বণিক বার্তা
দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘হুথি-সৌদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বহুমুখী সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরবরাহকারী দেশও খুব বেশি নয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সরবরাহকারী তালিকায় সৌদি আরামকোর পাশাপাশি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা অ্যাডনক রয়েছে।
ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমুখী সংকট তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মরত। দেশটি নতুন বিদেশগামী কর্মীদের বড় অংশেরও গন্তব্য। সৌদি আরব বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। এছাড়া জ্বালানি পণ্য, সার ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও রিয়াদের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা রয়েছে। সৌদি-হুথি সংঘাতের ভৌগোলিক ক্ষেত্র সুয়েজ খাল ও বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় ঝুঁকি রয়েছে আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহনেও। সেক্ষেত্রে আমদানি ও রফতানিতে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব অভিঘাত একসঙ্গে তীব্র হলে রেমিট্যান্স, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড় সংকটে ফেলতে পারে।
এরই মধ্যে যুদ্ধের চাপ সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সংযোগে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক হুথি হামলার পর শত শত ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো সৌদি আরবগামী ফ্লাইট সীমিত করেছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়ে সৌদির বিনিয়োগ, নির্মাণ, পর্যটন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি কমতে পারে। সে রকমটা হলে ধাক্কা লাগতে পারে দেশটিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশীর আয় ও কর্মসংস্থানে। সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটিতে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মরত। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ বাংলাদেশী কর্মসংস্থানের জন্য সৌদি আরবে গেছেন, যা ওই বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। চলতি বছর প্রথম আট মাসে সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন। এছাড়া বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ৭০ হাজার ৩০৪ বাংলাদেশী কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৯১৫ জন বা প্রায় ৪৭ শতাংশের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
গত আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৫ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকেই এসেছে ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে রেমিট্যান্সের প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। ফলে দেশটিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের ওপর পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে সৌদি আরবে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। বাসাভাড়া, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বেড়ে গেলে তাদের সঞ্চয় কমে আসবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সে। একই সঙ্গে সৌদি অর্থনীতিতে কোনো ধরনের সংকোচন দেখা দিলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশীদের আয় ও কর্মসংস্থানেও চাপ তৈরি হতে পারে। প্রতি বছর বাংলাদেশের শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যায় এবং তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের গন্তব্য সৌদি আরব। ফলে সৌদির শ্রমবাজারে সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও বাংলাদেশের নতুন কর্মসংস্থান ও শ্রম রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
জ্বালানি খাতের ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকবে বলে বিভিন্ন পূর্বাভাসে উঠে এসেছে। এতে বাংলাদেশের ওপর চাপ আরো বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি জ্বালানির আমদানি সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। তখন বেশি দাম দিলেও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাবে কিনা সে নিশ্চয়তা থাকে না। সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স, শ্রমবাজার, জ্বালানি সরবরাহ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫-৭০ লাখ টন। এর মধ্যে ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সৌদি আরামকো থেকে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ আসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন। এর বাইরে আবুধাবির অ্যাডনক থেকেও অপরিশোধিত তেল কেনে বাংলাদেশ। এ অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, বিটুমিন, পেট্রলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন হয়।
অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরবরাহকারী দেশও খুব বেশি নয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সরবরাহকারী তালিকায় সৌদি আরামকোর পাশাপাশি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি বা অ্যাডনক রয়েছে। ফলে সৌদি আরবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়ে উৎপাদন, রফতানি টার্মিনাল, বন্দর বা আঞ্চলিক নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সময়মতো ক্রুড অয়েল পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। ফলে সৌদি-হুথি সংঘাত আঞ্চলিক শিপিং রুট, বীমা ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জে চাপ তৈরি করলে বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আনার খরচ বেড়ে যেতে পারে।
বেসরকারি খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাশরুর রিয়াজ গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের বাজার অনেকটাই সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে ক্রুড অয়েলের সরবরাহ ও দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ এমনিতেই জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এলএনজির সরবরাহ ও উচ্চমূল্যের চাপের সঙ্গে যদি জ্বালানি তেলের সংকট বা আমদানি মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে তা দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্ট, আমদানি সক্ষমতা ও সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
ঝুঁকি শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয় জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। উন্নত দেশগুলোয় ভোগব্যয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে বাংলাদেশের রফতানি হ্রাসের ঝুঁকিও থাকবে।’ তার মতে, সম্ভাব্য ক্ষতির ক্ষেত্রগুলো এখন থেকেই চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করে সতর্কতামূলক নীতি গ্রহণ করা জরুরি। আর দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার এবং জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে।
সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মধ্যে সারও রয়েছে। দেশটি থেকে ইউরিয়া আমদানি করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং ডিএপি আমদানি করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। বিএডিসি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১১টি লটে ডিএপি আসার কথা রয়েছে। পাঁচটি লট (২ লাখ টন) এরই মধ্যে দেশে এসেছে। বাকি চালানগুলো আগামী নভেম্বরের শেষ নাগাদ আনার প্রক্রিয়া চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএডিসির এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হবে কিনা, আমরা জানি না। তবে সরবরাহকারীরা এখন পর্যন্ত ডিএপি সরবরাহ নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তার কথা জানায়নি, আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। সংকট বিস্তৃত হলে হয়তো আমদানি প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি হতে পারে।’
অন্যদিকে বিসিআইসির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে জিটুজি চুক্তির আওতায় মোট ৫ লাখ ২০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার টন নিশ্চিতভাবে কেনার কথা এবং বাকি দুই লাখ টন ঐচ্ছিক চুক্তির আওতায়। ১৬ ও ২২ অক্টোবর একটি করে মোট দুটি জাহাজ সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া নিয়ে দেশে পৌঁছার কথা রয়েছে। নভেম্বরের জন্য আরো দুটি জাহাজের লোডিং প্রক্রিয়া চলছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার পর বাংলাদেশে ইউরিয়া সরবরাহকারী সৌদি প্রতিষ্ঠান স্যাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস এ পর্যন্ত দুবার বন্দর পরিবর্তন করেছে। এখন পর্যন্ত সরবরাহ সচল থাকলেও আঞ্চলিক সংঘাত আরো বিস্তৃত হলে বিকল্প রুট ব্যবহারের সক্ষমতা কতটা টেকসই থাকবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউরিয়া আমদানি নিয়ে এখন পর্যন্ত ঝুঁকি দেখছি না। ভবিষ্যতে কী হবে, তা বলা যাচ্ছে না।’
