চোখে জল নিয়ে অপেক্ষায় রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

চোখে জল নিয়ে অপেক্ষায় রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

ফন্ট সাইজ:

হুতিদের হামলার পর নিরাপত্তা শঙ্কা কাটছে না সৌদি আরবের রিয়াদে। রিয়াদগামী ১১৪টি ফ্লাইট বাতিল করেছে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স। এসব ফ্লাইট বাতিলে আটকা পড়েছেন প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার যাত্রী। শেষতক রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা যত বাড়ছে ততই ভুক্তভোগী যাত্রীদের সারিও দীর্ঘ হচ্ছে। অনিশ্চয়তার দিন পার করছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। কারণ মধ্যপ্রাচ্যর এই দেশটি বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার। বিমানবন্দর দিয়ে সৌদিগামী যাত্রীদের অধিকাংশই শ্রমিক। এর বাইরে ওমরাহ যাত্রীরা রয়েছেন। কিন্তু ফ্লাইট বন্ধ থাকায় সাধারণ শ্রমিক ও ওমরাহ যাত্রীদের জন্য যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিকল্প পদ্ধতিতে আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও খরচ বেশি হওয়াতে অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকের চোখে জল ও হতাশা।
শনিবার বেলা ১২টা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ২ নম্বর টার্মিনালে দাঁড়ানো কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। চোখের কোণে জল। চেহারায় বিষণ্ন্নতার ছাপ। আনমনে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছেন। ‘কী হয়েছে’- জানতে চাইতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। মুখ দিয়ে কথার আগেই চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে। কিছু জানতে চাওয়ার আগেই বলে বসেন, গরিব মানুষ। অভাব-অনটনের সংসার। তাই অর্থের জোগান দিতে সোনা গয়না বিক্রি করে ভিসার টাকার ব্যবস্থা করেছি। ভিসা পাওয়ার পর টিকিট কেটেছিলাম। শনিবার আমার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু ফ্লাইট বাতিলের খবরে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। ঘরে স্ত্রী, দুই সন্তান, মা-বাবা। আয় রোজগারের একমাত্র ব্যক্তি আমি। বাবা-মায়ের ওষুধে অনেক টাকা খরচ হয়। এই পরিস্থিতিতে কী করবো, কী না- সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।

একই অবস্থা লালমনিরহাটের শাহাদাত হোসেনের। গ্রামে মুদির ব্যবসা ছিল তার। ব্যবসায় ক্ষতি হয়ে ধারদেনায় পড়ে গেছেন। এরপর বউয়ের গয়না আর বাবার থেকে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে যাচ্ছেন সৌদি আরবে। কিন্তু ভাগ্য নির্মম। এমন সময় বিমান হামলায় সৌদির দু’টি বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। বেশ কিছুদিন থেকে ফ্লাইট বন্ধ। তবে চালু রয়েছে বিকল্প রুট। দু’বার ফ্লাইট বাতিল হয়ে বাধ্য হয়ে মদিনার টিকিট কেটেছেন। নতুন দেশ, নতুন শহর। এসবকে অপেক্ষা করে শাহাদাতের চোখে জল আর শুধুই অপেক্ষা, ধৈর্য। শাহাদাত হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ১৩ তারিখ দাম্মামের ফ্লাইট ছিল। বিমানবন্দরে হামলার কারণে সেটি বাতিল হয়। এরপর এজেন্সির কাছে যাই। তারা ১৫ তারিখ রিয়াদের ফ্লাইটে টিকিট কেটে দেয়। ওই ফ্লাইটও বাতিল হয়। পরে এজেন্সিকে ২৬ হাজার টাকা দিয়ে ১৭ তারিখে মদিনার ফ্লাইটে টিকিট কাটি। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ফ্লাইট। জানি না আজ (শনিবার) কী হবে! তিনি বলেন, আমি তো ওই দেশের কিছু চিনি না। এজেন্সি বললো, মদিনায় নাকি আমাদের নিতে লোক আসবে। এখন সেখান থেকে দাম্মাম যাওয়ার খরচও নাকি আমাদের দিতে হবে। বউয়ের গয়না আর বাপের জমি বিক্রি করে এজেন্সিকে টাকা দেই। কিছু টাকা ধার নিতে হয়েছে। দু’বার ফ্লাইট বাতিল, ঢাকায় কয়েকদিন থেকে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। তৃতীয়বার নিজের টাকায় টিকিট কাটতে হয়েছে। এই টাকাটাও ধার করতে হয়েছে। এখন সামান্য কিছু টাকা নিয়ে বিদেশ যাবো। সেখানে গিয়ে আবার খরচ দিতে হবে। এত টাকা কোথায় পাবো? সেখানে গিয়ে বেতন পাওয়া পর্যন্ত খাওয়ার টাকা কোথায় পাবো? এখন আল্লাহ্‌ ছাড়া আর দেখার মতো কেউ নেই।

