যে রাজনৈতিক ফাঁদে বন্দী আমরা সবাই!

যে রাজনৈতিক ফাঁদে বন্দী আমরা সবাই!

ফন্ট সাইজ:

আমাদের রাজনীতি যেন এক চিরন্তন কসাইখানা, যেখানে যুগের পর যুগ ধরে নির্মমভাবে বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষের সততা, স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর রক্তজল করা পরিশ্রম। জনগণ স্বপ্ন দেখেন, বিশ্বাস করেন, বুকভরা আশা নিয়ে নতুন নেতৃত্বের হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তুলে দেন। অথচ সেই স্বপ্নের বিনিময়ে বারবার তাঁদের কপালে জোটে হতাশা, বঞ্চনা আর প্রতারণার দীর্ঘশ্বাস। একদিকে সাধারণ মানুষের ঘামঝরা জীবনের নির্মম বাস্তবতা, অন্যদিকে ক্ষমতার অলিন্দে দাঁড়িয়ে একশ্রেণির ভণ্ড, প্রতারক ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকের আখের গোছানোর উৎসব! নীতি, নৈতিকতা ও আদর্শের কথা যত জোরে মাইকে উচ্চারিত হয়, বাস্তব রাজনীতিতে তার নগ্ন প্রতারণা ও দেউলিয়াত্ব ততটাই প্রকট হয়ে ওঠে। নির্বাচনের আগে জনগণের দরজায় দরজায় ঘুরে নেতারা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ান। তাঁদের মুখে তখন দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন, ঘুষমুক্ত প্রশাসনের অঙ্গীকার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়। কিন্তু ক্ষমতার মসনদে বসামাত্রই সেই প্রতিশ্রুতির রং ফিকে হতে শুরু করে, আর মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে তাঁদের বিষাক্ত আসল চেহারা।

তখন সাধারণ মানুষের মনে একের পর এক প্রশ্নের জন্ম নেয়—প্রতিশ্রুতির সঙ্গে শাসনের এত বিশাল ব্যবধান কেন? যে শোষক ও অপরাধীদের বিতাড়িত করে মানুষ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তাদেরই উত্তরসূরিরা কিংবা নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত একই ধরনের কতিপয় সুবিধাবাদীরা কেন আবার মানুষের ঘাড়ে চেপে বসে? কেন পুরোনো অপরাধগুলো নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ে, নতুন চেহারায়, নতুন সিন্ডিকেটের হাত ধরে দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে আসে? কেন বারবার সরকার বদলায়, নেতৃত্ব বদলায়, রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়, অথচ সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায় না? এই প্রশ্নগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনীতির গভীরে শেকড় গেড়ে বসা এক ভয়াবহ সংকটের প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে জঘন্য সংকট এখানেই—বিরোধী দলে থাকলে অনেকে নীতি-নৈতিকতার ফেরিওয়ালা, আর ক্ষমতায় গেলেই তাঁদের একাংশ হয়ে ওঠেন সেই শোষক, যাদের বিরুদ্ধে একসময় তাঁরা নিজেরাই সোচ্চার ছিলেন। রাজপথে দাঁড়িয়ে আদর্শের ভাষণ, জনসভায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা, ক্যামেরার সামনে জনগণের প্রতি দরদ—সবকিছুই যেন তখন বিশ্বাস অর্জনের রাজনৈতিক অভিনয়। কিন্তু রাতের অন্ধকারে, বন্ধ দরজার ওপারে, আলো নিভে গেলে শুরু হয় অন্য এক রাজনীতি। সেখানে জনগণের অধিকার নয়, মুখ্য হয়ে ওঠে ক্ষমতার ভাগাভাগি; দেশপ্রেম নয়, প্রাধান্য পায় অবৈধ অর্থের লেনদেন; জনসেবা নয়, প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার পর থেকে দুর্নীতির যে বহুমুখী বিস্তার আমরা দেখেছি, তা কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির অপরাধ নয়; এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়, প্রশাসনিক দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সুসংগঠিত তৎপরতা। সন্ত্রাস, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও মাদকের ব্যবসা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে এই যোগসাজশের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দল বদলায়, শাসক বদলায়, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের ঘাড়ের ওপর চেপে বসা এসব রাজনৈতিক ব্যাধির দৌরাত্ম্য যেন কিছুতেই কমে না।