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্পর্ক এখনো তুলনামূলক সীমিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল শেষে বাংলাদেশে সৌদি আরবের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই স্টক) পরিমাণ ছিল ২৩ কোটি ৫১ লাখ ৬০ হাজার ডলার, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে যা ৩ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার ডলারে নেমে আসে। তবে সৌদি আরব থেকে বড় অংকের বিনিয়োগ আকর্ষণে সম্প্রতি তৎপরতা বাড়িয়েছে সরকার। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর করা সৌদি আরবের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের বন্দরসহ বিভিন্ন খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে আগ্রহের কথা জানায়। আগস্টে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে ওই সফরের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে সৌদির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন অস্থির থাকলে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সূচিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসএবিসিসিআই) সভাপতি আশরাফুল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সংকট তৈরি হতে পারে। সেখান থেকে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়। আবার সেখান থেকে জ্বালানি, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সার আমদানি করে বাংলাদেশ। ফলে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বাণিজ্য ও আমদানি—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
সৌদিতে চলমান সংঘাতে বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিও সামনে এসেছে। ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি হামলায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশী। এছাড়া আহত হন আরো ২৪ বাংলাদেশী। সংঘাত বিস্তৃত হলে দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো বাড়বে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘যেভাবে হুথি-সৌদি সংঘাত বাড়ছে, তা উদ্বেগজনক। এ ধরনের পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। এরই মধ্যে বাংলাদেশী কর্মীদের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেখানে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে অভিবাসনের প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।’
সরকারকে শুধু তাৎক্ষণিক বা ছোটখাটো পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ শ্রমবাজারে প্রবেশের কৌশল নিতে হবে। এজন্য দেশের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। দক্ষ কর্মী তৈরি করা গেলে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট শ্রমবাজারে সংকট তৈরি হলেও দেশের অভিবাসন খাত এতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে না।’
সাময়িকভাবে যুদ্ধের কিছু প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে বলে মনে করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। গতকাল রাজধানীতে ‘ফরেন পলিসি অব বাংলাদেশ: নেভিগেটিং পাথওয়েজ ইন আ শিফটিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘শুধু সৌদি আরবেই ৩০ লাখের ওপর বাংলাদেশী কাজ করেন, তো সেই জায়গায় একটা ইফেক্ট তো পড়বেই। কিন্তু আমরা আশা করব, নতুন নতুন বাজার যেহেতু খোঁজা হচ্ছে, ইন দ্য লং রান এ আমরা সমস্যা উতরে যাব।’
তিনি জানান, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে কিছু বাংলাদেশী চাকরি হারিয়েছেন, কেউ কেউ দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন এবং অনেকে কর্মসংস্থান ছাড়াই সেখানে অবস্থান করছেন। এ পরিস্থিতি প্রবাসী আয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
শামা ওবায়েদ আরো বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যার তথ্য আমাদের কাছে নেই। জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকার কাজ করছে। নতুন উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান জ্বালানি সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা চলছে।’
প্রথম আলো
‘সৌদিতে কর্মসংস্থানে নতুন ধাক্কা’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলার জেরে সৌদি আরবগামী ফ্লাইট একের পর এক বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি কর্মীরা। ছুটিতে দেশে আসা কর্মীরা কাজে ফিরতে পারছেন না। যাত্রা পিছিয়ে যাওয়ায় তাঁদের ভিসার মেয়াদ ও চাকরি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সবচেয়ে বড় গন্তব্য সৌদি আরব। অন্য কয়েকটি বড় শ্রমবাজার বন্ধ বা সংকুচিত হওয়ায় দেশটির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। যদিও এ বছরের শুরু থেকে সৌদিতে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমছে। এখন সৌদিতে হামলা ও বিমান চলাচল বিঘ্নের ঘটনায় বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের ওপর নতুন ধাক্কা এল। এই পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থা, রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন। এ বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি কমে হয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। শুধু সৌদি আরবে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ থেকে কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। এই কমার হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।
