জুলাই সনদের ১ বছর: স্বাক্ষরেই থমকে আছে সংস্কার

সহযোগীদের খবর

জুলাই সনদের ১ বছর: স্বাক্ষরেই থমকে আছে সংস্কার

ফন্ট সাইজ:

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘জুলাই সনদের ১ বছর: স্বাক্ষরেই থমকে আছে সংস্কার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সনদ ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা এখন অনিশ্চয়তায় রূপ নিয়েছে। সরকার বলছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সনদের সব প্রস্তাব অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে চলছে। এ অবস্থায় রাজপথে আন্দোলন জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিরোধীরা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর, বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও গণভোটে জনগণের সম্মতির পর প্রত্যাশা ছিল, এবার সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন নেই। সনদ স্বাক্ষরের পরই যেন থমকে গেছে সংস্কারপ্রক্রিয়া।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। এ জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সংসদের ভেতর থেকেই সমঝোতার ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জুলাই সনদের সবটাই আমরা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলেছি। আরও বলব। সমাজের সব স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটি প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা হবে।’

তবে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘বিএনপি জুলাই সনদ ধারণ করলে ও জনগণের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করত। সরকার না চাইলে বিরোধী দলের আর কী করার আছে? আন্দোলনে যাওয়াই তো বিরোধী দলের কাজ।’২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে ওই বছরের অক্টোবরে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এসব সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি ও অধ্যাপক আলী রীয়াজকে সহসভাপতি করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়।

কমিশন প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়। এরপর মতামতের ভিত্তিতে দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৯টি বৈঠক হয়। পরে মৌলিক সংস্কারের ১৯টি বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় ধাপে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা হয়। ২৩ দিনের আলোচনায় ১৯টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও ৮টিতে সর্বসম্মতি আসে; বাকি বিষয়গুলোতে ভিন্নমত ছিল।

প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের ভিত্তিতে তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। বাকি ৩৬টি আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ভিন্নমতসহ সনদে স্বাক্ষর করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি দল। দুই দিন পর ১৯ অক্টোবর গণফোরাম এবং সর্বশেষ চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষর করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে ৫ দফা সংলাপ করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। যার ভিত্তিতে সরকারকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারির প্রস্তাব করে কমিশন। ১৩ নভেম্বর আদেশ জারি করে সরকার। যার ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে দ্বিকক্ষের সংসদ, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ভিন্নমত থাকবে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত বিষয়গুলো সংবিধানে যুক্ত করা হবে।

এরপর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হয়। কিন্তু সনদের অঙ্গীকার মতে, বিএনপির সংসদ সদস্যরা (এমপি) সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। আদেশটিকে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা বলেও দাবি করে দলটি। অন্যদিকে সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন বিরোধী দলের এমপিরা। এর পর থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছে বিরোধী দলগুলো।

চলতি সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ রাখা হয়। কিন্তু বিরোধীরা ওই কমিটিতে যায়নি। এর মধ্যেই কমিটি রাজনৈতিক দল, জুলাই যোদ্ধা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি করে আগামী বছরের জানুয়ারির অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। সংসদে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি পাস হয়ে যাবে বলে ধারণা করছে রাজনৈতিক মহল।

তবে বিরোধী দল অংশ না নিলে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের সুযোগ থাকবে বলে মনে করেন সালাহউদ্দিন আহমদও। তাই তিনি বিরোধী দলকে কমিটিতে যোগ দিয়ে মতামত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিরোধী দল কমিটিতে না গিয়ে দাবি আদায়ে লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। এই দাবি আদায়ে আন্দোলন পর্যায়ক্রমে জোরদার করার ঘোষণা দিয়ে তারা বলছে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই চেতনার আলোকে যাতে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হয়, এ জন্য সর্বোচ্চ যা করা প্রয়োজন, তা তারা করবে।

জুলাই জাতীয় সনদে সংসদের আসনের অনুপাতে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া, সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাবে বিএনপির কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিত করেছে। অন্যদিকে ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে মাত্র একটিতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি রাখা হয়েছে। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে এখনো তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতিসহ বিভিন্ন পদ দেওয়ার বিষয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে এসব সুযোগ দেওয়া সম্ভব হতো।’

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাতিল চিফ হুইপের বক্তব্য, বিচারকদের বদলি বা পদায়নে আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাব দেয় এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সম্মতিতে তা কার্যকর হয়। এ প্রক্রিয়ায় দুই পক্ষই যুক্ত থাকায় আলাদা সচিবালয়ের প্রয়োজন নেই।

আর স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এতে পুলিশ কমিশনের চিন্তার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছেন।

অন্য দলগুলো যা বলছে

এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালনের কথা বললেও আপত্তি না থাকা বিষয়েও বিএনপি এখন বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও রয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যে রূপান্তরের প্রত্যাশা ছিল, এক বছর পরও তা অর্জিত হয়নি।

তবে জুলাই সনদ স্বাক্ষরকেই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তাঁর মতে, কিছু বিষয়ে ঐকমত্য না হলেও সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। নির্বাহী বিভাগ, সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে যৌক্তিক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সনদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে গণভোটের পর সংসদ ১৮০ কার্যদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে কাজ করলেই তা সংগত ও যৌক্তিক হতো বলে মনে করেন সাইফুল হক।

বিএনপি সংস্কার নিয়ে প্রতারণা করছে বলে মনে করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম। তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নের যে পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে, তা মেনে না নেওয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যাওয়ার শামিল। তবে ১৮০ কার্যদিবসের সময়সীমার মধ্যে বিএনপি নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে এবং অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে আশা করেন তিনি।

জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, জুলাই সনদ স্বাক্ষরের সময় যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এক বছর পরও তা পূরণ হয়নি; বরং সরকারের পদক্ষেপে সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

দুই বিশেষজ্ঞের মত

জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পরও কোনো অগ্রগতি না হওয়া হতাশাজনক বলে মনে করেন বিলুপ্ত হওয়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের অঙ্গীকার ও তাগিদ দেখে কমিশন ও নাগরিকদের বিশ্বাস ছিল, তারা দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন চায়। সে অনুযায়ী, সবার মতের প্রতিফলন ঘটিয়ে দ্রুত আলোচনা শেষ করে নির্বাচনের পথে এগোনোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

কিন্তু এখন সংস্কার বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ দেখছেন না জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘সংস্কার বাস্তবায়ন শ্লথগতিতে এগোচ্ছে, এটুকু বলতে পারলেও আমি এক অর্থে আনন্দিত হতাম। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপই দেখতে পাচ্ছি না। এটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ নয়, জনগণের কাছে মতামত চাওয়া এবং জনগণের দেওয়া মতামতকেও উপেক্ষা করার শামিল।’

বিলুপ্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির অঙ্গীকার পূরণ হয়নি। গণভোটে পাস হওয়া সত্ত্বেও নতুন সংসদের অধিকাংশ সদস্য দ্বিতীয় শপথ নেননি, ১৮০ কার্যদিবসে সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেই। সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন ও সংকুচিত বিলের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে সামনে এগোনোর বদলে আমরা পেছনে হেঁটেছি, যা হতাশাজনক।’

প্রথম আলো

‘বেতন নেন চালক, ময়লার গাড়ি চালান অন্যরা, প্রাণ যায় মানুষের’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ৪ অক্টোবর রাত প্রায় পৌনে একটা। সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে এল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একটি ময়লার গাড়ি। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, চালকের আসনে বসা যুবক নথিতে থাকা চালক নন। গাড়িটি বরাদ্দ সরদার হুমায়ন কবিরের নামে। চালাচ্ছেন সাজু আহমেদ। তিনি বহিরাগত, সিটি করপোরেশনের কেউ নন। মাসে ১০ হাজার টাকায় সহকারীর কাজ করেন। ভারী গাড়ি চালিয়ে পাম্পে এলেও তাঁর দাবি, লাইসেন্স আছে হালকা গাড়ির।

