ইমরান খানের ঘাঁটি অবরুদ্ধ করেছে পাকিস্তান, হিতে বিপরীত হতে পারে

বিবিসির বিশ্লেষণ

ইমরান খানের ঘাঁটি অবরুদ্ধ করেছে পাকিস্তান, হিতে বিপরীত হতে পারে

ফন্ট সাইজ:

স্কুল বন্ধ। আংশিকভাবে বন্ধ ইন্টারনেট। পণ্যবাহী কনটেইনার দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে সড়ক। শহরে প্রবেশ করছে সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের (পিটিআই) শক্ত ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে সেখানে তার দলের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম। ইমরান খানের সমর্থকদের সঙ্গে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের চলমান সংঘাত এভাবে আরও নাটকীয় মোড় নিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বদলে এই পদক্ষেপ দেশটিতে আরও অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী নেয়া এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য প্রদেশের জনগণকে সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে সুরক্ষা দেয়া।

রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা বা প্রমাণ দেননি তিনি। শুধু বলেছেন, শিগগিরই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। দুই দিন পরও তার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নতুন তথ্য দেয়া হয়নি। তবে এর মধ্যে পেশোয়ারসহ প্রদেশের অধিকাংশ এলাকায় স্কুল খুলে দেয়া হয়েছে এবং ইন্টারনেট পরিষেবাও পুনরায় চালু হয়েছে। কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, পুলিশ তা নিশ্চিত করেনি। তবে বিক্ষোভ ঠেকাতে যে দমনপীড়ন চলছে, তা স্পষ্ট। প্রদেশে পিটিআইয়ের অধিকাংশ নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন। মঙ্গলবার খাইবার জেলার বারায় পিটিআইয়ের কয়েক ডজন সমর্থক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন।

এলাকাটি প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নিজ শহর। সেখানে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে।

জরুরি অবস্থা জারির সময় নিয়ে প্রশ্ন: অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, রোববার জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেয়ার সময়টি মোটেও কাকতালীয় নয়। এক সপ্তাহ ধরে ইমরান খানের হাজার হাজার সমর্থক খাইবার পাখতুনখাওয়ার বিভিন্ন এলাকায় মিছিল করছেন। প্রদেশটিতে ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে পিটিআই। তাদের প্রধান দাবি, ইমরান খানকে মুক্তি দিতে হবে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ বলেন, সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখলেও বলতে হয়, বিষয়টি অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়েছে। সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার আরিফা নূর বলেন, সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আমি দেখতে পাচ্ছি না। এমনকি এই দীর্ঘ পদযাত্রার কারণেই যে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা নিয়েও আমি নিশ্চিত নই। হয়তো এটিই ছিল শেষ ধাক্কা। আবার এমনও হতে পারে, বিরোধী দলের হাতে প্রাদেশিক সরকার থাকুক- কেন্দ্রীয় সরকার সেটিই আর মেনে নিতে চাইছে না।

বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি। তবে তিনি এখন কোথায় আছেন, তা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। তার দল দাবি করেছে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, তাকে নিরাপত্তামূলক হেফাজতে রাখা হয়েছে। পদযাত্রা শুরুর আগেই দমনপীড়ন শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে ইমরান খানের তিন বোনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সমর্থকদের সংগঠিত করার অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। এরপর থেকে তারা আটক রয়েছেন। গত এক বছরে পরিবারের সদস্য কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গে ইমরান খানের দেখা করার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। আগস্টে তার দুই বোন তার সঙ্গে দেখা করেন। তাদের একজন কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যজন সুপ্রিম কোর্ট তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হলে সেখানে তাকে দেখতে যান। পরে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি বন্দি।

দুর্বল পিটিআইয়ের ওপর এত কঠোরতা কেন? পাকিস্তানের প্রভাবশালী সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণেই ইমরান খান ক্ষমতা হারিয়েছেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি কারাগারে। দুর্নীতির একাধিক মামলায় তার সাজা হয়েছে। তবে ইমরান খানের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এসব মামলা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ এমন কঠোর অবস্থান নিচ্ছে কেন? আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিটিআইয়ের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। এর পেছনে ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগও কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, সম্ভবত এখনই দলটিকে কঠোর বার্তা দেয়ার সময় বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে দলটির সক্ষমতা কমিয়ে আনাও এর উদ্দেশ্য হতে পারে। এর আগে সরকার অভিযোগ করে, কারাগারে সাক্ষাতের সুযোগকে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য ব্যবহার করে ইমরান খান জেলবিধি লঙ্ঘন করছেন।

জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তারা চাইলে নিজেদের পদযাত্রা চালিয়ে যেতে পারত। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এতে প্রমাণিত হয় যে সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছিল। তবে অন্যদের দৃষ্টিতে, এটি ইমরান খান ও তার দলকে আরও কোণঠাসা করার আরেকটি প্রচেষ্টা। আরিফা নূর বলেন, মতবিরোধ ও ভিন্নমত সহ্য করার জায়গা সরকারের ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। যেকোনো ধরনের সংঘাত থেকে আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসার আগ্রহও তাদের নেই।

ক্ষমতার ভারসাম্য এখন সামরিক বাহিনীর দিকে: ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। তিনি বলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে সরে গেছে। ফারজানা শেখের ধারণা, পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব এখন আত্মবিশ্বাসী। কারণ, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো বলে তারা মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনায় ভূমিকা রাখার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পাকিস্তানের ভাবমূর্তি শক্তিশালী হয়েছে বলে তাদের ধারণা। ফারজানা শেখ বলেন, তাদের মনোভাব এখন অনেকটা এমন- এটাই সুযোগ, এখনই কাজে লাগাতে হবে। তাদের মনে হচ্ছে, সব তাস তাদের হাতে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তারা পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবে।

কিন্তু পাকিস্তানের সামনে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশটিতে জঙ্গি তৎপরতা বাড়ছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচকে সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত দেশ হিসেবে পাকিস্তান প্রথম স্থানে রয়েছে। দুটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেও পাকিস্তানের বিরোধ চলছে। জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয়ার অভিযোগে আফগানিস্তানে বারবার বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। তবে আফগান তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংঘাতও যেকোনো সময় নতুন করে তীব্র হতে পারে। এদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে সংঘাত ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় সৌদি আরবকে হামলা থেকে রক্ষায় সহায়তা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে পাকিস্তান।

সংকট সমাধানের বদলে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে: সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নতুন করে আরও সংকট তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অনেকে। এতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, প্রাদেশিক সরকারের মধ্যবর্তী স্তর বা ‘বাফার’ ছাড়াই ইসলামাবাদকে সরাসরি একটি প্রদেশের দায়িত্ব নিতে হবে। ফলে পরিস্থিতির অবনতির দায় আগের প্রাদেশিক সরকারের ওপর চাপানোর সুযোগও কমে যাবে। মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, আমি মনে করি, এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। আপনারা আগুন নিয়ে খেলছেন। কারণ, এই সিদ্ধান্ত যদি সেখানকার বহু মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে আপনাদের সামনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। জাহিদ হোসেন বলেন, দেশটি যে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, তাতে এমন পদক্ষেপ দায়িত্বজ্ঞানহীন। তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করা হতে পারে। ফারজানা শেখের মতে, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর আরও সক্রিয় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তেরও ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, তারা যদি এসব অভিযান শুরু করে, তাহলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানির ঝুঁকিও মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলে সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

সামরিক অভ্যুত্থানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে পাকিস্তানের। অতীতে নির্বাচিত সরকার- প্রাদেশিক কিংবা জাতীয়, তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিণতি কীভাবে বিপরীত হতে পারে, তার একাধিক নজির রয়েছে দেশটিতে। কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতারা যে এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতে তাদের জন্যও বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা বোঝেন না- এমন নয় বলে মনে করেন আরিফা নূর। তিনি বলেন, আমি মনে করি, পিটিআইও কিছুটা হলেও বুঝতে পারছে যে বিক্ষোভ করে ইমরান খানকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না। আমরা যে সংকটের মধ্যে পড়েছি, তার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দিক হলো- চোখের সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা জেনেও আমরা সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, সবাই বুঝতে পারছে, এটি একটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি। অথচ কোনোভাবেই যেন এটি থামানো যাচ্ছে না।