প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ ফি ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করেছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। ১লা অক্টোবর থেকেই এই ফি কার্যকর হয়েছে। হঠাৎ প্রবাসীদের কল্যাণ ফি বাড়ানোর পেছনে ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও তহবিলের ওপর বাড়তি চাপের কথা বলেছে বোর্ড। ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ ১১ বছর ফি অপরিবর্তিত থাকলেও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, চিকিৎসা সহায়তার পরিধি সম্প্রসারণ এবং প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনার ব্যয় বৃদ্ধিতে বোর্ডের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে চিকিৎসা সহায়তা ও মরদেহ দেশে আনার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় বিদ্যমান সেবা অব্যাহত রাখতে ফি পুনর্নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বোর্ডের যুগ্ম সচিব ও রেইজ প্রকল্পের পরিচালক ড. এটিএম মাহবুব উল করিম। মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ফি বৃদ্ধির যৌক্তিকতা, বোর্ডের আর্থিক পরিস্থিতি, প্রবাসীদের কল্যাণে ব্যয়ের খাত এবং ভবিষ্যৎ তহবিল সংকটের আশঙ্কাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন।
ড. এটিএম মাহবুব উল করিম বলেন, কল্যাণ ফি সম্পূর্ণ প্রবাসী কর্মীদের টাকা। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই অর্থ দিয়ে তহবিল গড়ে উঠেছে। এখানে সরকারের রাজস্বের কোনো টাকা নেই। বিদেশে যাওয়ার সময় কর্মীরা একবার এই ফি দিয়ে বোর্ডের আজীবন সদস্য হন। আজীবন সদস্যপদের বিপরীতে তারা এবং তাদের পরিবার বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমূলক সেবা পান।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালে যখন কল্যাণ ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন প্রতি ডলারের মূল্য ছিল ৮২ টাকা। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে তা ১২৩ টাকার আশপাশে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সব ধরনের ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অথচ ১১ বছর ধরে কল্যাণ ফি অপরিবর্তিত ছিল। হিসাব অনুযায়ী, ফি প্রায় ৭ হাজার থেকে ৭ হাজার ২০০ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও তা ৫ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে প্রবাসীদের কথা চিন্তা করেই।
ব্যয়ের চাপ বাড়ছে উল্লেখ করে ড. মাহবুব উল করিম বলেন, প্রবাসী কর্মীদের জন্য বোর্ডের সেবার পরিধি আগের তুলনায় বেড়েছে। তাদের সন্তানদের পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি ও অনার্স পর্যায়ে শিক্ষাভাতা দেয়া হচ্ছে। প্রতিবন্ধী সন্তানদের সাত বছর পর্যন্ত ভাতা দেয়া হয়। চিকিৎসা সহায়তার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। আগে চিকিৎসা সহায়তা ছিল ৫০০ টাকা। পরে তা এক লাখ ও দেড় লাখ টাকা করা হয়। বর্তমানে এককালীন সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বোর্ডে আসা আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশই চিকিৎসা সহায়তা সংক্রান্ত। প্রতি মাসে অন্তত ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা শুধু অসুস্থ ও আহত প্রবাসীদের চিকিৎসা সহায়তায় ব্যয় হচ্ছে।
ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাপ তুলে ধরে মাহবুব উল করিম বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বোর্ডের ব্যয় ছিল আয়ের ৫৬ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬৮ শতাংশ হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যয়ের হার প্রায় ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এভাবে ব্যয় বাড়তে থাকলে ফি সংশোধন না করা হলে আগামী তিন বছরের মধ্যে বোর্ডের তহবিল শূন্য হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারকে বর্তমানে দেয়া সেবাগুলো অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে আমাদের জন্য।
মরদেহ দেশে আনতেই ব্যয়ের বড় অংশ: প্রবাসী কর্মীদের মরদেহ দেশে আনার ব্যয়কে কল্যাণ ফি বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ড. মাহবুব উল করিম। তিনি বলেন, বোর্ডের মোট ব্যয়ের প্রায় ৯২ শতাংশ প্রবাসীদের কল্যাণে ব্যয় হয়। আর কল্যাণ খাতে ব্যয় হওয়া অর্থের প্রায় ৫০ শতাংশই খরচ হয় বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী কর্মীদের মরদেহ দেশে আনার কাজে।
তিনি বলেন, বিদেশে কোনো কর্মী মারা গেলে হাসপাতালের বকেয়া বিল, আইসিইউ’র খরচ, মর্গের চার্জসহ বিভিন্ন ব্যয় পরিশোধ করে মরদেহ দেশে আনতে হয়। একেকটি মরদেহ দেশে আনতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সদস্য প্রবাসী কর্মীদের মরদেহ বিনা খরচে দেশে আনার ব্যবস্থা করে।
ড. মাহবুব উল করিমের দাবি, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান এমনকি ফিলিপাইনের মতো দেশেও সব প্রবাসী কর্মীর মরদেহ বিনা খরচে দেশে আনার এমন ব্যবস্থা নেই। সাধারণত সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে চুক্তি থাকলে তাদের খরচে মরদেহ দেশে পাঠানো হয়।
মরদেহ দেশে আনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৩ সালে দুই হাজারের বেশি মরদেহ দেশে এসেছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ হাজার ২০০। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্তই ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি মরদেহ দেশে এসেছে। এ বছর মরদেহ দেশে আনার পেছনে ব্যয় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারেও বলে ধারণা করছেন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, একজন প্রবাসী কর্মী সারা জীবনে একবার ৫ হাজার ৫০০ টাকা কল্যাণ ফি দিয়ে থাকেন। অথচ তার মরদেহ দেশে আনতেই প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। এর বাইরে দাফন-কাফন ও পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মৃত কর্মীর পরিবারকে বোর্ড থেকে তিন লাখ টাকা সহায়তা দেয়া হয়। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকলে আইনি প্রক্রিয়ায় তা আদায়ের ব্যবস্থাও করা হয়। এতগুলো সেবা দেয়ার বিপরীতে আজীবনে একবার ৫ হাজার ৫০০ টাকা ফি বর্তমান বাজার হিসেবে খুব বেশি হওয়ার কথা নয়।
প্রবাসীদের টাকায় চলে বোর্ড: সরকারি ভর্তুকি প্রসঙ্গে ড. মাহবুব উল করিম বলেন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিজস্ব তহবিলে সরকারের রাজস্বের কোনো অর্থ নেই। প্রবাসীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বিভিন্ন এফডিআর ও ট্রেজারি বন্ডসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়। সেখান থেকে অর্জিত মুনাফা এবং দূতাবাস ও মিশনে বিভিন্ন ধরনের সত্যায়ন ফি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে বোর্ডের কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
