‘এক হাতে প্রদীপ্ত ত্রিশূল, অন্য হাতে বিচারকের গ্যাভেল। কাঠগড়ায় অপরাধী, পাশে আইনজীবীর পোশাকে দেবী দুর্গার চার সন্তান। আর সাক্ষীর চোখ বাঁধা, কানে তুলো। নারীর প্রতি নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে এমনই প্রতীকী বার্তা নিয়ে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে সাজানো হয়েছে ‘মাতৃ আদালত’ নামের ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজা মণ্ডপ। অন্যদিকে, একই উপজেলার আরেক মণ্ডপে দেবী দুর্গাকে অন্নপূর্ণা রূপে তুলে ধরে ক্ষুধা, অভাব ও খাদ্যনিরাপত্তার বার্তা দিয়েছেন আয়োজকরা।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সমকালীন সামাজিক সংকটকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরা এই দুই আয়োজন দর্শনার্থীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। এর মধ্যে পশ্চিম পোপাদিয়া শ্রী শ্রী ভুবনেশ্বরী সার্বজনীন মাতৃমন্দিরের ‘মাতৃ আদালত’ নারীর প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। আর বীণাপাণি পূজামণ্ডপের অন্নপূর্ণা রূপের উপস্থাপনায় উঠে এসেছে প্রতিটি মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা।
বৃহস্পতিবার বোয়ালখালীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে ব্যতিক্রমী এসব আয়োজন দেখেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। বীণাপাণি পূজামণ্ডপের ভাবনা, আলোকসজ্জা ও কারুকাজের প্রশংসা করেন তিনি। এ সময় পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পশ্চিম পোপাদিয়া শ্রী শ্রী ভুবনেশ্বরী সার্বজনীন মাতৃমন্দিরের ‘মাতৃ আদালত’ মণ্ডপে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে আদালতের আদলে সাজানো মঞ্চ। বিচারকের আসনে দেবী দুর্গা, কাঠগড়ায় মানুষরূপী অপরাধী। আইনজীবীর পোশাকে দেবীর চার সন্তান গণেশ, সরস্বতী, লক্ষ্মী ও কার্তিক। অন্যদিকে চোখ বাঁধা ও কানে তুলো দেয়া সাক্ষীর প্রতীকী উপস্থাপনা যেন অন্যায় দেখেও না দেখার এবং শুনেও না শোনার সামাজিক প্রবণতাকে সামনে আনে।
মন্দিরের স্থায়ী কমিটির কোষাধ্যক্ষ এবং মণ্ডপটির পরিকল্পনা ও সাজসজ্জার দায়িত্বে থাকা জেকি ঘোষ মুন্না বলেন, যুগে যুগে নারীর ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও অবিচারের চিত্র তুলে ধরতেই তাদের এই আয়োজন। প্রতীকীভাবে বিচারভার মায়ের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। কাঠগড়ায় অপরাধী এবং চোখ বাঁধা, কানে তুলো দেয়া সাক্ষীর মাধ্যমে সমাজের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বলেন, সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ ও দ্বাপর যুগ পেরিয়ে কলিযুগেও নারীর প্রতি অন্যায় থামেনি। ধর্মীয় আবহের সঙ্গে বর্তমান সময়ের বাস্তবতা যুক্ত করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সচেতন করাই তাদের উদ্দেশ্য।
মন্দিরের স্থায়ী কমিটির সভাপতি জুয়েল দাশ বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হয়েছে। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘মাতৃ আদালত’ দর্শনার্থীদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তারা আশাবাদী। ২০০৮ সালে এই মন্দিরে দুর্গাপূজা শুরু হয়। এ বছর পূজা আয়োজনের ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে।
বোয়ালখালীর বীণাপাণি পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে এবার অন্নপূর্ণা রূপে উপস্থাপন করেছেন আয়োজকরা। মানুষের ক্ষুধা, অভাব-অনটন ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে এই ভাবনায়। মণ্ডপটির আলোকসজ্জা ও কারুকাজের পাশাপাশি সামাজিক বার্তাও নজর কেড়েছে দর্শনার্থীদের। মণ্ডপটি পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, অনেক মন্দির ও পূজামণ্ডপ দেখলেও এখানকার ভাবনা তার কাছে আধুনিক ও ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। আয়োজনটিতে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পূজামণ্ডপের সভাপতি প্রবীর চৌধুরী বলেন, হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে অন্নপূর্ণা অন্ন প্রাচুর্যের দেবী। তিনি দেবী পার্বতীর একটি রূপ। এখানে দুর্গাকে শুধু অসুরবিনাশিনী শক্তি হিসেবে নয়, মানুষের জীবন রক্ষা, মমতা ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মূল বার্তা- পৃথিবীতে কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে, প্রতিটি ঘরে যেন খাবার থাকে।
এবার চট্টগ্রাম জেলায় দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, গতবারের তুলনায় এবার জেলায় নতুন প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ যুক্ত হয়েছে। সারা দেশে সার্বজনীন পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি। দুর্গোৎসব ঘিরে সরকারি সহায়তার পরিমাণ ও আওতাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসক বলেন, উৎসবের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সরজমিন দেখতে পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করা হচ্ছে। কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে প্রশাসন কাজ করছে। দুর্গোৎসব ঘিরে চট্টগ্রামে নিরাপত্তার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। শুক্রবার থেকে জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। এ কাজে দায়িত্ব পালন করবেন ১২ হাজার আনসার সদস্য এবং পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য।