প্রতিটি রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা দেয়। অথচ বাস্তবতা এমন যে, বছরের পর বছর ধরে একই প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে মানুষ এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে তার বাস্তবায়নের হিসাব জানতে চায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা হয়, সভা হয়, বিবৃতি আসে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো, সরকারি দপ্তরে ঘুষের দৌরাত্ম্য কতটা কমল, চাঁদাবাজির শিকার মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হলো—সেই হিসাব কোথায়? সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, কর্মসংস্থানের সংকট তীব্র হয়, ব্যবসায়ীরা অবৈধ চাপের মুখে পড়েন, আর অসাধু চক্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নতুন নতুন পথ খুঁজে নেয়। রাজনীতিবিদদের একাংশ মুখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও বাস্তবে তাঁদেরই কেউ কেউ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ অর্থের ওপর নির্ভরশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখেন। নির্বাচনী মনোনয়ন কেনাবেচা থেকে শুরু করে ক্যাডার পোষা—রাজনীতির নানা স্তরে কালোটাকার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যতই তোপ দাগা হোক, রাজনৈতিক অর্থায়ন, অপরাধের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এসব ঘোষণা জনগণের কাছে নিছক প্রহসন হয়েই থাকবে।

রাজনীতির এই দেউলিয়াত্বের সবচেয়ে নগ্ন ও লজ্জাজনক চিত্র ফুটে ওঠে কিছু রাজনীতিবিদের অবলীলায় কোটিপতি বনে যাওয়ার ঘটনায়। যে নেতা ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে নিজের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতেও হিমশিম খান বলে দাবি করেন, বাজারে গিয়ে সওদা করার সামর্থ্যের সংকটের কথা বলেন, সেই একই ব্যক্তি ক্ষমতার সামান্য স্পর্শ পেয়েই কীভাবে বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি ও বিপুল ব্যাংক ব্যালান্সের মালিক হয়ে ওঠেন? কোন আলাদিনের প্রদীপ তাঁদের ভাগ্য বদলে দেয়? কোন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় রাতারাতি বদলে যায় তাঁদের আর্থিক অবস্থান? অবশ্যই রাজনীতিতে বৈধ উপার্জন, ব্যবসা কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্ষমতায় যাওয়ার পর অস্বাভাবিক সম্পদবৃদ্ধির অভিযোগ উঠলে তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে আপত্তি কেন? সম্পদের উৎস যাচাই, আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ এবং দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে বাধা কোথায়? যে রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষ সামান্য আয়কর কিংবা কাগজপত্রের ভুলের জন্যও জবাবদিহির মুখোমুখি হন, সেখানে ক্ষমতাবানদের সম্পদের হিসাব কেন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে? বস্তুত রাজনীতিবিদ, অসাধু ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের একাংশের পারস্পরিক যোগসাজশে যদি দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, তাহলে সেই সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অনাহার ও বঞ্চনা কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার উপকরণ হয়েই থাকবে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা যে বাংলাদেশ অর্জন করেছি, তার স্বপ্ন ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে সেই স্বপ্নের পূর্ণ প্রতিফলন কোথায়? যে কৃষক রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ফসল ফলান, উৎপাদনের ঝুঁকি নেন, ঋণের বোঝা বহন করেন, তিনি অনেক সময় তাঁর ফসলের ন্যায্য দাম পান না। অথচ মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে ভোক্তাকে একই পণ্য কিনতে দিতে হয় কয়েক গুণ বেশি দাম। উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পান না, ভোক্তা স্বস্তি পান না, কিন্তু মাঝখানের সুবিধাভোগীদের লাভের অঙ্ক ফুলেফেঁপে ওঠে। যে তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন, তাঁকে মেধা ও যোগ্যতার পাশাপাশি কখনো ঘুষ, কখনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশের দেয়ালের মুখোমুখি হতে হয়। অন্যদিকে, ক্ষমতার ছায়াতলে থাকা একশ্রেণির সুবিধাভোগী সাধারণ মানুষের ঘাম ও শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। বড় বড় সেতু, উন্নয়নের পরিসংখ্যান কিংবা প্রবৃদ্ধির চটকদার প্রচার অবশ্যই রাষ্ট্রের অর্জনের অংশ হতে পারে; কিন্তু সেসব দিয়ে মানুষের ক্ষুধা, বেকারত্ব, চিকিৎসার ব্যয়, শিক্ষার সংকট কিংবা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কষ্ট আড়াল করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল রাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষটির জীবনেও পৌঁছায়।

