সৃজনশীলতার উৎসবে মেতে উঠেছে বাঙালি

ফন্ট সাইজ:

চারদিকে ঢাকের আওয়াজ, মাঠে কাশফুলের দোলা, নীল আকাশে মেঘের উড়ে যাওয়ার মাঝে বাঙালি মেতে উঠেছে সৃজনশীলতার আনন্দে। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে কলকাতা এই সময়ে ধরা পড়েছে অন্য আলোকে। বিশ্বের নানা প্রান্তের স্থাপত্য রীতি, এশিয়ার মন্দির শিল্প, বিভিন্ন দেশের বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প কিংবা বাংলা ছাড়িয়ে ভারতের নানা অংশের কারুশিল্পের ভিড়ে কলকাতার পূজামণ্ডপগুলো এক অন্য চেতনায় প্রস্ফুটিত। সেই সঙ্গে রয়েছে বহুমুখী বিষয়-ভাবনা। শিল্পীর কল্পনা আর কারিগরের দক্ষতার মিলনে গড়ে উঠেছে এক একটি অনন্য নির্মাণ বৈশিষ্ট্য।

পূজার মণ্ডপকে স্থাপত্য-ভাস্কর্য-চিত্রশিল্পের নন্দনে জারিত করে তোলাই হলো থিম ভাবনা। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে কলকাতায় থিমনির্ভর পূজার রমরমা। এখন তা শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে জেলা শহরেও পৌঁছে গেছে। প্রথমদিকে থিমের নির্ভরতা ছিল বাংলার নানা প্রান্তের লোকশিল্পের ঐতিহ্য। এখন তা প্রসারিত হয়েছে নানা দিকে। নানা সময়ে।

বিষয় ভাবনায় অনন্য নজির তৈরি করেছে দক্ষিণ কলকাতার একটি পূজা। স্পর্শের অনুভবে দেবীদর্শন, দৃষ্টিহীনদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে এই ব্রেইল মণ্ডপ। যাদের চোখের সামনে শুধুই অন্ধকার, উৎসবের আলোয় তাদের অনুভূতি ঠিক কেমন- সেই ভাবনা থেকেই যোধপুর পার্কের ৯৫ পল্লী এসোসিয়েশনের এবারের থিম- ‘তমসালোক’। দৃষ্টিহীনদের জন্য এই ব্রেইল মণ্ডপে দেয়ালে হাত দিয়ে দৃষ্টিহীনরা বুঝতে পারবেন তাদের সামনের আনন্দময় জগৎকে।

উত্তর কলকাতার নলীন সরকার স্ট্রিট সার্বজনীন দুর্গোৎসবে এবারের থিম ‘জললিপি’। পুজোর থিম ঘিরে রয়েছে গঙ্গা নদী। দূষণ, বেহিসেবি নগরায়ণ, অপচয়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে গঙ্গা নদী তো বটেই, সঙ্গে সামগ্রিক ভাবে জল বাঁচানোর ভাবনাই ফুটে উঠেছে এই মণ্ডপ। মণ্ডপসজ্জা, আলো, প্রতিমার মাধ্যমে সেই বার্তাই দিতে চেয়েছেন শিল্পী সনাতন দিন্দা।

কোলাহল ও অবিরাম কর্মব্যস্ততার মাঝে কলকাতার উল্টাডাঙার একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপ দর্শনার্থীদের জন্য নিয়ে এসেছে প্রশান্তি ও আত্ম-অনুসন্ধানের পরিবেশ। ‘উল্টাডাঙা বিধান সংঘ’ এবার ‘অমূর্ত’ (যা ধরাছোঁয়ার অতীত বা নিরাকার)-এই বিমূর্ত বিষয়বস্তুকে মণ্ডপসজ্জায় ফুটিয়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে তারা দর্শনার্থীদের জাগতিক বস্তুর ঊর্ধ্বে তাকিয়ে জীবনের প্রকৃত তাৎপর্য নিয়ে ভাবার আহ্বান জানিয়েছে।
আড়ম্বর ও শব্দের ভিড়ে দাঁড়িয়ে উত্তর কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীনের ‘অরব’ মনে করিয়ে দিয়েছে কখনো কখনো নীরবতাই হয়ে উঠতে পারে গভীরতম উপলব্ধির ভাষা। এই ভাবনার মধ্যদিয়েই দর্শনার্থীদের আত্ম-অনুসন্ধান ও আধ্যাত্মিক অনুভবের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

একসময় ছন্দে গড়ে ওঠা কলকাতার ছিল নিজস্ব রূপ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শহরের জনসংখ্যা বেড়েছে, হারিয়েছে সেই রূপ। ঐতিহ্যময় ও নান্দনিক পুরনো বাড়িগুলো জীর্ণ হয়েছে বা ভেঙে সেখানে গড়ে উঠেছে অট্টালিকা। সেই অট্টালিকার আশপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ক্ষয়িষ্ণু, ভাঙাচোরা বসতি। সব মিলিয়ে শহরের চেহারা এখন ছন্নছাড়া ও ছন্দহীন। সেই ছন্দহীনতার ফলে আজকের পরিবেশ ও নাগরিক সভ্যতা যে ছন্নছাড়া পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে, মণ্ডপসজ্জার আঙ্গিকে সেই ছবিকেই তুলে ধরেছে হাতিবাগান সার্বজনীন মণ্ডপসজ্জার মূল বিষয় ‘ছন্দছাড়া ছন্নছাড়া’। ছন্দহীন নগরজীবন ও পরিবেশের ছবিই শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

দমদম পার্ক তরুণ সংঘের পুজোর থিম ‘বেনিয়া কথা’। বঙ্গদেশের প্রাচীন বাণিজ্যের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন উদ্যোক্তারা। মধ্যপ্রদেশের গোন্ড আদিবাসী সমপ্রদায়ের প্রাচীন শিল্পকলার সঙ্গে বাঙালির পরিচিতি ঘটাতে দমদম পার্ক তরুণ সংঘের ক্যানভাস সাজানো হয়েছে। এই চিত্রকলায় প্রকৃতি, গাছপালা, পশুপাখি এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার গল্পকে ফুটিয়ে তোলা হয় সূক্ষ্ম রেখা ও বিন্দুতে। সেখানকার শিল্পীরাই তাদের লোকশিল্পকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
দক্ষিণ কলকাতার ৬৬ পল্লীর পুজোর থিম মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি পেন্টিং। মহারাষ্ট্রের উত্তর সহ্যাদ্রি অঞ্চলের ‘ওয়ারলি’ নামক উপজাতিদের এটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প। এই শিল্পে মূলত জ্যামিতিক আকার যেমন- বৃত্ত, ত্রিভুজ এবং বর্গক্ষেত্র ব্যবহার করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নাচ, চাষাবাদ এবং উৎসবের ছবি দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়। ৬৬ পল্লীর মণ্ডপও তেমন ভাবেই সেখানকার শিল্পীদের হাতে সেজে উঠেছে।
হাতিবাগান সার্বজনীনের পুজোয় মধুবনী পেন্টিংয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কলকাতার হলুদ ট্যাক্সি। মিথিলার এই লোকশিল্পের ক্যানভাসে ঠাঁই পেয়েছে পুরনো কলকাতার রকের আড্ডা, চায়ের ঠেক, রিকশা, ট্রাম থেকে ফুচকাওয়ালা। বিহার থেকে আসা পাঁচজন শিল্পীর তুলির টানে কলকাতা মিলেমিশে গিয়েছে মধুবনীর শৈলীতে।

বেহালা নতুন দলে আবার বাংলার পটচিত্রই প্রাধান্য পেয়েছে। মেদিনীপুরের পিংলার পটচিত্রই সেখানে মুখ্য উপজীব্য। পটুয়া পাড়ার জনাপাঁচেক শিল্পী কলকাতার মণ্ডপে এসে কাজ করছেন। পটচিত্রের নিজস্ব অঙ্কনরীতিতে সেজে উঠেছে ক্যানভাস।

হুগলি জেলার চুঁচুড়া চাঁপাতলা সার্বজনীন এবার বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগকে ফিরিয়ে এনেছে। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি উত্তমের একাল- সেকাল দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শকরা। উত্তরপাড়া বলাকা সংঘের থিম ‘মহাকাশে মহাবোধন’। মহাকাশের রহস্যময় জগৎকে দুর্গাপূজার ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। মণ্ডপ জুড়ে ফুটে উঠেছে গ্রহ-নক্ষত্র। প্যান্ডেলে ঢুকলেই মহাজাগতিক আবহের ছোঁয়া।