দায়িত্বপ্রাপ্ত চালক কোথায়, জানতে চাইলে সাজু প্রথমে বললেন, আশপাশে। আবার প্রশ্ন করলে জানালেন, তাঁর চাচা গোলাপবাগ মোড়ে আড্ডা দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর তেল না নিয়েই গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন তিনি। সাংবাদিকের উপস্থিতির খবরও জানিয়ে দিলেন অন্য চালকদের। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করেছি। করপোরেশনের আর একটি গাড়িও তেল নিতে আসেনি।

প্রায় পাঁচ বছর আগে ডিএসসিসির ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ হারিয়েছিলেন নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। সেই গাড়িও চালাচ্ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে অন্য একজন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নগর ভবন ঘেরাও, তদন্ত ও চালক বরখাস্তের পরও অন্যের হাতে গাড়ির চাবি দেওয়া বন্ধ হয়নি। পরে স্কুলছাত্র মাহিন আহমেদ ও লন্ড্রির দোকানের কর্মী ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাতেও পাওয়া যায় একই অনিয়ম।

দক্ষিণ সিটির বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি নিয়ে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ২২টি গাড়ি অন্যদের দিয়ে চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এমন গাড়ি অন্তত ৫৬টি। বরাদ্দপ্রাপ্ত চালকদের একাংশ নিজেরা গাড়ি না চালিয়েও বেতন নিচ্ছেন। গাড়ি চালাচ্ছেন তাঁদের রাখা সহকারী বা বাইরের লোক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বরাদ্দের জ্বালানি পুরোটা না তুলে বাকি অংশের টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ।

অনুসন্ধানে ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ১৫টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর আগের বছর বাসাবোয় এক দুর্ঘটনায় নিহত হন আরও দুজন। সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল থেকে ১৬টি দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত তিনটি ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে অন্য ব্যক্তির গাড়ি চালানোর তথ্য পাওয়া যায়।

অনিয়মের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেননি ডিএসসিসির পরিবহন চালক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে অন্যদের গাড়ি চালাতে দেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, ‘একদম যে ভালো, আমি এটা বলব না। ভুল তো অবশ্যই আছে।’ তবে সাংবাদিকের অনুসন্ধানের পর তাঁরা নিজেরাও নজরদারি শুরু করেছেন এবং এখন আর সহকারীদের গাড়ি চালাতে দেওয়া হচ্ছে না।

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে একজনের মৃত্যুও কেন হবে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, লাইসেন্স ছাড়া কাউকে গাড়ি চালাতে না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সহকারীকে গাড়ি চালাতে দিলে সংশ্লিষ্ট চালকের পাশাপাশি তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চালক আড্ডায়, গাড়ি সহকারীর হাতে

বহিরাগতদের দিয়ে গাড়ি চালানোর তথ্য যাচাই করতে ৪ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে যাই। করপোরেশনের নিজস্ব এই পাম্প থেকে সংস্থাটির গাড়িগুলো জ্বালানি নেয়। বাইরের গাড়িও এখান থেকে তেল কিনতে পারে। গাড়ির নম্বর ও চালকের পরিচয় মিলিয়ে দেখার জন্য সেখানে অপেক্ষা করি। রাত পৌনে একটার দিকে আসে ১১-৪৩০৩ নম্বরের গাড়িটি। করপোরেশনের নথিতে গাড়িটি ভারী গাড়িচালক সরদার হুমায়ন কবিরের নামে বরাদ্দ। চালকের আসনে বসা সাজু আহমেদ জানান, তিনি করপোরেশনের কেউ নন। সহকারী হিসেবে মাসে ১০ হাজার টাকা পান। তাঁর চাচা গাড়ি চালান। তবে তখন চাচা গাড়িতে ছিলেন না। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স সম্পর্কে জানতে চাইলে সাজু হালকা গাড়ির লাইসেন্স থাকার কথা বলেন।

সাজু চলে যাওয়ার পর পাম্পের কর্মকর্তা ও স্থানীয় কয়েকজন এগিয়ে এসে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। তাঁদের একজন গাড়ির বরাদ্দের তেল কম তুলে পুরো টাকা নেওয়ার বর্ণনা দেন। পাম্পে দাঁড়িয়েই গাড়িটির দায়িত্বপ্রাপ্ত চালক সরদার হুমায়ন কবিরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করি। তিনি ফোন ধরেননি। ফলে গাড়ি অন্য ব্যক্তিকে চালাতে দেওয়ার বিষয়ে তখন তাঁর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

ওই রাতে পাম্প ছেড়ে আসার প্রায় আধা ঘণ্টা পর আবার গাড়ি আসা শুরু হয় বলে পরে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান। হুমায়ন কবির ইউনিয়নের কোনো পদে আছেন কি না, জানতে চাইলে সভাপতি শাহ আলম তালুকদার বলেন, তিনি কমিটিতে নেই। তবে তাঁর সঙ্গে থাকেন, তাঁর ঘনিষ্ঠ। অন্যদের গাড়ি চালাতে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে ইউনিয়ন সভাপতি দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কথা বলেন। তাঁর দাবি, চালকদের কখনো ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, চালকেরা দিন–রাত মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালান।

পরদিন ৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে যাই সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পাশে করপোরেশনের গাড়ি রাখার আরেকটি গ্যারেজে। পদ্মা সেতুর দিকে যাওয়া রেললাইনের কাছের এ জায়গায় আগে ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক ছিল। সেখান থেকে একের পর এক গাড়ি বর্জ্য পরিবহনের জন্য বের হচ্ছিল। তবে ১১-৪২৭০ ও ১১-৪৩০৭ নম্বরের গাড়ি দুটি বের হচ্ছিল না।

মূল চালকের বদলে অন্যরা চালান বলে অনুসন্ধানে যেসব গাড়ির তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, তার মধ্যে এই দুটি ছিল। প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করি। একপর্যায়ে সাংবাদিকের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ে। অন্তত ৩৫ জন চালক জড়ো হয়ে আমার কাছে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। একপর্যায়ে করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় ফিরে আসি। গাড়ি দুটির চালকের সঙ্গে সেদিন আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এর আগের রাতে ১১-৪২৭৮ নম্বরের আরেকটি গাড়ির চালকের খোঁজও পাওয়া যায়নি। ৪ অক্টোবর রাত ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত গাড়িটি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এই গাড়িও অন্যদের দিয়ে চালানোর তথ্য আগে পাওয়া গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চালককে না পাওয়ায় ওই রাতে তাঁর পরিচয় যাচাই করা যায়নি।

চালকসংকটে অন্যরাও চালকের আসনে

ডিএসসিসির মোট যান ও যন্ত্রপাতি (এক্সক্যাভেটর, রোড রোলার, বুলডোজার ইত্যাদি) ৬০৮টি। এর বিপরীতে স্থায়ী চালক ২৫২ জন। এই হিসাবের মধ্যে বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি ছাড়াও করপোরেশনের অন্য যানবাহন ও যন্ত্রপাতি রয়েছে। চালকের ঘাটতি পূরণে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মশককর্মীসহ অন্য পদের কর্মীদেরও গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