গতকাল সোমবার বেলা একটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১৫ জনের বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। সৌদি আরবগামী যাত্রীদের অধিকাংশই বিমানবন্দরে এসেছেন তাঁদের ফ্লাইট বাতিলের তথ্য জানতে। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন বিকল্প কোনো ফ্লাইটে গন্তব্যে যেতে।
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মোসলেম তালুকদার নামের এক কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, রিয়াদের একটি দোকানের কাজে যোগ দিতে প্রথমবার সৌদি যাওয়ার কথা তাঁর। গতকাল দুপুর ১২টায় ফ্লাইট ছিল, সকালেই আসেন বিমানবন্দরে। তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অন্য কোনো ফ্লাইটে যাওয়ার উপায় খুঁজছেন। কোনো উপায় না পেলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।
গতকাল গভীর রাতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিধিনিষেধ চলছে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ৬১টি ফ্লাইটে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল ও কিছু স্থগিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাঁরা ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে পাঁচ দিনে গত রোববার চতুর্থবারের মতো হামলা হয় সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে গত শনিবার। এতে দুই বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত হন। আহত এক বাংলাদেশির অবস্থা আশঙ্কাজনক। এরপর ঢাকা থেকে রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে।
রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের সংগঠন বায়রার সদস্যরা ও বিএমইটি সূত্র বলছে, এ বছর দিনে গড়ে ১ হাজার ২০০ জন করে নতুন কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। এর পাশাপাশি ছুটিতে আসা কর্মীদের ৬০০ থেকে ৭০০ জন করে দিনে ফিরে গেছেন। এ হিসাবে গত তিন দিনে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কর্মী ফ্লাইট জটিলতায় আটকা পড়ার কথা। ফ্লাইট বন্ধ থাকলে এটি আরও বাড়তে থাকবে।
হুমকিতে বিদেশে কর্মসংস্থান
বাংলাদেশ থেকে ১৯৭৬ সালে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। মূলত এটি বাড়তে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। অন্যদিকে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বছরে কর্মী পাঠানোর গড় সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন ২০২৩ সালে—ওই বছর বিদেশে যান ১৩ লাখের বেশি কর্মী। সংখ্যাটি যত বড়ই হোক না কেন, বিদেশ যেতে আগ্রহী তরুণের তালিকা কখনোই ছোট হয়নি।
সমস্যা হলো, শ্রমবাজারটি গুটিকয় দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছরে মোট ২০৩টি দেশে কর্মী পাঠানো হয়েছে। এ সময় মোট কর্মী গেছেন ১ কোটি ১০ লাখের বেশি। এর প্রায় ৭৯ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। সব মিলিয়ে ৯৪ শতাংশ কর্মী গেছেন ১০টি দেশে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের তালিকার শীর্ষে থাকা দেশের মধ্যে আছে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন ও মালদ্বীপ। সবই এশিয়ার দেশ, যার মধ্যে সাতটি মধ্যপ্রাচ্যের। ৯৮টি দেশে দেড় দশকে ১০০ জন করেও কর্মী পাঠানো যায়নি। নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশকেন্দ্রিক বাজারনির্ভরতা এখন জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, একটিমাত্র শ্রমবাজারের ওপর চলছে বিদেশে কর্মসংস্থান, সেটিও এখন স্থবির হয়ে গেছে। বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি করতে না পারায় এ পরিণতি। ফ্লাইট বাতিলের কারণে নতুনদের পাশাপাশি পুরোনো কর্মীরাও ফিরতে পারছেন না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে পারে। কুয়েত যুদ্ধ ও করোনা মহামারির সময় আটকে পড়া ব্যক্তিদের ভিসা নবায়ন করা হয়েছিল। এবারও দেশটির সঙ্গে আলোচনা করতে পারে সরকার।
কয়েক বছর ধরে কর্মসংস্থান বাড়ছে শুধু সৌদি আরবে। দেশটিতে ২০২৪ সালে সোয়া ছয় লাখ বাংলাদেশি কাজের জন্য গিয়েছিলেন। গত বছর তা বেড়ে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ছাড়ায়। তবে এ বছরের প্রথম ৯ মাসে গেছেন ৩ লাখ ৯ হাজারের মতো কর্মী। অর্থাৎ কমছে।
