ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে নামে-বেনামে ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করার প্রমাণ পাওয়ার পরও ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) সাবেক চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে রিটকারীর আবেদন আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ও অ্যাডভোকেট বিপ্লব কুমার দাশ। এর আগে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারের আমানতকারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও ইবিএলের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম জনস্বার্থে এ রিটটি দায়ের করেন।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক(১) ধারা অনুযায়ী কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। অথচ ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবার সরাসরি ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ১১ দশমিক ১২ শতাংশ—অর্থাৎ সর্বমোট ২১ দশমিক ১১ শতাংশ (প্রায় ৩৩ কোটি ৬৭ লাখ) শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তেও ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার কুক্ষিগত রাখার প্রমাণ মিললেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে রিটে বলা হয়, শওকত আলী চৌধুরী তাঁর শতভাগ পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘এস.এন. করপোরেশন’-এর বেতনভুক্ত কর্মচারী নইমুল হক, তাঁর স্ত্রী সালমা শিরীন এবং নিজের শ্যালিকা অনিকা তাহজীবকে ‘ডামি’ বা প্রক্সি শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মাত্র ১ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের কাগুজে প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আরুশা অ্যান্ড কোং’ (৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার) এবং ‘আনিকা শেয়ার্স অ্যান্ড সিকিউরিটিজ’ (১ দশমিক ১৪ শতাংশ শেয়ার)-এর মাধ্যমে এই বিপুল শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নথিপত্র অনুযায়ী, আরুশা অ্যান্ড কোম্পানির সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে শওকত আলীর শ্যালিকা ও মেয়ের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল এবং শ্যালিকা ও শওকত আলীর স্থায়ী ঠিকানাও একই (২৮ সুরসন রোড, চট্টগ্রাম)।
তদন্ত অনুযায়ী, মাত্র ১ লাখ টাকা মূলধনের প্রতিষ্ঠান ‘আরুশা অ্যান্ড কোং’ ২০০৯ সালের পর নতুন কোনো শেয়ার ক্রয় না করলেও নিয়মিত বোনাস শেয়ার পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৩৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা বাজারমূল্যের ১৩ কোটি ৫৪ লাখের বেশি শেয়ারের মালিক বনে যায়। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২৪৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা নগদ লভ্যাংশও তুলেছে। শওকত আলী চৌধুরী নিজে ব্যাংকের পরিচালক ও চেয়ারম্যান পদে বহাল থেকে এসব লভ্যাংশ অনুমোদন করান। পরবর্তী সময়ে জমি কেনার ভুয়া অগ্রিম বায়না দেখিয়ে সেই লভ্যাংশের ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে এবং ২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘এস.এন. করপোরেশন’-এ স্থানান্তর করে শত শত কোটি টাকার ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেন।
রিটে আরও অভিযোগ করা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দিতে এবং শেয়ার বাজেয়াপ্ত হওয়া থেকে বাঁচতে শওকত আলী ও তাঁর চক্র বাজারে দ্রুত এসব বেনামি শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার (‘সেফ এক্সিট’) অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসন নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতিতে কোনো পরিচালক ও তাঁর পরিবারের সংশ্লিষ্টতা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ন্যূনতম ৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ (উবনধৎৎবফ) করার স্পষ্ট আইনি বিধান রয়েছে।
