ম্যাকিয়াভেলির সঙ্গে কৌটিল্যকেও জানা জরুরি

প্রতিক্রিয়া

ম্যাকিয়াভেলির সঙ্গে কৌটিল্যকেও জানা জরুরি

ফন্ট সাইজ:

গাজী মিজানুর রহমানের "ম্যাকিয়াভেলিকে নতুন করে চেনা" শিরোনামের লেখাটি (মানবজমিন, ১৭ অক্টোবর, শনিবার, ২০২৬) একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে—তিনি ম্যাকিয়াভেলিকে ধর্মতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের প্রচারণার আবরণ থেকে বের করে একজন প্রজাতন্ত্রী চিন্তক হিসেবে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। তবে লেখায় একটি বড় ফাঁক রয়েছে: সমসময়ের আরেক রাষ্ট্রচিন্তক কৌটিল্যের কথা তিনি একেবারেই বলেননি, তুলনাও করেন নি। ফলে পশ্চিমা পণ্ডিতের মতোই প্রাচ্যের আরেক পণ্ডিতের দৃষ্টিভঙ্গি আড়ালে থেকে যায়, যা জানাও জরুরি।

ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ পড়ার সময় বারবার মনে হয়—এই কথাগুলো কোথায় যেন শুনেছি। কারণ ম্যাকিয়াভেলির জন্মের প্রায় ১৮০০ বছর আগে, ট্যাক্সিলার (তক্ষশিলা) এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কৌটিল্য (চাণক্য), যিনি ছিলে মৌর্যযুগের মন্ত্রী, ‘অর্থশাস্ত্র’ নামে যে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, তাতে রাষ্ট্রচালনার প্রায় একই নীতিমালা লিপিবদ্ধ ছিল। ম্যাকিয়াভেলি যদি আধুনিক ইউরোপের রাষ্ট্রচিন্তার জনক হন, তবে কৌটিল্য হলেন সেই চিন্তার এক পূর্বসূরি, যাকে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বহুদূরের প্রাচ্য জগতে দেখা গিয়েছিল।

আজকের বাংলাদেশে বা দক্ষিণ এশিয়ায় যখন আমরা শাসন, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় কৌশল নিয়ে ভাবছি, তখন ম্যাকিয়াভেলির পাশে কৌটিল্যকেও জানা জরুরি—কারণ কৌটিল্য শুধু শক্তির কথা বলেননি, তিনি বলেছেন রাষ্ট্রের সাতটি অঙ্গ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বৃত্ত (মণ্ডল তত্ত্ব) এবং রাজার কর্তব্য (রাজধর্ম)। এই তিনটি ধারণা আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে সহায়ক।

তবে, উভয় পণ্ডিতের মধ্যে প্রথম সাদৃশ্য হলো মানবস্বভাব সম্পর্কে অবিশ্বাস। ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, মানুষ কৃতজ্ঞ নয়, চঞ্চল, ভীতু ও লোভী; যতদিন সফল থাকেন, ততদিনই আপনার হয়ে থাকেন । কৌটিল্যও প্রায় একই কথা বলেছেন—মানুষের মন ঘোড়ার মতো, সহজেই বদলে যায় । এই অবিশ্বাস থেকেই উভয়ের রাষ্ট্রচিন্তার জন্ম। যদি মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর হয়, তবে রাষ্ট্রকে শক্তি দিয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কৌটিল্য বলেছেন দণ্ড (শাস্তি) ছাড়া সমাজে শৃঙ্খলা সম্ভব নয় । ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন প্রিন্সকে শেয়ালের চতুরতা ও সিংহের সাহস—দুটোই থাকতে হবে ।

উভয়ের দ্বিতীয় সাদৃশ্য হলো নৈতিকতার বাইরে রাষ্ট্রের যুক্তি প্রসারিত করা। ম্যাকিয়াভেলির বিখ্যাত উক্তি—"এন্ড জাস্টিফাইজ দ্য মিনস"। কৌটিল্যও প্রায় একই কথা বলেছেন—রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনে প্রতারণা, গুপ্তচরবৃত্তি ও কঠোর শাস্তি বৈধ। কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। কৌটিল্য তার নীতিকে বলেছেন ‘রাজধর্ম’—রাজার কর্তব্য। এই কর্তব্য কেবল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা নয়। বরং প্রজাদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা । কৌটিল্য বলেছেন, রাজা যদি অন্যায় করেন, তবে প্রজারা শত্রুর কাছে চলে যাবে এবং রাজা তার রাজ্য হারাবেন । অর্থাৎ কৌটিল্যের কঠোরতা কেবল রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্যই, ব্যক্তিগত ক্ষমতার জন্য নয়। তাঁদের তৃতীয় সাদৃশ্য কেন্দ্রীভূত প্রতিবেশী-শত্রু এবং দূরের-বন্ধু প্রসঙ্গে। ম্যাকিয়াভেলি ইতালির বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐক্য চেয়েছিলেন। কৌটিল্য ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্ত রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র চেয়েছিলেন।