স্থায়ী চালকের সংখ্যা ২৫২ বলে নিশ্চিত করেন ইউনিয়ন সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। তাঁর ভাষ্য, অন্য পদের কর্মীদের মধ্যে যাঁদের লাইসেন্স ও গাড়ি চালানোর দক্ষতা রয়েছে, কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে তাঁদের দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, বরাদ্দপ্রাপ্ত চালকেরাই নিজ দায়িত্বে অন্যদের দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিবহন শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে অনেকে এমন সুযোগ নেন।

চালকসংকটের বিষয়ে প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি কিছু চালক নিয়োগ দিয়েছেন, আরও নেওয়া হবে। বিভিন্ন বিভাগে জনবলের প্রয়োজন জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে লোক বাড়ানোর সঙ্গে বেতন দেওয়ার সামর্থ্যের বিষয়টিও দেখতে হচ্ছে।

বরাদ্দের তেল পাম্পেই বিক্রি

দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ির ময়লা প্রথমে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বা এসটিএসে আনা হয়। সেখান থেকে গাড়িতে করে নেওয়া হয় মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে। বর্জ্য পরিবহন ও ল্যান্ডফিলে ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে ব্যবহৃত হয় ২৩৭টি যান-যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে বর্জ্য বহনের গাড়ির পাশাপাশি ল্যান্ডফিলে ব্যবহৃত যন্ত্রও রয়েছে।

বর্জ্য বহনের জন্য ৩, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ টন ধারণক্ষমতার গাড়ি ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব গাড়ি প্রতি রাতে তিন থেকে চারবার এসটিএস থেকে মাতুয়াইলে যাতায়াত করে। তবে ইউনিয়ন সভাপতি শাহ আলম তালুকদারের দাবি, বর্জ্য পরিষ্কার করতে ন্যূনতম চারটি ট্রিপ প্রয়োজন হয়; কোনো গাড়ি পাঁচ ট্রিপও দেয়।

গাড়ি ও যাত্রাপথ অনুযায়ী, প্রতি ট্রিপে ৮ থেকে ১৪ লিটার জ্বালানি বরাদ্দ থাকে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় ট্রিপপ্রতি তিন থেকে চার লিটার পর্যন্ত বেশি বরাদ্দের সুযোগ নিয়ে তেল সরানো হয়। বরাদ্দের পুরো তেল গাড়িতে না তুলে বাকি অংশ কম দামে পাম্পেই বিক্রি করে দেওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাম্পে কর্মরত একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, করপোরেশনের চালকদের কিছুটা কম দামে তেল বিক্রির বিষয়টি সবাই জানেন। এটা নিয়ে লুকোচুরির কিছু নেই।

পৌর ফিলিং স্টেশনে কথা হয় স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। লেনদেনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, কোনো ট্রিপে ১২ লিটার বরাদ্দ থাকলে চালক ৮ বা ৯ লিটার তেল নেন। বাকি তেলের জন্য টাকা জমা থাকে। পাম্পের লোকেরা কাগজে হিসাব লিখে রাখেন। মাসের মাঝামাঝি বা শেষে মূল চালককে টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, গাড়ি অন্য কেউ চালালেও টাকার হিসাব থাকে মূল চালকের নামে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, এই অর্থের ভাগ পান কিছু চালক, ইউনিয়নের নেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে কার কাছে কত টাকা গেছে, সেই হিসাব পাওয়া যায়নি।

তেলের টাকা থেকে কমিশন পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন পরিবহন চালক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম তালুকদার। তিনি বলেন, চাকরি করেন, বেতন পান এবং সেই আয়েই চলেন। কোন গাড়ি কত জ্বালানি খরচ করে, তার নির্দিষ্ট হিসাব তাঁর কাছে নেই। তাঁর বক্তব্য, কিছু গাড়িতে হাইড্রলিক ব্যবস্থা চালাতে ইঞ্জিন চালু রাখতে হয়। ফলে শুধু চলার দূরত্ব দিয়ে সব গাড়ির জ্বালানি খরচ একভাবে হিসাব করা যায় না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, মাসে গড়ে ৫ হাজার ৮৪২টি ট্রিপ হয়। প্রতিটি ট্রিপে ৩ লিটার করে সরানো হলে মাসে পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫২৬ লিটার। অক্টোবরের সরকারি খুচরা মূল্য প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা ধরে এই ডিজেলের বাজারমূল্য ২৩ লাখ ৬৬ হাজার ১০ টাকা। একই হারে এক বছর চললে এবং দাম অপরিবর্তিত থাকলে তা প্রায় ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

তেল বিক্রি ও ইউনিয়ন নেতাদের প্রশ্রয়ের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন করা কর্মীদের অধিকার। সেই অধিকার তিনি খর্ব করতে পারেন না। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করবেন। সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মৃত্যু, বরখাস্ত, আবার একই অনিয়ম

২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে রাস্তা পার হওয়ার সময় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানকে চাপা দেয় দক্ষিণ সিটির ময়লার গাড়ি। পরদিন পুলিশ জানায়, গাড়ি চালাচ্ছিলেন রাসেল খান। তিনি করপোরেশনের নিয়মিত কর্মী ছিলেন না, তাঁর গাড়ি চালানোর লাইসেন্সও ছিল না। আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত হয়ে গাড়ি চালানোর সুযোগ পেয়েছিলেন বলে পুলিশের বক্তব্যে উঠে আসে।

ওই ঘটনায় করপোরেশনের তদন্তে গাড়ির দায়িত্ব হাতবদলের একাধিক ধাপ পাওয়া যায়। গাড়িটি বরাদ্দ ছিল ইরান মিয়ার নামে। পরিবহন পুল থেকে সেটি দেওয়া হয় হারুনকে। হারুন আবার চালাতে দেন রাসেলকে। অর্থাৎ নথির চালকের কাছ থেকে গাড়ির চাবি একাধিক হাত ঘুরে পৌঁছায় লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তির কাছে।

নাঈমের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীরা গুলিস্তানে বিক্ষোভ করেন। ২৫ নভেম্বর নগর ভবন ঘেরাও করে বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবি জানান। তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস তাঁদের সামনে এসে বক্তব্য দেন। নাঈমের বাবার করা মামলায় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বরখাস্ত চালক ইরান মিয়া, হারুন ও রাসেল। তখন ইরান মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়।

তবে এসব ঘটনায় মামলা, তদন্ত হলেও শেষ পর্যন্ত বিচার পান না স্বজনেরা। জানতে চাইলে নাঈম হাসানের বাবা শাহ আলম দেওয়ান গতকাল শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলা করার পরই শেষ। কেউ আর খবর নেয়নি। কত কষ্ট করে ছেলেকে নটর ডেম কলেজ পর্যন্ত নিলাম। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি বহু বছর ধরেই চলছে। এটা নিয়ে আর কী বলব!’