সংসদীয় রাজনীতির গত তিন দশকের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ বারবার আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, আবার সেই প্রদীপের আলো নিভে যেতে দেখেছেন। মানুষ এক দলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে অন্য দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। তাঁরা ভেবেছেন, এবার হয়তো দুর্নীতি কমবে, প্রশাসন জনবান্ধব হবে, বিচারব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে জনগণের সেবায় নিয়োজিত হবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই যখন প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান বাড়তে থাকে, তখন সেই বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। একপর্যায়ে হতাশ মানুষ আক্ষেপ করে বলতে শুরু করেন—“আগের আমলেই ভালো ছিলাম!” আওয়ামী লীগের দুরাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কেউ বিএনপির আগের আমলের সঙ্গে তুলনা করেছেন, কেউ অন্তর্বর্তীকালীন আমলের কথা ভেবেছেন, আবার কেউ অতীতের অন্য কোনো সময়কে তুলনামূলক ভালো বলে মনে করেছেন। এই মানসিকতা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ নয়; বরং এটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা, প্রত্যাশাভঙ্গ এবং মানুষের গভীর হতাশার বহিঃপ্রকাশ। জনগণ যেন এক ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আরেক ফাঁদে বন্দী হন। তাঁদের সামনে পরিবর্তনের নতুন প্রতিশ্রুতি আসে, কিন্তু জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে যায়।

এই সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক অন্ধকার, হতাশা ও পচনের মাঝেও দেশের সাধারণ মানুষ আজ নতুন আলোর প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে। রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের সীমাহীন ভণ্ডামি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং লুটপাটের অভিযোগে জর্জরিত পরিবেশে তিনি নিজেকে একজন ব্যতিক্রমী ও আশাজাগানিয়া রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে তাঁর নেতৃত্বের বাস্তব পরীক্ষা ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, জেল-জুলুম এবং নির্বাসনের অভিজ্ঞতা তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও পরিণত, বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের সুযোগ দিতে পারে। তাঁর ব্যক্তিগত বিনয়, মার্জিত আচরণ ও জনকল্যাণের প্রত্যয় যদি সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হয়ে ওঠে, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। কারণ মানুষ কেবল একজন ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী চান না; তাঁরা চান এমন একজন নেতা, যিনি তাঁদের কষ্ট বুঝবেন, তাঁদের অধিকারকে সম্মান করবেন এবং ক্ষমতার দাপটের পরিবর্তে দায়িত্ববোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। তবে ব্যক্তিগত বিনয় কিংবা সুন্দর বক্তব্যের চেয়ে রাষ্ট্রনায়কত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তাঁর সরকারের কর্মকাণ্ড, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনকল্যাণমূলক পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে তাঁর চারপাশে সক্রিয় পুরোনো লুটেরা, চাটুকার ও সুবিধাবাদী কিছু রাজনৈতিক চক্র। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, একজন নেতার সদিচ্ছা থাকলেই রাষ্ট্রের সব সমস্যা দূর হয়ে যায় না। ক্ষমতার আশপাশে থাকা অসাধু ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে সেই সদিচ্ছাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেন, সরকারি সিদ্ধান্তকে নিজেদের সুবিধামতো প্রভাবিত করতে পারেন এবং জনগণের কাছে পৌঁছানোর আগেই উন্নয়ন ও সেবার সুফল আটকে দিতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী যদি দেশের উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে চান, তবে মাঠপর্যায়ের অসৎ রাজনৈতিক নেতা, চাঁদাবাজ ক্যাডার এবং দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য। সরকারি অফিস-আদালতে সেবা পেতে মানুষকে যদি আগের মতোই দুর্ভোগ পোহাতে হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে যদি অবৈধ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অব্যাহত থাকে, আর রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে কেউ যদি আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ পান, তবে সরকারের সদিচ্ছার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতো একজন উদার ও জনবান্ধব নেতা যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল হতে চান, তবে তাঁকে শুধু বিনয়ী থাকলে চলবে না; এই লুটেরা রাজনীতিক ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর হতে হবে।

