মানুষের মুখ শুধু মুখ নয়। এখানে জমে থাকে মানুষের পরিচয়। থাকে জীবনের ছবি। হাসি থাকে, দুঃখ থাকে, কান্না থাকে, মান থাকে, অভিমান থাকে, সুখ থাকে, কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে জীবনের দীর্ঘ এক কষ্টের ইতিহাস। গোপন করা, কিংবা হজম করা কষ্টবোধ। নাক দিয়ে আমরা শুধু নিঃশ্বাস নিই না। নাক আমাদের মুখের সৌন্দর্যেরও একটি বড় অংশ। কান দিয়ে আমরা শুধু শব্দ শুনি না। কান আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের একটি দরজা। প্রিয়ার ফিস ফিস শব্দ জীবন জুড়ে জড়িয়ে দেয় সুখের চাদর। গলা দিয়ে শুধু কথা বলি না। আমাদের কণ্ঠস্বরেই তো মানুষ চিনে নেয় মানুষকে। অন্ধজনও কণ্ঠ শুনে চিনতে পারে অদেখাজনকে।
তাহলে প্রশ্ন আসে— নাকের সমস্যা হলে ইএনটি চিকিৎসক, নাকি প্লাস্টিক সার্জন? কানের সমস্যা হলে কার কাছে যাবো? মুখমণ্ডলের কোনো জন্মগত ত্রুটি থাকলে? দুর্ঘটনায় মুখের গঠন নষ্ট হলে? অপারেশনের পর যদি প্রয়োজন হয় শরীরের কোনো অংশ পুনর্গঠনের? তখন কার কাছে যাবো? এখানেই আসে ইএনটি ও প্লাস্টিক সার্জারির সম্পর্ক। অর্থাৎ ইএনটি বনাম প্লাস্টিক সার্জারি। বনাম না বলে বলতে পারি পাশাপাশি পথচলা।
ইএনটি—Ear, Nose and Throat—চিকিৎসার মূল ক্ষেত্র কান, নাক ও গলার রোগ এবং এসব অঙ্গের কার্যকারিতা। কানের শ্রবণ সমস্যা, কানের সংক্রমণ, নাকের শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, সাইনাস, গলার বিভিন্ন রোগ, কণ্ঠস্বর ও গিলতে সমস্যা—এসব চিকিৎসায় ইএনটি বিশেষজ্ঞের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে প্লাস্টিক সার্জারি শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোর চিকিৎসা নয়। এর একটি বড় অংশ হলো reconstructive surger—অর্থাৎ হারিয়ে যাওয়া বা বিকৃত হয়ে যাওয়া গঠন ও কার্যকারিতা যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনা। জন্মগত ত্রুটির শিশুটির দিকে একবার তাকান। হয়তো তার ঠোঁটকাটা। হয়তো তালুকাটা। হয়তো কানের গঠন স্বাভাবিক নয়। হয়তো মুখের কোনো অংশ জন্ম থেকেই অসম্পূর্ণ। শিশুটি তো জানে না—কেন অন্য শিশুর মুখে হাসি এত সহজ, আর তার হাসির দিকে তাকিয়ে কেউ কেউ কেন থমকে যায়! ফিরিয়ে নেয় মুখ! তার মা জানেন। বাবা জানেন। রাতের নীরবতায় সেই মা হয়তো সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই হাজারটা প্রশ্ন করেন। আমার সন্তান কি একদিন অন্য সবার মতো স্বাভাবিকভাবে হাসতে পারবে? স্কুলে গেলে কেউ তাকে নিয়ে হাসবে না তো? সে কি ঠিকমতো কথা বলতে পারবে? খেতে পারবে? নিজের মুখ আয়নায় দেখে একদিন কি সে নিজেই খুশি হবে? এখানে চিকিৎসা শুধু শরীরের নয়। এখানে চিকিৎসা একটি পরিবারের স্বপ্নেরও। ক্লেফট লিপ ও প্যালেটের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক সার্জারি, ইএনটি, ডেন্টাল ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞের সমন্বিত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ একটি শিশুর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য শুধু ঠোঁটের আকৃতি ঠিক করলেই সব শেষ হয় না। কথা বলা, শ্রবণ, দাঁত ও চোয়ালের বিকাশ, খাওয়ার সক্ষমতা—সবকিছুর দিকেই নজর দিতে হয়। আবার দুর্ঘটনার কথা ভাবুন। একটি সড়ক দুর্ঘটনা। একটি আগুন। একটি আঘাত। একটি মুহূর্ত।
এক মুহূর্তেই মানুষের মুখের স্বাভাবিক সৌন্দর্য বদলে যেতে পারে। কখনো নাকের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কখনো কান। কখনো মুখের নরম টিস্যু। কখনো এমন ক্ষত তৈরি হয়, যা শুধু ওষুধে বা সাধারণ চিকিৎসায় আগের অবস্থায় ফেরানো সম্ভব নয়। তখন চিকিৎসকের সামনে শুধু একটি ক্ষত থাকে না। থাকে একজন মানুষ। তার মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো সে একদিন বলবে— আমি কি আবার আগের মতো মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারবো? প্লাস্টিক সার্জারির reconstructive surgery সেই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রয়োজন অনুযায়ী skin graft, flap surgery, scar revision, facial reconstruction কিংবা অন্যান্য পুনর্গঠনমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গের গঠন ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।
আর নাকের কথা?
নাকের ভেতরের septum বাঁকা হয়ে শ্বাস নিতে সমস্যা হলে সেটি এক ধরনের চিকিৎসা। আবার নাকের বাইরের গঠন পুনর্গঠনের প্রয়োজন হলে বিষয়টি অন্য রকম। কোনো কোনো জটিল ক্ষেত্রে functional I aesthetic—দুই দিকই বিবেচনায় নিতে হয়।
কানের ক্ষেত্রেও একই কথা। শ্রবণশক্তির সমস্যা এক বিষয়। কানের বাইরের গঠনগত ত্রুটি আরেক বিষয়। আবার জন্মগতভাবে কানের গঠন অসম্পূর্ণ হলে reconstructive procedure প্রয়োজন হতে পারে।
তাই ইএনটি বনাম প্লাস্টিক সার্জারি—এভাবে দেখলে হয়তো বিষয়টি ভুলভাবে দেখা হয়। বরং বলা যায়— কখনো ইএনটি চিকিৎসাপত্র প্রয়োজন। কখনো প্লাস্টিক সার্জারি। কখনো কখনো দু’জনকেই প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিটি অঙ্গ আলাদা হলেও মানুষটি আলাদা নয়। একজন রোগীর নাকের ভেতরের সমস্যা ইএনটি চিকিৎসক দেখবেন। কিন্তু সেই নাকের বাইরের গঠন পুনর্গঠনের প্রয়োজন হলে প্লাস্টিক সার্জনের দক্ষতাও প্রয়োজন হয়। কোনো দুর্ঘটনায় মুখের গভীর ক্ষত হলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত চিকিৎসা রোগীর জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হতে পারে। চিকিৎসা তখন প্রতিযোগিতা নয়। চিকিৎসা তখন সহযোগিতা। একজন চিকিৎসক হয়তো ফিরিয়ে দেন শ্বাসের স্বস্তি। আরেকজন ফিরিয়ে দেন মুখের স্বাভাবিক গঠন। কেউ ফিরিয়ে দেন শ্রবণের সম্ভাবনা। কেউ ফিরিয়ে দেন হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস। সবশেষে তো লক্ষ্য একটাই— মানুষটিকে তার স্বাভাবিক জীবনের যতটা সম্ভব কাছাকাছি ফিরিয়ে দেয়া। আমরা আয়নায় নিজের মুখ দেখি। একটু সুন্দর দেখালে ভালো লাগে। আর মুখে কোনো পরিবর্তন দেখলে মন খারাপ হয়। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে আয়না শুধু আয়না নয়। আয়না কখনো কখনো একটি দীর্ঘশ্বাস।
সেই দীর্ঘশ্বাসের জায়গায় হাসি বা আননন্দ হয়, যদি চিকিৎসাবিজ্ঞান দাঁড়াতে পারে, তবে সেটিই তো চিকিৎসার সবচেয়ে সুন্দর মানবিক মুখ বা সুফল। ইএনটি আর প্লাস্টিক সার্জারি তাই একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। দুই ভিন্ন দক্ষতা। কখনো আলাদা পথ। কখনো একই পথের দুই সহযাত্রী। কারণ শরীরের কোনো একটি অংশের চিকিৎসা করতে গিয়ে চিকিৎসক আসলে শুধু একটি অঙ্গকে দেখেন না— তিনি দেখেন একজন মানুষকে। আর মানুষকে সুস্থ করে তোলার চেয়ে বড় সৌন্দর্য আর কী হতে পারে? প্লাস্টিক সার্জারি শরীরের নানা অঙ্গ সুন্দর করার চেয়ে যে কাজটি করতে পারে তা হলো আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে আশাহত মানুষকে আশার আলো দেখায়। জীবনের রূপ সৌন্দর্যকে পাল্টিয়ে দেয়। সুখ দেয় শান্তিময় করে জীবনকে।