নাঈমের মৃত্যুর পর ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর নয়জন চালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, নিজেদের নামে বরাদ্দ গাড়ি নিজেরা না চালিয়ে অন্যদের চালাতে দেওয়া। তাঁদের সাতজন ময়লার গাড়ির চালক, দুজন হালকা গাড়ির। একজনের গাড়ি অন্যকে দেওয়ার অভিযোগে পরিবহন তত্ত্বাবধায়ক ফারুক আহমেদকেও চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে অবশ্য তাঁকে চাকরিতে বহাল করা হয়।

এর আড়াই বছর পর ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল মুগদার মদিনাবাগে ময়লার গাড়ির ধাক্কায় মারা যায় মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মাহিন আহমেদ। করপোরেশনের আদেশে বলা হয়, ১১-৪২৮১ নম্বরের গাড়ির চালক কামাল নিজে না চালিয়ে রুবেলকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। চালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কেউ দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে ছিলেন না। দায়িত্বে অবহেলার জন্য তিনজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর যাত্রাবাড়ীর কলাপট্টিতে প্রাণ যায় লন্ড্রির দোকানের কর্মী ইকবাল হোসেনের। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় ময়লার গাড়ি তাঁকে ধাক্কা দেয়। পুলিশের ভাষ্য, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন চালকের সহকারী। তাঁকে আটক ও গাড়িটি জব্দ করা হয়। নাঈমের পর মাহিন, তারপর ইকবাল—তিনটি ঘটনায়ই দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে অন্যজন গাড়ি চালাচ্ছিলেন।

আরেক খবরে বলা হয়, ‘মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: আগে জানত না বাংলাদেশ, তথ্য চেয়ে সৌদিকে চিঠি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক’ কাজের দায়ে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি আগে জানত না বাংলাদেশ। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ বিষয়টি জানতে পেরেছে। এরপর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গতকাল বৃহস্পতিবার চিঠি দিয়েছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জেদ্দায় বাংলাদেশ কলস্যুলেটের সূত্র প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছে। আজ শুক্রবার বিকেলে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি সূত্র এ প্রতিবেদককে জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পরই বিষয়টি তাদের নজরে আসে। এরপর গতকাল জেদ্দার কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।

সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার তথ্য নিশ্চিত করে। জানা গেছে, মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিরা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ জানিয়েছে, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সৌদি নিরাপত্তাবাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করেছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক তদন্ত শেষে ওই দুজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে আদালতে পাঠানো হয়। শরিয়াহ আইনের অধীনে ‘তাআজির’ অর্থাৎ বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তির বিধানে আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করা এবং যে পরিস্থিতিতে অপরাধ ঘটেছে, তা বিবেচনায় নিয়েই বিচারক এ শাস্তি দেন বলে জানানো হয়েছে। পরে উচ্চতর বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখলে তা চূড়ান্ত রূপ পায় এবং রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ জারি হয়।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় পবিত্রতা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শরিয়াহ আইন কার্যকর করার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে পবিত্র স্থানে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

সৌদি আরব থেকে বেসরকারি সূত্রে জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে জেদ্দার আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া চলছিল। আর বিচারপ্রক্রিয়া চলার সময় বাংলাদেশের দুজন বিশিষ্ট নাগরিক দোভাষী হিসেবে সহযোগিতা করেছেন।

প্রসঙ্গত কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদে পক্ষভুক্ত বাংলাদেশ ও সৌদি আরব দুই দেশই। সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশের নাগরিক বিদেশে গ্রেপ্তার হলে বন্দীর অনুরোধে আটককারী দেশকে অবিলম্বে তাঁর দেশের কনস্যুলেটকে জানাতে হয় এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে বন্দীরা কনস্যুলেটকে জানানোর অনুরোধ করেছিলেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশিকে আটক করে খুব দ্রুত মৃত্যদণ্ড কার্যকর করেছে, এমনটা হওয়ার কথা নয়। এখন আটক দুজনের পক্ষে কেউ মিশনে যোগাযোগ করল না কেন, সেটাও রহস্যজনক।

নিহত দুজনের সৌদি আরবে অবস্থানের ধরন ও মেয়াদ, বিচারে কোনো আইনি সহায়তা বা আপিলের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, এসব বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

যুগান্তর

দৈনিক যুগন্তরের প্রধান শিরোনাম ‘অভিযানেও মিলছে না সুফল’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কিশোর গ্যাং দমনে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত দেড় মাসে সারা দেশে দেড় হাজারেরও বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেফতার হলেও পাড়া-মহল্লায় তাদের দৌরাত্ম্য এতটুকুও কমেনি। উলটো ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দির চাপে হিমশিম খাচ্ছে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেকারত্ব, মাদকের অবাধ বিস্তার এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ না করে শুধু পুলিশি ধরপাকড় দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব। কিশোর অপরাধীদের সুপথে ফেরাতে সামাজিক কাঠামোর সংস্কারের পাশাপাশি পরিবারের নজরদারি ও সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে যেসব জায়গায় হাত দেওয়া দরকার, সেখানে কেউ হাত দিচ্ছেন না। রাজনৈতিকভাবে পরিচিত কতিপয় ব্যক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় গ্যাং গড়ে ওঠে। পেছনের এই বড় ভাই বা শেল্টারদাতাদের আইনের আওতায় আনা হয় না। তিনি আরও বলেন, এসব কিশোরের বড় অংশই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে আসে। বেকারত্ব, শিক্ষার অভাব ও মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের মতো সামাজিক সংকট জিইয়ে রেখে শুধু বলপ্রয়োগ করে কিশোর গ্যাং দমন অসম্ভব।

সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে দেড় হাজারেরও বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। এতে কিশোর সংশোধনাগার বা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বন্দির সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি ছাড়িয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত দেশের প্রধান শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে ৩০০ জনের ধারণক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে ৬৯৩ জন বন্দি রয়েছে। যশোরের পুলেরহাট শিশু উন্নয়নকেন্দ্রেও ১৫০ জনের জায়গায় বন্দি আছে ৩০৩ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাশ্চাত্যের গ্যাং কালচারের সঙ্গে দেশের কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তর ফারাক রয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে নানা ধরনের কিশোর গ্রুপ গড়ে উঠছে মূলত দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং মাদকের প্রভাবে। এছাড়া মিছিল-মিটিংসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহারের ফলে কিশোর গ্যাংয়ের লাগামহীন দৌরাত্ম্য ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বস্তিকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। মোহাম্মদপুর, উত্তরা, টঙ্গী, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশের খাতায় দেড় শতাধিক কিশোর অপরাধী গ্রুপের নাম রয়েছে, যাদের সদস্যসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। দিন দিন এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। এদের অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। এর পাশাপাশি ফেসবুক ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও কিশোরদের গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়াচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশি অভিযানে কিশোর অপরাধীদের আটক কিংবা গ্রেফতার করা হলেও সেভাবে সুফল মিলছে না। প্রচলিত কারাগারের বাইরে শিশু-কিশোরদের বিশেষ আটককেন্দ্র বা সংশোধনাগারে যথাযথ কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নেই। ফলে সংশোধনাগার থেকে ফিরে এলেও কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন ঘটে না; বরং তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে চুরি কিংবা ডাকাতির মতো আরও বড় অপরাধে জড়ায়। কেউবা পেশাদার অপরাধী হয়ে ওঠে।

যে পথে সমাধান: কিশোর গ্যাং সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি পরিবারের হাতে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে-সে বিষয়ে পরিবারকেই সবার আগে তদারকি করতে হবে।

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচার-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে প্রথমে কিশোরদের মনোজগৎকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। উঠতি বয়সিরা তাদের বয়ঃসন্ধিকালে স্বাভাবিকভাবেই আবেগপ্রবণ থাকে। ফলে তারা পারিপার্শ্বিক পরিবেশে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা কিংবা মহল্লার বড় ভাইদের মতো তারাও ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায়। এর সুযোগ নেন কতিপয় রাজনৈতিক নেতা কিংবা অপরাধীচক্র। এভাবে নিজের অজান্তেই কিশোরদের অনেকে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক বিভিন্ন গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া হুজুগ ও হাতাশা থেকেও অনেকে নানা ধরনের অপরাধীচক্রে যোগ দেয়। বেকারত্বের কারণেও কেউ কেউ মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে শুধু পুলিশি ভয় দেখিয়ে এদের সুপথে ফেরানো বেশ কঠিন।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান আইনে ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু হওয়ায়, ১৬-১৭ বছর বয়সিরা অস্ত্র বা মাদকের মতো গুরুতর অপরাধে জড়ালেও তাদের শিশু হিসাবে দ্রুত জামিন দিতে হয়।