যে প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচার ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে লড়াই করেছেন, তাঁকেই এখন রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় সব রাজনৈতিক মাফিয়া ও অপশক্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। দুর্নীতিবাজের পরিচয় বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটি যেন বিচারের মানদণ্ড না হয়। চাঁদাবাজ, দখলদার, মাদক কারবারি কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই হোক তাঁর বিচারের ভিত্তি। দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং প্রমাণিত অপরাধের জন্য উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর চারপাশের অসৎ পরামর্শক, লোভী রাজনীতিক ও চাটুকার সিন্ডিকেটের প্রভাব থেকে রাষ্ট্র পরিচালনাকে মুক্ত করতে হবে। তবে এই কঠোরতা হতে হবে আইনের শাসন, নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক জবাবদিহির ভিত্তিতে—ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে নয়। কারণ আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক সবার জন্য একই আইন কার্যকর থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি জনগণের আস্থার প্রকৃত সম্মান রক্ষা করতে হলে তাঁকে আপসহীনভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। অসৎ রাজনীতিবিদদের প্রতি বিন্দুমাত্র অনুকম্পা না দেখিয়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশ দুর্নীতি ও শোষণের কবল থেকে মুক্তির পথে এগোতে পারবে।

রাজনীতিবিদেরা যেন মনে রাখেন, দেশের মানুষ আর ফাঁপা প্রতিশ্রুতি, চটকদার স্লোগান কিংবা কথার ফুলঝুরিতে চিরকাল ভুলে থাকবেন না। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক, আর রাজনীতিবিদেরা সেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি। রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলের কিংবা কোনো নেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় যে, তাঁরা ক্ষমতায় এসে সম্পদ লুটেপুটে খাবেন, নিজেদের লোকজনকে সুবিধা দেবেন, আর সাধারণ নাগরিকেরা চিরকাল জিম্মি হয়ে থাকবেন। জনগণের করের টাকা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার অধিকার কারও নেই। ক্ষমতার মসনদ চিরস্থায়ী নয়; আজ যিনি শাসক, কাল তাঁকেও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর করা অন্যায়ের হিসাব ইতিহাস ঠিকই কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নেয়। সময়ের বিচারে অনেক ক্ষমতাধর মানুষের নাম হারিয়ে যায়, আর কেউ কেউ স্মরণীয় হয়ে থাকেন তাঁদের অন্যায়, ব্যর্থতা ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে মানুষ আর কেবল সরকার পরিবর্তন দেখতে চান না; তাঁরা দেখতে চান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। তাঁরা চান, রাজনীতি হোক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার, দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স নয়। তাঁরা চান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হোক স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক, প্রশাসন হোক জনবান্ধব, বিচারব্যবস্থা হোক নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা হোক জনসেবার দায়িত্ব। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁরা চান এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সৎ মানুষকে অসহায় হয়ে বাঁচতে হবে না, যোগ্য তরুণকে চাকরির জন্য রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে মাথা নত করতে হবে না, কৃষককে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হবে না এবং সাধারণ ব্যবসায়ীকে চাঁদাবাজির ভয়ে দিন কাটাতে হবে না।

আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি তাঁর সহজাত বিনয়ের পাশাপাশি অপশাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লৌহকঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, যদি নিজের দলের অপরাধীদের বিরুদ্ধেও সমান কঠোরতা দেখাতে পারেন, যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন, তবে তিনি শুধু একটি সফল সরকার পরিচালনার সুযোগই পাবেন না; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে একজন শ্রেষ্ঠ ও স্মরণীয় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্থান করে নেওয়ার পথও তাঁর সামনে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু সেই মর্যাদা অর্জনের জন্য প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজের প্রমাণ, প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়ন এবং ব্যক্তিগত সদিচ্ছার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দৃঢ়তা।

পরিশেষে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি তাঁর সহজাত বিনয়ের পাশাপাশি অপশাসন ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এই লৌহকঠিন ও কঠোর পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারেন, তবে তিনি শুধু একটি সফল সরকার পরিচালনা করবেন না; বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে ও এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে একজন শ্রেষ্ঠ ও অমর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে যুগ থেকে যুগান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে খোদাই হয়ে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক,আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]

(মতামত লেখকের নিজস্ব)