের সূত্রপাত হয়। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রিসোর্টটিতে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোসপাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না।
দোতলা থেকে লাফ দিয়ে বাঁচেন আশিকুল
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ছুটি কাটাতে কক্সবাজার গিয়েছেন মো. আশিকুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা ও স্ত্রীর ছোট বোন লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। আশিকুল ইসলামের এক স্বজন জানান, আগুন লাগার পর আশিকুল ইসলাম দোতলা থেকে লাফ দিয়েছেন। তিনি বেঁচে আছেন। তবে আশিকুলের স্ত্রী, স্ত্রীর বোনসহ পরিবারের ছয়জন মারা গেছেন। একই পরিবারের সদস্য হলেন নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩) ও পাঁচ বছর বয়সী সন্তান ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা ৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)।
ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান মিম
ঢাকার সাভার থেকে আসা আইরিন জাহান মিম জানান, পূজার ছুটিতে তিনি দুই বান্ধবীকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার তারা ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। শনিবার ভোরে তিনি ও তার এক বান্ধবী সৈকতে বেড়াতে যান। তাদের আরেক বান্ধবী নাসরিন আক্তার তখন রিসোর্টের কক্ষেই ছিলেন। আইরিন বলেন, কিছুক্ষণ পর সৈকত থেকে দেখতে পেলাম, হঠাৎ আমাদের হোটেলটিতে আগুন ধরে যায়। বিকট বিস্ফোরণের শব্দের পর পুরো হোটেলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
পাঁচ ছেলে-মেয়ে ও নাতিকে হারিয়ে পাগলপ্রায় জিয়াদুল
‘আমাদের আর কেউ রইলো না, কী নিয়ে বেঁচে থাকবো আমরা’- কথাগুলো বলতে বলতে নির্বাক হয়ে যান মো. জিয়াদুল কবির ও কাজল রেখা। টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে তাদের একমাত্র ছেলে নাফিস তেহামী (২৬), একমাত্র মেয়ে ফারিহা কবির (৩২) ও নাতি ফাইজান আহম্মেদ নূর (৫) মারা গেছেন। জিয়াদুল কবির বরগুনার আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের কালিপুরা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি অবসরপ্রাপ্ত যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা। মোবাইল ফোনে জিয়াদুল কবির বলেন, ‘আমার এখন বাঁইচ্যা থাইক্যা লাভ কি? কি নিয়া আমি বাঁচমু? সবতো আমার শেষ হয়ে গ্যাছে।’ স্ত্রী কাজল রেখা বলেন, ‘ছেলে, মেয়ে, নাতি সব শ্যাষ অইয়া গ্যাছে, আমরা আর দুনিয়ায় বাঁইচ্যা থাইক্যা কী করমু। ও আল্লাহ আমাদেরও এখন নিয়া যাও।’ মেয়ে ফারিহা কবিরের স্বামী নূর আলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘স্ত্রী, ছেলে, শ্যালক গ্যাছে, আল্লাহ মোরে এহন বাঁচাইয়া রাখছো কেন? ওগো লগে আমারেও নিয়া গ্যালেও বাঁইচ্যা যাইতাম।’
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদের হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। জেলা সদর হাসপাতালে মোট সাতজন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জন ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন বলে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগুনের সূত্রপাত, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, পূর্ব সতর্কতার পরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু থাকা এবং প্রাণহানি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল কিনা, এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে।