পুলিশের সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, কিশোর গ্যাং বিশ্বের সব দেশেই কমবেশি আছে। তবে এটি প্রতিরোধে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, পুলিশের পাশাপাশি সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগও নিতে হবে।

কালের কণ্ঠ

‘বিলাসপণ্যের বাজারে মন্দা’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে নতুন স্মার্টফোন, টেলিভিশন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), গাড়ি ও দামি প্রসাধনসামগ্রীর বাজারে বিক্রিতে মন্দা দেখা দিয়েছে।

একদিকে পণ্যের উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রেতারা কেনাকাটা কমিয়ে দেওয়ায় চাপে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একদিকে সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতিতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে মৌলিক চাহিদা মেটাতে নাভিশ্বাস ওঠায় বিলাসপণ্য কেনা এড়িয়ে চলছেন ক্রেতারা। এই দ্বিমুখী সংকটে বৈশ্বিক ও দেশীয় উভয় বাজারেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কৌশল বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের একটি অংশ একান্ত প্রয়োজন না হলে নতুন ইলেকট্রনিক পণ্য কিনছেন না, পুরনো দিয়েই কাজ চালানোর চেষ্টা করছেন।

এতে চাপে পড়েছে ভোক্তাপণ্যের বাজার। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রি বাড়ছে না, আবার বিক্রি কমায় ব্যবসার আয়ও সংকুচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ যুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের হাতে অতিরিক্ত খরচের অর্থ থাকছে না। ফলে অনেকে নতুন পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন।

উদ্বেগের জায়গা হলো, মানুষের চাহিদা কমে গেলে তার প্রভাব শুধু স্মার্টফোন বা গাড়ির বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, বিপণন, খুচরা বিক্রি ও কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়ে। এসব খাত থেকে রাজস্ব আদায় কমবে, যা রাজস্ব ঘাটতি আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশেষত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জাহাজীকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সাধারণের আয় হ্রাসেই এটি হয়েছে। সারা বিশ্বে বিশেষ করে বিকাশমান অর্থনীতিতে বিলাসদ্রব্যের চাহিদা কমে গেছে। নতুন চাকরি বাড়ছে না, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ পণ্য ক্রয়ে রেশনিং করছে।’

১৪ বছরে সর্বনিম্নে বৈশ্বিক স্মার্টফোন সরবরাহ:

বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারেও সংকট তীব্র হচ্ছে। মেমোরি চিপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশ্বে স্মার্টফোন সরবরাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, এটি ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান।

আইডিসি ও গার্টনারের পূর্বাভাসেও বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারের চাপের চিত্র উঠে এসেছে। মেমোরি চিপের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ফোন তৈরির খরচ বেড়েছে। ফলে নির্মাতারা সাশ্রয়ী মূল্যের ফোন সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। কাউন্টারপয়েন্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক শিল্পী জৈন বলেন, ‘মেমোরি চিপ ও প্রসেসিং পার্টসের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা এটি টানা দ্বিতীয় প্রান্তিক। যন্ত্রাংশের অস্বাভাবিক মূল্যের কারণে নির্মাতারা তাঁদের পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনানুযায়ী সাশ্রয়ী মূল্যের ফোন বাজারে সরবরাহ করতে পারছেন না, যার ফলে খুচরা বাজারে প্রতিটি ফোনের গড় বিক্রয়মূল্য ঊর্ধ্বমুখী।’

দাম বাড়ায় ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। অনেকে আগের তুলনায় বেশি সময় পুরনো ফোন ব্যবহার করছেন। বাজারের এই চাপের প্রভাব পড়েছে ব্র্যান্ডগুলোর ওপরও। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, স্যামসাংয়ের বৈশ্বিক চালান ৩ শতাংশ কমেছে। শাওমির চালান কমেছে ৩০ শতাংশের বেশি এবং বিশ্ববাজারে তাদের অংশ নেমে এসেছে ১০ শতাংশে। অন্যদিকে, উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম ফোনের বাজারে অবস্থান ধরে রেখেছে অ্যাপল।

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯% বেকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই এমন কাজে নিয়োজিত, যেখানে তাদের অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগের পরও এর সুফল পুরোপুরি কাজে লাগছে না দেশের অর্থনীতিতে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ (অক্টোবর ২০২৬) শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের তরুণদের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে। তবে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ২৮ থেকে ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছেন। আবার যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদেরও অনেকেই নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদে নিয়োজিত হতে পারছেন না।

এতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় ৫০ শতাংশ এমন কাজে নিয়োজিত, যেখানে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেককে যোগ্যতার তুলনায় নিম্নমানের কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে।

শিক্ষা ও চাকরির দক্ষতায় বড় ব্যবধান

শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অর্জিত দক্ষতা এবং নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে ব্যবধানকে এ সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকায় অনেক তরুণকে উপযুক্ত চাকরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তাদের কেউ কেউ নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ পরিস্থিতি শুধু শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট নয়, দেশের মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগের পরও কর্মীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা যদি উৎপাদনশীল কাজে পুরোপুরি ব্যবহার করা না যায়, তাহলে অর্থনীতিতে সেই বিনিয়োগের সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিপত্যও বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে আইএমএফের প্রতিবেদনে। বিশেষ করে কৃষিসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরতা বেশি। এসব কাজে নিয়মিত চুক্তি, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ সীমিত।

ফলে কর্মসংস্থানে যুক্ত থাকলেও অনেক শ্রমিকের আয় ও কর্মপরিবেশ অনিশ্চিত থেকে যায়। প্রচলিত বেকারত্বের হিসাব দিয়ে শ্রমবাজারের এই বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ, কেউ কাজে যুক্ত থাকলেই যে তিনি নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করছেন কিংবা নিরাপদ কর্মসংস্থান পেয়েছেন, তা নয়।

জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের সামনে জনসংখ্যার কাঠামোগত পরিবর্তন বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করছে। আইএমএফের প্রতিবেদনে দেওয়া প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাড়বে।

এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বড় সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে উৎপাদন শিল্প ও সেবা খাতে উচ্চ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে জনমিতিক সুবিধা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

তবে বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য সময়মতো মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে। প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব এবং উপযুক্ত কাজের সংকট দীর্ঘায়িত হলে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে এশিয়ার শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তার কর্মসংস্থানের ধরন এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতায় পরিবর্তন আনছে। আইএমএফের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশাগুলোতে নিয়োগের চাহিদা তুলনামূলক কম প্রভাবিত পেশাগুলোর চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। তবে এআই-সংক্রান্ত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে।

এ পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো তরুণ জনগোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে কর্মসংস্থানের বিদ্যমান সংকট আরও জটিল হতে পারে। বিপরীতে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারলে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

আইএমএফের প্রতিবেদনে এশিয়ার শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে– ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান কোথায় সৃষ্টি হবে, কর্মীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা কীভাবে অর্জন করবেন এবং শ্রমবাজার এআইনির্ভর পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে খাপ খাওয়াবে।

ইত্তেফাক

‘সীমান্ত পেরিয়ে মাদকের চালান ট্রলারযোগে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, নৌপথে ব্যাপক হারে দেশে ঢুকছে মাদক। বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে সিমেন্ট আর সার, মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা নামে সর্বনাশা মাদক। এই মাদক নৌপথে বরিশাল, মোংলা, খুলনা, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে কিছু মাদকের চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশই রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর সত্যতা স্বীকার করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা।