সাইফুল হক নামের এক যুবক মানবজমিনকে বলেন, ১৪ তারিখে রিয়াদের ফ্লাইট ছিল। ওটা বাতিল হয়েছে। পরের দিন দাম্মামের টিকিট কাটি। সেটাও বাতিল হয়। এখন বাধ্য হয়ে মদিনার ফ্লাইটে যাচ্ছি। আমরা সবকিছুই মেনে নিতে বাধ্য হই। আমাদের কিছু করারও থাকে না। তিনি বলেন, এ অবস্থায় যেতে মন চায় না। মা-বাবা, ছেলে-সন্তান, ভাই-বোনও যেতে দিতে চায় না। কিন্তু কী করার? জীবিকা অর্জনের জন্য তো যেতেই লাগবে। তাদেরকে একটু ধৈর্য ধরতে বলেছি। এ ছাড়া, আর কিছুই করার নাই। প্রবাসে গিয়ে যেন পরিবারের মুখে হাসি ফেরাতে পারি। আরমান হোসেন নামের আরেক প্রবাসী মানবজমিনকে বলেন, যুদ্ধ হলে কি হবে? আমার ভিসা হয়ে গেছে। এই দেশে থেকে কী কাজ করবো? দেশে থাকলেও মরতে হয়, যেখানে যাই সেখানেও মরতে হবে। আমরা কি মৃত্যু আটকাতে পারবো? এজন্য কোনো ভয় করি না। আল্লাহ্‌ সহায়, আল্লাহ্‌র নির্দেশেই যাচ্ছি আমি। তিনি বলেন, মা ভয় করছে। বলছে, ‘দেশে থাকো, আল্লাহ্‌ খাওয়াবে। কিন্তু নিজের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমাকে যেতেই হচ্ছে।

রফিক আহমেদ নামের এক সৌদি প্রবাসী মানবজমিনকে বলেন, ২৬ হাজার টাকা দিয়ে আবার আজকের ফ্লাইট করলাম মদিনায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আমার টাকা লাগতো না। একটু ভয়ের কারণে নিজে থেকেই যাচ্ছি। কারণ আমার ছুটি শেষ হয়ে গেছে ১২ তারিখ। এখন মদিনা দিয়ে যেতে হবে। এক তো খরচ বেশি, আবার ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা অতিরিক্ত ভ্রমণ করতে হবে। কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি। এখন যাওয়ার পর বোঝা যাবে কী হয়। চাকরি চলে গেলে তো পথে নামতে হবে। ফয়সাল আহমেদ নামের আরেক প্রবাসী মানবজমিনকে বলেন, দেশে এসেছিলাম পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে। কিন্তু এখন চিন্তায় মানসিক চাপে পড়ে গেছি। রিয়াদে অনেক বন্ধুবান্ধব আছে। তাদের অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন মানুষের চাকরিও চলে গেছে। বিমানবন্দরের আশপাশের কোম্পানি ও ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকে, আমার ছুটি শেষ হয়েছে। কয়েকদিন থেকে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আজকে যেতে না পারলে কফিলের সঙ্গে কথা বলে ছুটির মেয়াদ বাড়াতে হবে। কিন্তু পাঁচদিনের মধ্যে সৌদিতে যেতে না পারলে ভিসা বাতিল হবে। এখন ভিসা বাঁচানোর চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছি।

অনির্দিষ্টকালের জন্য বিমানের ফ্লাইট স্থগিত: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবার অনির্দিষ্টকালের জন্য রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট স্থগিত করেছে। বিমান জানিয়েছে, সৌদি আরবে চলমান বিমানবন্দর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সম্মানিত যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা প্রাপ্তি সাপেক্ষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এবং সেটি যাত্রীদের জানিয়ে দেয়া হবে। অন্যদিকে, বিমান আগামী ২১শে অক্টোবর থেকে দাম্মামগামী ফ্লাইট পুনরায় পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। তবে এ ক্ষেত্রে দাম্মাম বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় অনুমতি প্রাপ্তিসাপেক্ষে এসকল ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। বিমানের জেদ্দা ও মদিনাগামী ফ্লাইটসমূহ যথারীতি চালু রয়েছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত করতে পারবেন।

১১৪ ফ্লাইট বাতিল, আটকা ১৭,৭০১ যাত্রী: সিভিল এভিয়েশন সূত্র জানিয়েছে, হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে বন্ধ হওয়া সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম বন্ধ হওয়ার কারণে গত সাতদিনে ১১৪টি ফ্লাইট বাতিল করেছে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। বাতিল হওয়া ফ্লাইটে যাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৭০১ জন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ জানান, সরাসরি বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৮টি, ইউএস বাংলার ১০টি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ১২টি এবং রিয়াদ এয়ারের ১০টি। বাতিল হওয়া ট্রানজিট ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইন্ডিগো এয়ারের ২২টি, সালাম এয়ারের সাতটি, এমিরেটস এয়ারের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৯টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি এবং এয়ার ইন্ডিয়ার পাঁচটি। কাওছার মাহমুদ জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ওই দুই এয়ারপোর্টে ফ্লাইট বাতিল হওয়া অব্যাহত থাকবে।