স্ত্রীর মৃত্যুর তদন্ত প্রভাবিত করতে বাংলাদেশে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ, অস্ট্রেলিয়ায় আওলাদের জামিন নামঞ্জুর

স্ত্রীর মৃত্যুর তদন্ত প্রভাবিত করতে বাংলাদেশে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ, অস্ট্রেলিয়ায় আওলাদের জামিন নামঞ্জুর

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে স্ত্রী রেহানা পারভিনের মৃত্যুর তদন্ত প্রভাবিত করতে কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আওলাদ হোসেনের জামিন আবেদন নাকচ হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ব্রিসবেন ম্যাজিস্ট্রেটস কোর্টে শুনানি শেষে ভারপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট টিমোথি হিশন এ আদেশ দেন।
শুনানিতে কমনওয়েলথ প্রসিকিউটররা আওলাদের মুক্তির বিরোধিতা করেন। তাদের আশঙ্কা, জামিন পেলে তিনি আদালতে হাজিরা এড়িয়ে যেতে পারেন। সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারেন কিংবা নতুন করে অপরাধে জড়াতে পারেন।
প্রসিকিউটররা আরও জানান, কথিত ঘুষের ঘটনা এমন সময়ে ঘটেছিল, যখন তিনি প্রতারণার অন্য একটি মামলায় জামিনে ছিলেন। এ ছাড়া পাসপোর্ট ছাড়াই অস্ট্রেলিয়া ত্যাগের উপায় খোঁজার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আওলাদের আইনজীবী তরিক দিব প্রসিকিউশনের বক্তব্যের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আদালতে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগকারী নেই। অর্থ লেনদেনের প্রমাণ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, কথিত লেনদেনের কিছু অংশ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল, ফলে বিষয়টি এতটা স্পষ্ট নয়।
আইনজীবী তার মক্কেলের পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মুক্তির আবেদন জানান। আওলাদের ১৮ বছর বয়সী এক ভাতিজার দেখাশোনার দায়িত্ব রয়েছে বলেও আদালতকে জানান তিনি।
শুনানি শেষে ভারপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট টিমোথি হিশন মামলাটিকে ‘অনন্য’ বলে অভিহিত করেন। তবে আওলাদকে মুক্তি দিলে পুনরায় অপরাধ সংঘটন কিংবা আদালতে হাজিরা এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ম্যাজিস্ট্রেটের পর্যবেক্ষণ, এমন কোনো জামিনের শর্ত নেই, যা এসব ঝুঁকি যথাযথভাবে কমাতে পারে। এ কারণে তার আবেদন নাকচ করা হয়।
আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের আইনজীবী তরিক দিব জানান, তার মক্কেল ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথাও নাকচ করেছেন তিনি। মামলার কার্যক্রমে সম্ভাব্য বিলম্ব বিবেচনায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জামিনের আবেদন করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান আইনজীবী। এ বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুর দিকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। মামলার পরবর্তী কার্যক্রম আগামী বছরের শুরুর দিকে আদালতে উঠবে বলে জানা গেছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি স্থান থেকে রেহানা পারভিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আওলাদ হোসেনের স্ত্রী রেহানা পারভিন পাঁচ সন্তানের মা এবং অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের (এএফপি) অভিযোগ, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে থাকা আওলাদ হোসেনের সহযোগীদের মাধ্যমে প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। তদন্ত থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করতে এই অর্থের একটি অংশ ঘুষ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের। এ অভিযোগে গত ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। পরে গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইনস এলাকায় তার দুটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। পাশাপাশি সিডনি ও ব্রিসবেনের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ও ব্যাংকিং সংক্রান্ত নথি জব্দ করেন তদন্তকারীরা। তবে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ কিংবা স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় আওলাদের সম্পৃক্ততা—কোনোটিই এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক রেহানা স্বামী আওলাদ হোসেন ও সন্তানদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছিলেন। ২০২৪ সালের ৬ জুন কিশোরী মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে যান রেহানা। তিনি তার বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িসহ স্বজনদের বাড়িতে ছিলেন। তার স্বামী আওলাদ হোসেন ২৯ জুন বাংলাদেশে যান। তথ্য অনুযায়ী, সেখানে থাকাকালীন ২০২৪ সালের ৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ হন রেহানা। পরে রেহানার মা আইরিন আক্তার ৩১ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ ও ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের পক্ষ থেকেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরে রেহানার বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। ৮ সেপ্টেম্বর রেহানার মা বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় অপহরণ ও নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে রেহানাকে অপহরণের অভিযোগ করা হয়। তাদের মধ্যে স্বামী আওলাদ হোসেনও ছিলেন। পরে তদন্তে আরো একজনের নাম আসে।
রেহানার ননদ পাপিয়া আক্তার ও আমজাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্যের সূত্র ধরে ১২ সেপ্টেম্বর সাভারের আশুলিয়ার নয়াহাট মৌনদিয়া চৌরাপাড়া এলাকায় পাপিয়ার বাড়ির আঙিনা থেকে রেহানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাটির নিচে মরদেহটি পুঁতে রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশে চলমান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তখন অস্ট্রেলিয়ার এবিসিকে জানান, পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী ৫ জুলাই রাত আটটা থেকে দশটার মধ্যে পাপিয়ার বাড়িতে রেহানাকে হত্যা করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে, বালিশ দিয়ে মুখ চেপে তাকে হত্যা করার বিষয়সহ ঘটনার সময় রেহানার স্বামী আওলাদ বাংলাদেশেই অবস্থান কছিলেন বলে জানা যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জুন বাংলাদেশে গিয়েছিলেন অাওলাদ। ১৩ জুলাই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসেন।