রমজান মাসে ডায়াবেটিক রোগীদের খাদ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিশেষ কিছু নির্দেশনা

রমজান মাসে ডায়াবেটিক রোগীদের খাদ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিশেষ কিছু নির্দেশনা

ফন্ট সাইজ:

পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। তবে সুষ্ঠভাবে রোজা পালনের জন্য প্রত্যেক ডায়াবেটিক রোগীকে খাদ্য ও ঔষধ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নিয়ম মেনে চলতে হয়। অন্যথায় নানান ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। রমজান মাসের কমপক্ষে ১-২ মাস আগে একজন ডায়াবেটিস বা হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে নিতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা:
রোজার সময় ডায়াবেটিক রোগীর খাদ্য ব্যবস্থাপনা হতে হবে সমতা পূর্ণ ও পুষ্টি সমৃদ্ধ। রক্তের শর্করার মাত্রা দ্রুত বা অতিরিক্ত বাড়ানো বা কমানো যাবে না।
* ইফতারে পানিশূন্যতা রোধ ও বিপাক ক্রিয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি অথবা শরবৎ একটি অপরিহার্য পানীয়। তবে শরবতে চিনি বা গুড় ব্যবহার করা যাবে না। পরিবর্তে বিকল্প চিনি দিয়ে ইসবগুল, লেবু, তেঁতুল, কাঁচা আম ইত্যাদি শরবত খাওয়া যেতে পারে। ডাবের পানি পান করতে পারেন I একটি খেজুর ও সাধারণ পানি দিয়ে রোজা ভাঙতে পারেন।
* অতিরিক্ত তেলে ভাজা, চর্বিযুক্ত ও মিষ্টি খাবার(যেমন : - পিঁয়াজু, হালিম, জিলাপি) এড়িয়ে চলুন। পরিবর্তে সুপ, সালাদ, ফল (আপেল, পেয়ারা ইত্যাদি) ও সেদ্ধ শাক সবজি খান। ইফতারে কাঁচা ছোলার সাথে আদা, টমেটো, পুদিনা পাতা ও অল্প লবণ মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
* ডায়াবেটিস রোগীকে ইফতারের পর সন্ধ্যা, রাতের খাবার একেবারে বাদ দেওয়া যাবে না। ইফতার ও সেহরির মধ্যবর্তী সময়ে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর আহার খেতে হবে। এই সময় রুটি/ ভাত, মাছ/ মুরগী ও সবজির সমন্বয়ে হালকা খাবার খান  সন্ধ্যা রাতের খাবার হবে অন্যান্য সময়কার রাতের খাবারের সমপরিমাণ।
* সেহরীতে খেতে হবে অন্য সময়ের দুপুরের খাবারের সমপরিমাণ  সেহরি একটু দেরিতে খাবেন এবং খাবার হতে হবে সম্পূর্ণ ও পুষ্টিকর। জটিল শর্করা(লাল আটার রুটি, ঢেঁকি ছাঁটা লাল চালের ভাত, ওটস), উচ্চ আঁশ যুক্ত সবজি, প্রচুর প্রোটিন(মাছ, ডাল, ডিম, মুরগির মাংস) এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখতে হবে।
* পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ২-৩ লিটার পানি পান করুন, চা, কফি ও কোমল পানীয় এড়িয়ে চলুন| 
* রোজায় সকাল বেলা বেশী হাঁটাহাঁটি বা ভারী ব্যায়াম করা যাবে না, এতে রক্তের গ্লুকোজ কমে রোগীর জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। এজন্য রোজা রেখে সকাল বেলা না হেঁটে ইফতারের ১-২ ঘণ্টা পর আধা ঘণ্টা হালকা হাঁটা চলা করা যেতে পারে।

* যদি ডায়াবেটিসের সাথে অন্য সমস্যা যেমন : কিডনি রোগ, রক্তে উচ্চ মাত্রায় ইউরিক অ্যাসিড থাকে তবে ডালের তৈরি খাবার না খাওয়াই ভালো। সেক্ষেত্রে ছোলা, পেঁয়াজি ইত্যাদির পরিবর্তে চালের গুঁড়া অথবা ময়দার তৈরি সিঙ্গারা, সমুচা, আলুপুরি বা আলুর চপ ইত্যাদি পরিমাণ মতো খাওয়া যাবে।

* নিয়মিত রক্তের শর্করা পরীক্ষা : রোজায় প্রয়োজনে ৪-৬ বার রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। ইসলামি স্কলারদের মতে, রোজাকালীন সময়ে রক্তের শর্করা পরীক্ষা করলে এবং প্রয়োজনে ইনসুলিন ইনজেকশন নিলে রোজা ভঙ্গ হয় না I
কখন রক্তের সুগার পরীক্ষা করবেন?
* সেহরীর আগে * সেহরীর ২ ঘণ্টা পর, * দিনের মাঝামাঝি (Mid day)- সকাল ১১টা থেকে বিকাল ২টা,
* ইফতারির পূর্বে * ইফতারির ২ ঘণ্টা পর * দিনের যে-কোনো সময় রোগী অসুস্থ বোধ করলে যেমন হাইপোগ্লাইসেমিয়া অথবা হাইপারগ্লাইসেমিয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তের সুগার দেখুন।
কখন রোজা ভাঙবেন?
* রক্তের শর্করা ৭০ mg/L (৩,৯mmol/L) এর নীচে নামলে
* রক্তের শর্করা ৩০০mg/L( ১৬.৭ mmol/L) এর বেশী হলে
* হাইপোগ্লাইসেমিয়া অথবা হাইপারগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে( প্রচুর ঘাম, মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা ইত্যাদি)
* পানিশূন্যতার লক্ষণ( অতিরিক্ত পিপাসা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, মাথা ঝিম ঝিম করা)।
* কোনো তীব্র অসুস্থতা( জ্বর, সংক্রমণ)

রোজা রেখে সকাল বেলা না হাঁটাই ভালো, কারণ এতে রক্তের সুগার কমে যেতে পারে। তবে ইফতারের ১-২ ঘণ্টা পরে আধা ঘণ্টা হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। রমজানে তারাবির নামাজকে প্রতিদিনের ব্যায়াম হিসাবে গণ্য করা হয়।


রমজান মাসে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মূল চাবিকাঠি হলো-
* প্রাক- রমজান প্রস্তুতি।
* ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনা।
* নিয়মিত রক্তের সুগার পরীক্ষা।
* চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন।
সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতার মাধ্যমে অধিকাংশ ডায়াবেটিক রোগী নিরাপদে রোজা পালন করতে পারে।


লেখক
ডাঃ অনন্ত কুমার কুন্ডু
ডায়াবেটিস ও হরমোন জনিত রোগ ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ
চেম্বারঃ আলোক হেলথ কেয়ার, মিরপুর-১০
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন