‘আমার ইউনিট বহু নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে’

গাজায় যুদ্ধাপরাধের বর্ণনা ইসরাইলি সেনার

‘আমার ইউনিট বহু নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে’

ফন্ট সাইজ:

গাজায় নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনাদল। হত্যার পর তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে নথিভুক্ত করেছে ইসরাইলি সেনারা। জার্মানির প্রভাবশালী সাময়িকী ডের স্পিগেল-এ প্রকাশিত ১০ জন ইসরাইলি সেনার জবানবন্দিতে এই ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধের চিত্র উঠে এসেছে। সৈন্যরা জানিয়েছে, গাজায় গণহত্যা চলাকালে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের হত্যা এবং তারা যাতে নিজেদের বসতভিটায় আর কখনো ফিরে আসতে না পারে, সেজন্য পুরো এলাকা গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো বর্বর যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত ছিল দখলদার বাহিনী। মধ্য গাজা ও খান ইউনিসে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড নামের এক পদাতিক রিজার্ভ সেনা ডের স্পিগেলকে বলেন, আমার ইউনিট বহু নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে। তিনি জানান, এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তাকে বলেছিলেন, আরবদের অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে আমরা তাদের কাছ থেকে ক্রমেই জমি কেড়ে নিচ্ছি এবং তাদের আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছি।

ডেভিড উল্লেখ করেন, শুরুতে তথাকথিত শিক্ষিত ও ধর্মনিরপেক্ষ ইসরাইলিরা এসব অপরাধ চালালেও যুদ্ধ যত গড়িয়েছে, কট্টরপন্থী চরমপন্থিদের আগমন ততই বেড়েছে। অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডকে ‘ধর্মীয় দায়িত্ব’ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের চরম ডানপন্থি মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বা ইতামার বেন গভিরদের মতো অনেকেই ডাক দিয়েছিল ‘সব আরবকে নিশ্চিহ্ন করে দাও, আমাদের বসতি গড়তে হবে, আমরা গাজাকে মুছে ফেলব’। তিনি আরও জানান, সামরিক বয়সের যেকোনো পুরুষকে দেখলেই গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেয়া হতো। ফিলিস্তিনিদের হত্যার পর সেনারা আয়েশ করে সিগারেট ধরাত এবং তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফোনে এই হত্যাকাণ্ডের বড়াই করত। খান ইউনিসে ৫৫তম প্যারাশুট ব্রিগেডে দায়িত্ব পালন করা ইয়ুভাল গ্রিন নামের আরেক রিজার্ভ সেনা জানান, তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছিল- এবার কোনো দয়া দেখানো হবে না। কোনো সন্ত্রাসী যে বাড়িতে আছে সেখানে যদি কোনো শিশুও প্রবেশ করে, তবে শিশুর সঙ্গেই তাকে হত্যা করতে হবে। গ্রিন বলেন, কমান্ডাররা ইচ্ছাকৃতভাবেই কাদের হত্যা করা যাবে সে বিষয়ে অস্পষ্টতা বজায় রাখতেন, যাতে যে কাউকে যখন-তখন হত্যা করার সুযোগ থাকে।

মধ্য গাজায় প্রায় ২৫০ দিন কাটানো ইয়াকভ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী রিজার্ভ সেনা ইসরাইলের ‘পোড়ামাটি নীতি’র বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের ফেরার মতো কোনো জায়গাই যেন আর অবশিষ্ট না থাকে। ইয়াকভ বলেন, সেখানে আমাদের অবস্থানের ৮০ দিনেরও বেশি সময়ে আমার ব্রিগেড ১৬০ থেকে ১৭০ জনকে হত্যা করেছিল। তাদের মধ্যে মাত্র একজনের কাছে অস্ত্র থাকার সন্দেহ ছিল। অথচ এই সব মৃত ব্যক্তিকেই নথিপত্রে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। অন্য এক ঘটনায় সমুদ্রসৈকতে শরীর জুড়াতে আসা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

তাল নামের অপর এক সেনা খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে চালানো হামলার বিষয়ে জানান, যেখানে পাঁচ সাংবাদিকসহ ২২ জন নিহত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, কাউকে হত্যা বা আহত করার পর সেনাবাহিনীর প্রথম চেষ্টাই থাকে তাকে হামাসের সঙ্গে জড়িয়ে দেয়া। কারণ নিহতদের হামাস সদস্য বলতে পারলে বিশ্ববাসীর চোখে তা তুলনামূলক গ্রহণীয় দেখায়। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে একে বলা হয় ‘মৃত্যুর পর অপরাধী সাব্যস্তকরণ’। এমনকি রয়টার্সের এক পেশাদার ক্যামেরাম্যানকে হত্যার পরও তাকে হামাস সন্ত্রাসী হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। তাল আরও জানান, ইসরাইলি সেনারা শুরুতে নিহত সাংবাদিকদের ‘হামাস সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। সেনারা ক্যামেরাকে ‘হামাস ক্যামেরা’ বলে ডাকত, এই অজুহাতে যে কাছাকাছি যা ঘটছে হামাস তা দেখতে এগুলো ব্যবহার করতে পারে। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল এসব ক্যামেরা বিকল করা। তবে তারা রয়টার্সের যে ক্যামেরাম্যানকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল, তিনি কোনো সন্ত্রাসী ছিলেন না। তারা একজন বৈধ সাংবাদিককে হত্যা করেছে। তাল বলেন, আমার স্পষ্ট ধারণা হয়েছে, এই সেনারা মূলত সব সাংবাদিককেই সন্ত্রাসী হিসেবে দেখত।