প্রবাসী রাজনীতির বিপজ্জনক অধঃপতন এবং হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচার

জেএফকে থেকে বাংলাদেশের অপমান

প্রবাসী রাজনীতির বিপজ্জনক অধঃপতন এবং হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচার

ফন্ট সাইজ:

রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, ক্ষোভও থাকবে। গণতান্ত্রিক সমাজে এগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতা যখন শালীনতার সীমা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত অপমান, হেনস্তা এবং রাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তা আর শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন সেটি হয়ে ওঠে জাতীয় সম্মান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জাতির পরিচয়ের প্রশ্ন।

নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান প্রফেসর ইউনূসকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে অনেকে রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বকে হেনস্তা করার ঘটনা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকেই বেশি বিব্রত করে। রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে তিনি সেই মুহূর্তে একজন ব্যক্তি নন, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

অপমানিত হয়েছে বাংলাদেশ

প্রফেসর ইউনূসের সমালোচনা করার অসংখ্য ক্ষেত্র থাকতে পারে। তাঁর নীতি, সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কঠোর সমালোচনা অবশ্যই বৈধ। কিন্তু বিদেশের মাটিতে তাঁকে অপদস্থ করার অর্থ হচ্ছে বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার প্রদর্শনী করা।

একজন বিদেশি পর্যবেক্ষকের চোখে ঘটনাটি আওয়ামী লীগ বনাম ইউনূসের দ্বন্দ্ব নয়। তাদের কাছে এটি এমন একটি দৃশ্য, যেখানে বাংলাদেশের নাগরিকরাই নিজেদের একজন জাতীয় ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ্যে অপমান করছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তি।

আজকের বিশ্বে রাষ্ট্রের ব্র্যান্ডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে সেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক আচরণের ওপর। এ ধরনের ঘটনা বিশ্বের কাছে একটি বার্তা দেয় যে বাংলাদেশ এখনও রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গভীর সংকটে রয়েছে।

প্রবাসে রাজনীতির নতুন রূপ: মতাদর্শ নয়, প্রতিহিংসা

একসময় প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। তাঁদের পরিচয় ছিল পরিশ্রমী অভিবাসী, সফল পেশাজীবী কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবাসী রাজনীতির একটি অংশ ক্রমশ প্রতিহিংসাকেন্দ্রিক ও উগ্র আচরণের দিকে ধাবিত হয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক বিভাজন এখন বিদেশেও হুবহু স্থানান্তরিত হয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তা আরও তীব্র হয়েছে। কারণ বিদেশে অবস্থানরত রাজনৈতিক কর্মীদের একটি অংশ দেশের বাস্তব পরিস্থিতির সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে না থেকেও আবেগপ্রবণ ও চরমপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেন। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার পরিবর্তে তাকে অপমান করাই যেন লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এটি রাজনৈতিক সচেতনতার লক্ষণ নয়; বরং রাজনৈতিক অপরিপক্বতার প্রকাশ।
​
আওয়ামী লীগের জন্যও এটি আত্মঘাতী

যদি সত্যিই আওয়ামী লীগের সমর্থক বা কর্মীরা এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে রাজনৈতিকভাবে এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি দলটিকেই বহন করতে হবে।

এই ধরনের ঘটনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের প্রতি থাকা অনেকের সহানুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মানুষ যখন দেখে রাজনৈতিক বিপর্যয়, মামলা, গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ সংকটের পরও একটি দলের আচরণে আত্মসমালোচনার পরিবর্তে আগের আগ্রাসী প্রবণতাই দৃশ্যমান, তখন তাদের প্রতি সহমর্মিতা কমে যায়- এটাই স্বাভাবিক।

রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের অন্যতম শর্ত হলো জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু প্রতিপক্ষকে অপমান করার মাধ্যমে সেই আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায় না।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি রাজনৈতিক পুনর্মিলনের

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার। যে সমাজে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা হয়, সেখানে গণতন্ত্র কখনও শক্তিশালী হতে পারে না।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পুনর্মিলন বা রাজনৈতিক রিকনসিলিয়েশনের যে প্রশ্ন উঠেছে, এ ধরনের ঘটনা সেই বিষয়টিকে আরও দুর্বল করে দেয়। কারণ এতে প্রমাণিত হয় যে রাজনৈতিক পক্ষগুলো এখনও সহাবস্থানের সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে প্রস্তুত নয়।

যখন একটি পক্ষ প্রতিপক্ষকে অপমান করে, তখন অন্য পক্ষও প্রতিশোধের মানসিকতা গ্রহণ করে। এর ফলে ঘৃণার চক্র অব্যাহত থাকে এবং জাতীয় ঐক্যের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যায়।

প্রবাসীদের দায়িত্ব আরও বেশি

বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের একটি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তারা শুধু নিজেদের নয়, গোটা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের আচরণ থেকেই অনেক বিদেশি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করে।

সেই কারণে বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক প্রতিবাদও হতে হবে মার্জিত, সভ্য এবং দায়িত্বশীল। ব্যানার, বক্তব্য, মানববন্ধন কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান, হেনস্তা বা বিশৃঙ্খল আচরণ কখনও রাজনৈতিক সংগ্রামকে শক্তিশালী করে না; বরং সেই সংগ্রামের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

শেষ কথা
প্রফেসর ইউনূসের সমালোচনা করা যেতে পারে, তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদও হতে পারে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে তাঁকে অপমান করার মধ্যে কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নেই। এতে তাঁর চেয়ে বেশি অপমানিত হয়েছে বাংলাদেশ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার, সহনশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় প্রতিহিংসা অনেক সময় বড় হয়ে উঠছে। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে দুঃখজনক বাস্তবতা আর কিছু হতে পারে না।

যে দিন আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, ভিন্নমতের নাগরিক হিসেবে দেখতে শিখব, সেদিনই বাংলাদেশের গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে পরিণত হবে। তার আগে জেএফকের মতো ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো জাতিকেই বারবার অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।

ই-মেইল: [email protected]