তারা জানান, সড়ক পথে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নজরদারি এবং চেকপোস্টসহ মনিটরিং ব্যবস্থার জোরদার রয়েছে। এ কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসাবে বেছে নিয়েছে। আগে সড়ক পথে বেশি মাদক পাচার হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেত। এখন নৌপথে মাদক পাচার হচ্ছে বেশি।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানেও নৌপথে মাদক পাচারের তথ্য মিলেছে। কীভাবে মাদক ওপার থেকে বাংলাদেশে আসছে, কোন কোন পথে কোথায় যাচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করছে তারা। জড়িতদের তালিকাও করছে। এ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী দেশে মাদকের মধ্যে ইয়াবার ব্যবহার সর্বাধিক।

জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার, টেকনাফসহ বিভিন্ন নৌপথে মাদকের চালান ট্রলারসহ বিভিন্ন নৌযানযোগে বরিশাল, চাঁদপুর, মোংলা হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি ৫ লাখ ইয়াবার ২টি ও ৩ লাখ ইয়াবার একটি চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করেছেন। এছাড়া টেকনাফ থেকে নৌপথে পাচার হয়ে আসা মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হলো চাঁদপুর। এই এলাকায় মাদক পাচারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। ইতিমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে ২৫ হাজার ইয়াবার একটি চালানসহ এই এলাকার গডফাদার রানাকে আটক করা হয়েছে।

মাদক পাচার ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্মকর্তাদের অভিমত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এটা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষে সীমিত জনবল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সারা দেশে মাদকের যে বিস্তার, সেই তুলনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জনবল ও অবকাঠামোর অবস্থা হলে মহাসমুদ্রে একফোঁটা পানির মতো। জনবলসহ অবকাঠামো বৃদ্ধির প্রস্তাব কয়েক দফা দেওয়ার পরও তা আলোর মুখ দেখেনি।

নৌপথে এসআরবি-কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাদক নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ান (এসআরবি) এর পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, এসআরবির পক্ষ হতে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। নৌপথে মাদক আসছে-এর সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, এসআরবির পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়ে দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম দিল্লিতে ‘তিরঙ্গা মার্চ’ ঘিরে উত্তেজনা। প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্দোলনকারীদের জাতীয় পতাকা ওড়ানো কর্মসূচি ঠেকাতে ভারতের রাজধানী দিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য দুই দিন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ব্যঙ্গাত্মক নামের অরাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) গতকালের জাতীয় পতাকা হাতে পদযাত্রা বা ‘তিরঙ্গা মার্চ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লি ও আশপাশের এলাকায় ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।

একই সাথে সেন্ট্রাল পার্ক ও রাজীব চক মেট্রো স্টেশনে বাড়তি নজরদারির জন্য নতুন সিসিটিভি ক্যামেরাও বসানো হয়। এ দিকে গতকাল বিকেলে কর্মসূচি শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে দ্বিতীয়বারের মতো তার নিজ বাসা থেকে আটক করে পুলিশ। এর এক ঘণ্টার মধ্যে যন্তর মন্তর এলাকা থেকে আটক করা হয় দলের আরেক নেত্রী নেহা বোরাকেও।

সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, নির্বাচনী ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ এনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে দলটি। এর আগে বৃহস্পতিবার দলটির শীর্ষ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটকের প্রতিবাদে এই পদযাত্রার ডাক দেয়া হয়। যন্তর মন্তরে জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেন্ট্রাল পার্ককে বিকল্প হিসেবে বেছে নেয় সিজেপি। এ কর্মসূচিতে অভিজিৎ দীপকেসহ অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা এবং আম আদমি পার্টির (আপ) শীর্ষ নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে নয়াদিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের (এনডিএমসি) পক্ষ থেকে প্রশাসনিক অজুহাতে দুই দিনের জন্য পার্কটি অবরুদ্ধ রাখার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। প্রতিবাদ মিছিল প্রতিরোধে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন আম আদমি পার্টির দিল্লি শাখার প্রধান সৌরভ ভরদ্বাজ। রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি মন্তব্য করেন, নিজ দেশে তিরঙ্গা ওড়াতে বাধা দেয়া ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের আচরণের নামান্তর। কর্মসূচি সফল এবং পণ্ড করার সরকারি চেষ্টা নিয়ে বর্তমানে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

এর আগে এই কর্মসূচি পণ্ড করতে সেন্ট্রাল পার্কে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন নগরীর ফুটপাথের এক বিক্রেতা। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নীতিন ওয়াসুদেও সাম্ব্রে ও বিচারপতি সঞ্জয় শর্মার বেঞ্চ সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। আদালতের অনুমতি মিললেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। এর আগে ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া শত শত আন্দোলনকারীকে আটক করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ দিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ এই উত্তাল পরিস্থিতির পেছনে বিদেশী চক্রান্তের গন্ধ পাওয়ার কথা জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। লক্ষেèৗতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, ‘বাংলাদেশের আদলে’ রাজপথের গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ভারতে অরাজকতার মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের ষড়যন্ত্র চলছে। তার মতে, তরুণদের উসকে দিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অচল করাই বিরোধীদের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে কংগ্রেসের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের স্লোগান সংবিধানের মৌলিক রূপরেখা ধ্বংসের প্রয়াস বলে তিনি দাবি করেন। বিতর্ক আরো বাড়িয়ে তোলে বিজেপিপন্থী সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত আন্দোলনকারী নেহা বোরার একটি ৩৯ সেকেন্ডের সাক্ষাৎকার। ভিডিওতে তাকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়ার কথা স্বীকার করতে দেখা যায়। তবে ওই প্রচারিত ভিডিওর সময়কাল ও সঠিকতা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি।

বাসা থেকে আটক অভিজিৎ দীপকে: ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ (জাতীয় পতাকা ওড়াও) পদযাত্রা কর্মসূচি শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো হেফাজতে নিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় (এসআইআর) অনিয়মের প্রতিবাদে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পরপরই ১০ অক্টোবর প্রথম দফায় তাকে আটক করা হয়েছিল। কর্মসূচির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার ঠিক আগে দিল্লি পুলিশের একটি বিশেষ দল দীপকের বাসভবনে হাজির হয়ে মিছিল বন্ধের আনুষ্ঠানিক আদেশনামা হস্তান্তর করে এবং তাকে আটক করে।

ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএস) ১৬৩ ধারায় জারি করা ওই প্রশাসনিক নোটিশে উল্লেখ করা হয় যে, দিল্লির বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেস ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সব ধরনের গণজমায়েতের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। তা ছাড়া নয়াদিল্লি পৌর পরিষদ (এনডিএমসি) প্রস্তাবিত পতাকাযাত্রার কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়নি। ফলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল বের করলে তা আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। পুলিশি আদেশে আরও স্পষ্ট করা হয় যে, জাতীয় পতাকা প্রদর্শন বা বহন আইনসিদ্ধ হলেও অনুমতি ব্যতিরেকে জনসমাগম ঘটানো দণ্ডণীয় অপরাধ। ফ্ল্যাগ কোডের বিবিধ ধারা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ৩১ বছর বয়সী এই নেতাকে পতাকাবিধির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বার্তা দেয় প্রশাসন। বাসভবনে অবস্থানকালে মোহাৎমা গান্ধীর প্রতিকৃতিসংবলিত টিশার্ট ও কাঁধে তিরঙ্গা ধারণ করা দীপকে নোটিশ পর্যালোচনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাজধানীর বুকে জাতীয় পতাকা হাতে পদযাত্রার ওপর পুলিশের এই কঠোর অবস্থানে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সর্বজনীন মৌলিক অধিকার ও সভা-সমাবেশের স্বাধীনতার ওপর এমন বিধিনিষেধ আরোপ নিয়ে সুশীলসমাজ ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিক্ষোভ দমানোর নানা কায়দা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ: বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে আটক এবং চলাচলে বাধা দেয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও। কোথাও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা ও কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে, কোথাও হয়েছে ধরপাকড়। অক্টোবরের বিক্ষোভে গণগ্রেফতার ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ইতোমধ্যে একাধিক মামলা হয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় বলপ্রয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল।