বিএমইটির তথ্য বলছে, গত বছর সব মিলিয়ে বিদেশে গেছেন ১১ লাখ ৩২ হাজারের বেশি কর্মী। এবার যুদ্ধের পর থেকে সৌদিতে কর্মসংস্থান কমছে। গত বছর অক্টোবরের প্রথম ১২ দিনে বিভিন্ন দেশে যেতে বিএমইটি থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১৪ হাজার ১৭৪ জন। এবার একই সময়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১১ হাজার ১২২ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে যেতে গত বছর ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ৯৭১ জন, আর এবার নিয়েছেন ১ হাজার ৮৫০ জন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিদেশে কর্মসংস্থান কিছুটা ধাক্কা খায়। অল্প পরিসরে হলেও নতুন গন্তব্যে কর্মী পাঠানো হয়েছে। এখন সৌদি নতুনভাবে শঙ্কা তৈরি করেছে। এতে প্রথম বছরে ১৫ লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য হয়তো পূরণ হবে না। তবে সরকার বিকল্প শ্রমবাজার তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যাঁরা আটকা পড়েছেন, তাঁদের বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করা হবে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর দিকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।
আগাম বাতিল হচ্ছে ফ্লাইট
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ৬১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইট ১২টি। বাকি ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের ৪টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৭টি ফ্লাইট চলাচলে প্রভাব পড়েছে।
রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিস্ফোরণের পর সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিধিনিষেধ তৈরি হয়। গতকাল রাত তিনটা পর্যন্ত বিমানবন্দর বন্ধের ঘোষণা আছে। এরপর আবার নতুন করে সিদ্ধান্ত জানাবে দেশটি।
বাংলাদেশ বিমান ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস আলাদা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা পথে ইউএস–বাংলার সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান। ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের জানিয়ে দেবে তারা।
অন্য উড়োজাহাজ সংস্থা এখন পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিলের আগাম ঘোষণা দেয়নি। তবে তারা পরিস্থিতি বুঝে প্রতিদিন ফ্লাইটের অবস্থান জানাচ্ছে।
গতকাল বেলা দুইটায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবের দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল আবুল হোসেনের। নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে সেই ফ্লাইট ধরতে গতকাল সকাল ১০টার দিকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেছেন তিনি। আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছেন, দেশটিতে টাইলসের মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। ছুটি শেষে ফেরার জন্য তিন মাস আগেই টিকিট করেছেন। ফ্লাইট বাতিল করায় ছুটি শেষে কাজে ফিরতে পারছেন না। যেতে না পারলে চাকরি বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে। সংসার অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে।
রিয়াদগামী ঢাকার ফ্লাইট বাতিলের পাশাপাশি গতকাল থেকে দেশটির জেদ্দাগামী কিছু ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে বলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরের ফ্লাইট–সংক্রান্ত তথ্যে জেদ্দাগামী বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের ফ্লাইনাস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি বাতিলের তথ্য প্রদর্শন করা হয়।
সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র বলছে, হামলার পর ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি যাত্রী আটকে পড়েন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যাওয়া যাত্রী, ওমরাহ পালন করতে যাওয়া ব্যক্তি এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা ছিলেন।
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সৌদি ইমিগ্রেশন ও সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর সহায়তায় আটকে পড়া যাত্রীদের আবাসন, খাবার ও বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করেছে। প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি যাত্রীকে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রিয়াদ থেকে বাহরাইনগামী সৌদিয়া এয়ারলাইনসের দুই বাংলাদেশি কর্মীকে আল খোবারের স্থলসীমান্ত দিয়ে বাহরাইন যেতে সহায়তা করা হয়েছে।
যুদ্ধে হতাহত হচ্ছেন প্রবাসী কর্মীরা