কৌটিল্যের মণ্ডল তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিবেশী রাষ্ট্র স্বভাবতই শত্রু, আর দূরের রাষ্ট্র বন্ধু হতে পারে । এই তত্ত্বটি আজও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রযোজ্য—ভারত-পাকিস্তান, ভারত-চীন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার—সব সম্পর্কেই প্রতিবেশী-শত্রুতার ছায়া রয়েছে। ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন প্রিন্সের উচিত প্রতিবেশীকে দুর্বল রাখা এবং দূরের শক্তির সঙ্গে মিত্রতা করা। কৌটিল্য একই কথা বলেছেন—তিনি আরি (শত্রু), মিত্র (বন্ধু), মধ্যম (মধ্যস্থতাকারী) ও উদাসীন (নিরপেক্ষ) রাষ্ট্রের শ্রেণিবিন্যাস করে । তবে দুই পণ্ডিতের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য সুস্পষ্ট। যেমন, কৌটিল্যের রাষ্ট্র ছিল ‘ব্যুরোক্রেটিক’। এখানেই কৌটিল্য ম্যাকিয়াভেলির চেয়ে এগিয়ে। ম্যাকিয়াভেলি প্রিন্সের ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন, কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে তেমন কিছু বলেননি। কৌটিল্য ‘অর্থশাস্ত্র’-এ সাতটি অঙ্গ (স্বামী, অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, কোষ, দণ্ড, মিত্র) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন । তিনি বলেছেন মন্ত্রীদের যোগ্যতা যাচাই করতে হবে, তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ধরার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করতে হবে এবং রাজস্বের এক-চতুর্থাংশ কর্মচারীদের বেতনে ব্যয় করতে হবে । অর্থাৎ, কৌটিল্য কেবল ‘শক্তির দর্শন’ দেননি। তিনি দিয়েছেন প্রশাসনের বিজ্ঞান। ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন ক্ষমতার কৌশলী আর কৌটিল্য ছিলেন রাষ্ট্রের কাঠামোগত স্থপতি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ম্যাকিয়াভেলির মতোই কৌটিল্যও প্রাসঙ্গিক। আরো স্পষ্টভাবে বললে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কৌটিল্যের তিনটি ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক:

প্রথমত, রাজধর্ম। কৌটিল্য বলেছেন রাজার কর্তব্য প্রজাদের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে যখন আমরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতার কথা বলি, তখন কৌটিল্যের রাজধর্ম স্মরণ করা জরুরি—ক্ষমতা কেবল অধিকার নয়, জনহিতে নিবেদিত কর্তব্যও।

দ্বিতীয়ত, মণ্ডল তত্ত্ব। বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক—ভারত, মিয়ানমার, চীন—কৌটিল্যের মণ্ডল তত্ত্বের আলোকে বুঝলে দেখা যায়, প্রতিবেশী শত্রুতা অনিবার্য নয়, কিন্তু কৌশলী ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, প্রশাসনিক কাঠামো। কৌটিল্য যেমন সাত অঙ্গের সমন্বয়ে রাষ্ট্র গড়ার কথা বলেছেন, তেমনি বাংলাদেশেও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—সংসদ, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা বাহিনী—এদের সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। কেবল নেতা বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না; কৌটিল্য এ কথা ২৩০০ বছর আগেই বলে গেছেন।

গাজী মিজানুর রহমানের লেখাটি ম্যাকিয়াভেলিকে নতুন করে চেনার একটি ভালো প্রচেষ্টা। লেখাটিকে সামনে রেখে কৌটিল্যকেও যদি আলোচনা করা যায়, তবে রাষ্ট্রদর্শনের ইতিহাস অসম্পূর্ণতা থেকে পূর্ণতার অবয়ব লাভ করে। কারণ রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস কেবল ইউরোপের ইতিহাস নয়। ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ যখন রাষ্ট্রচালনার কৌশল শেখাচ্ছে, তখন কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ সেই কৌশলের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং প্রতিবেশী সম্পর্কের বৃত্ত শেখাচ্ছে।

আজকের বাংলাদেশে যখন আমরা রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি ও সুশাসনের কথা বলি, তখন ম্যাকিয়াভেলি আমাদের শেখান কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে হয়, আর কৌটিল্য আমাদের শেখান কীভাবে রাষ্ট্রকে চালাতে হয়। দুটোই জানা দরকার—কারণ, কেবল ক্ষমতা ধরে রাখলে রাষ্ট্র টেকে না; রাষ্ট্র চালানোর বিজ্ঞানও জানতে হয়। আর সেই বিজ্ঞান কৌটিল্য ২৩০০ বছর আগেই লিখে গেছেন।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।