বণিক বার্তা

‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন বুড়িগঙ্গার পারে মিলবে ভারী শিল্পের অনুমোদন’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, নগর পরিকল্পনাবিদদেরও আশঙ্কা, উন্মুক্ত স্থান সংকুচিত, বন্যাপ্রবাহ এলাকার সুরক্ষা দুর্বল করা এবং নদী-তীরবর্তী এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি—এ তিনটি সিদ্ধান্ত একসঙ্গে ঢাকার পরিবেশগত সংকটকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানে (ওপেন স্পেস) এবার ভারী শিল্প স্থাপনের অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে কৌশলগত বন্যাপ্রবাহ এলাকা সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়ে আবাসন প্রকল্প নির্মাণের সুযোগও দেয়া হয়েছে। অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত রাজধানীর পরিবেশ, জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি ও বাসযোগ্যতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় ভারী শিল্প স্থাপনের অনুমোদন পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কেননা বিদ্যমান শিল্প ও কলকারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এবং রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে এমনিতেই মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে এর প্রতিবেশ।

ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে ঢাকা। এ পরিস্থিতিতে ২০২২-২৩ সালে প্রণীত ড্যাপে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয় জনঘনত্ব কমিয়ে নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ, জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ এবং বন্যাপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। তবে আবাসন ব্যবসায়ী ও জমির মালিকদের আপত্তির মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভবনের উচ্চতা ও জনঘনত্বসংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন আনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই পরিকল্পনায় সংশোধনী আসে। এর বাইরে বন্যাপ্রবাহ এলাকাসহ কয়েকটি বিষয়ের সংজ্ঞাও পরিবর্তন করা হয়েছিল। নগর পরিকল্পনাবিদরা অবশ্য বলছেন, সর্বশেষ সংশোধনীগুলো আগের সব পরিবর্তনকে ছাড়িয়ে গেছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-২-এর উপসচিব মোছা. লুৎফর নাহার নাজীমের সই করা ১৪ অক্টোবরের এক প্রজ্ঞাপনে ড্যাপের তিনটি সংশোধনী আনার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রক্রিয়া ও অংশীজনদের মতামত গ্রহণ ছাড়াই এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ।

ড্যাপে রাজধানীর আইলবহর মৌজার মহানগর জরিপের ১০৪৭, ১০৪৮ ও ১০৫০ নম্বর দাগের এলাকাগুলো আগে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত ছিল। নতুন সংশোধনীতে সেগুলোকে ভারী শিল্প এলাকা হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অঞ্চলটি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী হওয়ায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ছাড়পত্র নেয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনাপত্তি বা মতামত গ্রহণের কথা বলা হয়েছে সংশোধনীতে। পাশাপাশি সিটি জরিপে হালট শ্রেণী সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত তা সংরক্ষণ এবং নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি ও কোড অনুসরণ করে রাজউকের অনুমোদন নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

ঝিলমিল ও পূর্বাচল প্রকল্প এলাকায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ কাঠা বা তার বেশি আয়তনের প্লটে নির্মাণ অনুমোদন নিলে শূন্য দশমিক পাঁচ ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) প্রণোদনার বিষয়টি আনা হয়েছে দ্বিতীয় সংশোধনীতে। আর তৃতীয় সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ড্যাপে চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ বন্যাপ্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।

ড্যাপ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীর পাড়েই সাধারণত ওপেন স্পেস রাখা হয়। এতে নদীর সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ আরো বাড়ে। ঢাকার বিশদ অঞ্চল নিয়ে পরিকল্পনাটি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত নগর পরিকল্পনাবিদ আবু মুছা মো. আবদুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ড্যাপে কিছু এলাকাকে একই সঙ্গে আবাসিক ভূমি ব্যবহার এবং জলস্রোত ওভারলে জোন বা বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের বিরোধপূর্ণ এলাকায় বন্যাপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে নেয়া হয়েছে তার উল্টো সিদ্ধান্ত।’

তিনি বলেন, ‘বন্যাপ্রবাহ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত কোনো জায়গাকে শুধু আবাসিক ভূমি ব্যবহার হিসেবে দেখিয়ে নির্মাণের অনুমোদন দেয়ার সুযোগ তৈরি হলে বন্যার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে জলাবদ্ধতা বাড়বে এবং আশপাশের এলাকায় তৈরি হবে বন্যার ঝুঁকি। ঢাকার বিদ্যমান জলাবদ্ধতা ও হিট আইল্যান্ডের মতো সমস্যাও আরো তীব্র হতে পারে। তাই এ ধরনের বিধিনিষেধ পরিবর্তনের আগে পর্যাপ্ত হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোলিক সমীক্ষা, বন্যার ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন। তা না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বহন করতে হবে নগরবাসীকে।’

নগর পরিকল্পনাবিদদের আপত্তির আরেকটি বড় কারণ বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানকে ভারী শিল্প এলাকা হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করা। তাদের মতে, জুরাইন-শ্যামপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। সেখানে উন্মুক্ত স্থানের পরিবর্তে ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ তৈরি হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়বে।

ড্যাপে ভারী শিল্পের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এ ধরনের শিল্প থেকে শব্দদূষণ, কম্পন ও প্রচুর ধোঁয়া সৃষ্টি হতে পারে, যা আশপাশের এলাকায় বসবাসের অসুবিধা তৈরি করে। লোকালয়ের কাছে ভারী শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে পরিবেশদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি এড়ানোর বিষয়েও পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

দেশ রূপান্তর

দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘ঋণের জালে বাড়ছে দরিদ্র’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আজ ১৭ অক্টোবর, জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য সেফ হোমস ফর অল’ বা ‘সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান’। বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও মানুষের অসমতা দূর করাই দিবসটির মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশে গত চার বছর ধরে অবনতি হচ্ছে দারিদ্র্য পরিস্থিতি। এতে যারা দরিদ্র, তারা আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। ঋণ শোধ করতে নতুন করে চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন কেউ কেউ। প্রয়োজনের সময় ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় গ্রামীণ দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বড় অংশকে নির্ভর করতে হচ্ছে এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও মহাজনদের ওপর। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাও পান না অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ। ফলে এসব মানুষের আর্থিক সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা, উচ্চ সুদ ও সীমিত আয়ের চাপে তারা আটকে পড়ছেন দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশে টানা চার বছর ধরে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। সব মিলিয়ে গত চার বছরে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং নারীদের চাকরি হারানোসহ বিভিন্ন কারণে দারিদ্র্যের এই বিস্তার ঘটেছে। এ ছাড়া দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে রয়েছেন প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অন্যদিকে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি খাতের ভর্তুকি দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দিলেও দেশের প্রায় অর্ধেক দরিদ্র মানুষ কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান না। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্রদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ধনীরা। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকার সুবিধা পান। বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান ১০ হাজার ৪৭২ টাকার সুবিধা।

বিদ্যুৎ খাতেও সরকারের দেওয়া ভর্তুকির বেশি সুবিধা ধনীরা পান বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির ১৫ শতাংশের কিছু বেশি পান। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান মোট ভর্তুকির ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হয় সমাজের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের জন্য।

