আদালতের জামিননামা দেখানোর পরও এক পরিবারের ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে হাজতে আটকে রেখে কোর্টে প্রেরণ করার অভিযোগ উঠেছে সদর থানার দারোগা এসআই ধ্রুবেশ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। তিনি মৎস্যজীবী লীগের সাবেক নেতা আ. রহমানের ইন্ধনে জামিননামার অনলাইন ও প্রিন্ট কপি দেখানোর পরও কোনো কিছু তোয়াক্কা করেননি। এ ছাড়া তাদের গভীর রাতে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসার পর তড়িঘড়ি করে সকালেই তাদের আদালতে প্রেরণ করা হয়। পরে আদালত তাদের ছেড়ে দেন। গতকাল হবিগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবন্ধী আবজল মিয়া এসব অভিযোগ তুলে ধরে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আবজল মিয়া বলেন, তাদের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী আ. রহমান, মিজানুর রহমান মিজান, আব্দুল কাদির গংদের দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছে।
এ বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের মামলা-মোকদ্দমা, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ পুলিশ পাঠিয়ে হয়রানি করছেন। জায়গা নিয়ে দায়েরকৃত মামলা দু’বার তাদের পক্ষে হলেও প্রতিপক্ষ প্রভাব খাটিয়ে হয়রানি করে বেড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় মামলা করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ২৩শে জুলাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এ হুমকির অভিযোগ এনে ১০৭ ধারায় আরেকটি মামলা দায়ের করেন। এতে ১১ জনকে বিবাদী করা হয় এবং তারা আদালতে শান্তিভঙ্গ না করার মুচলেকা দেন। অপরদিকে প্রতিপক্ষের দায়ের করা একটি সিআর মামলায় আবজলের পরিবারের ১২ জনকে আসামি করা হয়। গত ৪ঠা অক্টোবর আদালতে হাজির হয়ে তাদের মধ্যে ১০ জন জামিন লাভ করেন।
কিন্তু জামিন পাওয়ার পরও পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আবজল মিয়ার অভিযোগ করেন, গত ১৪ই অক্টোবর দিবাগত গভীর রাতে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই ধ্রুবেশ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একদল পুলিশ তাদের বাড়িতে যায়। এ সময় পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে জানিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেয়া হয়।
পরে আরব আলী, মোস্তফা, আবজল, আজাদ, পুলক, তৌহিদ ও রূপককে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে।
গ্রেপ্তারের সময় এসআই ধ্রুবেশ চক্রবর্তীকে পরিবারের ১০ জনের জামিননামার অনলাইন পিডিএফ কপি মোবাইলে দেখানো হয়। পাশাপাশি জামিননামার প্রিন্ট কপিও দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ধ্রুবেশ চক্রবর্তী সেগুলো দেখতে চাননি এবং জামিননামা ভুয়া বলে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের টেনেহিঁচড়ে থানায় নিয়ে আসেন। থানায় নেয়ার পরও এসআই ধ্রুবেশ চক্রবর্তী ও সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হককে জামিননামার অনলাইন ও প্রিন্ট কপি দেখানোর চেষ্টা করা হলেও তারা বিষয়টি আমলে না নিয়ে হাজতে আটকে রাখে। প্রায় কয়েক ঘণ্টা হাজতে রাখার পর বৃহস্পতিবার সকালে তড়িঘড়ি করে তাদের আদালতে পাঠানো হয়।
সেখানে তাদের আইনজীবী জামিননামার কপি উপস্থাপন করলে আদালত তাদের ছেড়ে দেন। আদালতের জামিননামা দেখানোর পরও কেন তাদের গ্রেপ্তার করে হাজতে রাখা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আবজল মিয়া আরও অভিযোগ করেন, জামিনে মুক্ত হওয়ার পরও তাদের পরিবারের ওপর পুলিশের তৎপরতা ও হয়রানি বন্ধ হয়নি। গত ১৬ই অক্টোবর বেলা ৩টার দিকে সদর মডেল থানার এসআই সোহেলসহ একদল পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে তার ভাই আওয়াল মিয়া ও আল কারিমের খোঁজ করে। তাদের গ্রেপ্তার করতে এসেছে বলেও পুলিশ জানায় বলে দাবি করেন তিনি। তাদের না পেয়ে সে সময় তারা চলে আসে। একইদিন সন্ধ্যায় আরও দুই পুলিশ সদস্য তাদের বাড়িতে যায়, ফলে পুলিশের আসা-যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। তার অভিযোগ, তখন পুলিশ সদস্যরা তাদের মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বলে উল্লেখ করে এবং তাদের ছাড় দেয়া হবে না বলে হুমকি দেয়।
আবজল মিয়া বলেন, আমরা আদালতের আশ্রয় নিয়ে আইনগতভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি। আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও যদি পুলিশ আমাদের বাড়িতে গিয়ে বারবার হয়রানি করে, তাহলে আমরা কোথায় গিয়ে প্রতিকার চাইবো? পুলিশের এমন আচরণে পরিবারের নারী ও শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে আবজল মিয়া এসআই ধ্রুবেশ চক্রবর্তী, এসআই সোহেলসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে জামিননামা দেখানোর পরও গ্রেপ্তার ও হাজতে রাখার ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