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র: এদিকে গ্রামীণ ঋণবাজারে দরিদ্র মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে ঋণের বোঝা ও কিস্তি পরিশোধের চাপ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক বছরে গ্রামে ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বকেয়া ঋণ রয়েছে এমন পরিবারের হার ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭১ শতাংশ হয়েছে। গ্রামীণ ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই সরবরাহ করছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান।

অন্যদিকে, মহাজনী ঋণের সুদহার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত, কিছু ক্ষেত্রে তা ১০০ শতাংশও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আয়ের তুলনায় ঋণের কিস্তি বেড়ে যাওয়ায় একটি ঋণ পরিশোধ করতে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষে ঋণের বোঝা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ছে। কৃষি উৎপাদনের জন্য ঋণ নেওয়া প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরাও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাচ্ছেন না। ফলে দরিদ্র মানুষের আয় বাড়ানোর বদলে ঋণ পরিশোধের চাপই তাদের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত করছে বলে মনে করে বিআইডিএস।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ ঋণবাজারে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামে ব্যাংকের সরাসরি ঋণ দেওয়ার পরিমাণ ও বিস্তৃতি কমলেও বেড়েছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রভাব। বর্তমানে গ্রামীণ এলাকার প্রতি চারটি ঋণের তিনটিই দিচ্ছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকগুলোর মোট অগ্রিম ঋণের মাত্র ৮ শতাংশ যাচ্ছে গ্রামে, যা ২০০০ সালে ছিল ১৭ শতাংশ। গ্রামে সরাসরি ব্যাংক ঋণ পাওয়া পরিবারের হারও ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, গ্রামে ব্যাংকের প্রায় ৫ হাজার ৩০০ শাখার বিপরীতে এনজিওর শাখা রয়েছে প্রায় ২৬ হাজার। অর্থাৎ, প্রতিটি ব্যাংক শাখার বিপরীতে এনজিওর প্রায় পাঁচটি শাখা রয়েছে। এনজিওগুলোর ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা গ্রামীণ ব্যাংকিং খাতের ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন টাকার চেয়ে বেশি।

গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকার প্রতি চারটি ঋণের তিনটি বা ৭৫ শতাংশই দিচ্ছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। ফলে ব্যাংকগুলো সরাসরি কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে মূলত এনজিওগুলোকে অর্থায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ ঋণবাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

গত ১৪ অক্টোবর থাইল্যান্ডে আইএমএফের বার্ষিক সভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রশংসা পেয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও কৃষকদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। সরকারের লক্ষ্য, বহিঃস্থ অর্থনৈতিক ধাক্কার পুরো চাপ যেন সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরও অবনতি না ঘটে।

উপদেষ্টা বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কেবল তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার বিষয় নয়। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ও যুক্ত। সরকার এসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় এসব পরিকল্পনার বাস্তবসম্মত দিকগুলো উঠে এসেছে।

বিষয়টি নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৮০ লাখ মানুষের নতুন করে দারিদ্র্যে নেমে যাওয়া এবং সোয়া ছয় কোটি মানুষের দারিদ্র্যঝুঁকিতে থাকা কোনো সামান্য নীতিগত বিচ্যুতি নয়। এটি দেশের উন্নয়ন কৌশলের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের আয়কে নিরাপদ করতে না পারে, কর্মসংস্থানের মান উন্নত না করে এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সামাজিক ভিত্তি দুর্বলই থেকে যাবে। উন্নয়নের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষ শুধু দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠবে না, বরং সেখানে টিকে থাকার সক্ষমতাও অর্জন করবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

‘এলাকায় ব্যস্ত মন্ত্রী-এমপিরা’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্ব-স্ব নির্বাচনি এলাকায় জনস্বার্থে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা। বর্তমানে অধিকাংশ সংসদ সদস্যই নিজেদের এলাকায় গৃহীত কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সম্প্রতি বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় সংসদ সদস্যদের প্রতিটি এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারি বন্ধসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে শক্ত অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলীয় চেয়ারম্যানের নির্দেশের পরই পর্যায়ক্রমে এলাকায় চলে গেছেন তাঁরা। এলাকায় এখন ব্যাপক কর্মব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছেন সংসদ সদস্যরা। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি সরকার ও দেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের নাশকতার ছক যেন কোনোভাবেই বাস্তবায়নে কোথাও মব সৃষ্টি না করতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন তাঁরা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় যাতায়াত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে দুর্গাপূজার ছুটিতে অধিকাংশ সংসদ সদস্যই এখন এলাকায় অবস্থান করছেন। হিন্দু সম্প্রদায় যাতে নির্বিঘ্নে শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপন করতে পারে সে ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। একই সঙ্গে মন্ত্রী-এমপিরাও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শুরু করেছেন। কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের এমপি ও প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মো. মাজহারুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আমিরুল ইসলাম আলীম, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মাসুদুজ্জামান, রাজশাহী-৩ আসনের মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, সিলেট-২ আসনের তাহসিনা রুশদির লুনা, ফরিদপুর-৪ আসনের এমপি শহিদুল ইসলাম বাবুল প্রমুখ কর্মব্যস্ততায় সময় কাটাচ্ছেন।

দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) ও মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী কোনো নেতা-কর্মী, এমপি-মন্ত্রী অপকর্মে জড়ালে তাঁকে বা তাঁদের কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিটি এলাকা সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করা হবে। আমরা আমাদের নেতার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনের চেষ্টা করছি।’ ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনের এমপি আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দলের প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে শক্ত অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি ফ্যাসিস্টদের দোসর ও গুপ্ত-সুপ্তরা যাতে কোনোরকমের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করতে পারে সে ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। গত আট মাসে সরকার অনেক জনবান্ধব কাজ করেছে, সেগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। আমরা সেই নির্দেশনাগুলো পালনের চেষ্টা করছি। তা ছাড়া এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপনে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি। আর কোনো মব সৃষ্টিকারী অথবা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তকারীর স্থান হবে না আমার নির্বাচনি এলাকায়।’ সংসদীয় দলের সভায় দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

দলের নেতা-কর্মী ও সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের কঠোর বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘কোনো নেতা-কর্মী, এমপি-মন্ত্রী অপকর্মে জড়ালে তাঁকে বা তাঁদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিটি এলাকা সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করতে হবে।’ এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদ্যাপন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি যেকোনো মূল্যে দলীয় ঐক্য বজায় রাখার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সর্বোপরি ফ্যাসিস্টদের দোসর ও গুপ্ত-সুপ্তরা এক হয়ে দেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে যেসব ষড়যন্ত্র করছে, তার বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শক্ত অবস্থান গ্রহণেরও নির্দেশ দেন বিএনপি প্রধান। জানা যায়, স্থানীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে এখন থেকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করার পাশাপাশি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার ব্যাপারেও বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে স্বৈরাচারের কোনো দোসর বা সমর্থককে যেন কিছুতেই প্রার্থী না করা হয়। এ ছাড়া দুর্গাপূজাসহ সব সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।

‘একটি মহল দেশের বিশেষ বিশেষ জায়গায় সহিংসতা ও মব তৈরি করছে’ অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এভাবে তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।’ এ ব্যাপারে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব এমপিকে এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এদের সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে প্রত্যেক এমপিকে। কারণ এরা সুযোগ পেলে যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে বড় ধরনের অঘটন ঘটাতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় হাইকমান্ডের এমন বার্তা পাওয়ার পরই রাজধানী ছাড়েন বেশির ভাগ সংসদ সদস্য।