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ আসে দেশে। ২০২০ সালে এটি কমে হয় ৩ হাজার ১৪০ জন। এ বছর জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মোট ২৭৩ দিন) ৯ মাসে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬৪টি মরদেহ। এ হিসাবে দিনে মরদেহ এসেছে গড়ে ১৪টির বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা যান সৌদি আরবে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নানা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি এবার যুদ্ধে মারা যাচ্ছেন কর্মীরা। এ বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর গতকাল পর্যন্ত হামলার শিকার হয়ে মারা গেছেন ১৪ জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশি কর্মী হিসেবে নিবন্ধিত। সর্বশেষ গত শনিবারের হামলায় দুজন বাংলাদেশি মারা গেছেন, যার মধ্যে একজন প্রবাসী কর্মী। একই হামলায় আহত হয়েছেন ২৭ বাংলাদেশি।
রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং থেকে গতকাল পাঠানো সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, হামলায় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে নওগাঁর বাসিন্দা সাফফাত রহমানের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সাফফাতসহ আহত ১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহত ২৭ বাংলাদেশির মধ্যে ১১ জন সৌদি আরবে কর্মরত এবং ১৬ জন ওমরাহ ভিসায় দেশটিতে গেছেন।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বহু বছর ধরে কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্য এবং মূলত সৌদিনির্ভর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কর্মী পাঠানো কমছে। কর্মীরা যেমন যেতে পারছেন না, যাঁরা দেশটিতে আছেন, তাঁরাও হতাহত হচ্ছেন। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের একটা নিরাপদ জায়গা ছিল মধ্যপ্রাচ্য। এখন সেটিও হুমকির মধ্যে পড়েছে। এ কারণে কর্মীর চাহিদা কমে যাবে। বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়তে পারে বাংলাদেশ। বেকারদের কর্মসংস্থান কমবে এবং প্রবাসী আয় কমতে থাকবে। তাই সরকারের উচিত, দেশের অর্থনীতির অন্যতম নির্ভরতার দেশ সৌদির সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করা। ঝুঁকি কমাতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।
ফিরে দেখা: এই দিনে দেশ ছাড়েন এস কে সিনহা, কানাডা থেকে বললেন, ‘আমি ভাসমান’। প্রথম আলোর আরেকটি প্রতিবেদন।
‘আমি তো রিফিউজি হিসেবেই আছি এখন। কারণ হলো শেখ হাসিনার সরকার আমাকে একটা কনভিকশন (দোষী সাব্যস্ত করা) দিয়েছিল, একটা সাজানো মামলায়। …যার পরিপ্রেক্ষিতে আমি স্ট্যাটাসবিহীন একেবারে ফ্লোটিংম্যান, যাকে বলে ভাসমান লোক হিসেবে আছি।’
নিজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ কথাগুলো বলেছেন ৯ বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বিচারপতি এস কে সিনহা নামেও পরিচিত।
সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে আছেন। তাঁর দেশত্যাগ ও পদত্যাগের প্রেক্ষাপট ও পেনশন সুবিধা না পাওয়া নিয়ে গত ২৭ আগস্ট, ২ সেপ্টেম্বর ও গতকাল সোমবার কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা শপথ নেন। তিনি ছিলেন দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো অমুসলিম প্রধান বিচারপতি। তাঁর চাকরির মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। মেয়াদ শেষের ৮২ দিন আগেই পদত্যাগ করেন তিনি।
২০১৭ সালের ২ অক্টোবর বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছুটির কথা জানানো, তারপর ছুটিতে যাওয়া ও ছুটিতে থাকা অবস্থায় তাঁর বিদেশ যাওয়া এবং বিদেশ থেকে পদত্যাগপত্র (১০ নভেম্বর) পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটে।
অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে ঢাকা ছাড়েন সাবেক এই প্রধান বিচারপতি। সেই থেকে দেশের বাইরে আছেন তিনি।
প্রথমে অস্ট্রেলিয়া, তারপর কানাডা, সেখান থেকে আমেরিকায়, তারপরে আবার কানাডায় ফেরেন বলে জানান সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, ‘কানাডায় ছোট মেয়ের সঙ্গে আছি। আমি তো রিফিউজি হিসেবেই আছি এখন। আমার স্ত্রীর স্ট্যাটাস হয়ে গিয়েছে, পিআর (পারমানেন্ট রেসিডেন্সি বা স্থায়ী বাস) হয়ে গিয়েছে। তবে আমাকে দিচ্ছে না।’
স্ট্যাটাস না পাওয়ার কারণ হিসেবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বাংলাদেশে সাজানো মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়াকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমার পিআর অ্যাপ্রুভ হয়েছে। তবে পুলিশ রিপোর্ট পাইনি, কার্ড ইস্যু হয়নি।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরপরই দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন বলে জানান সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, পাসপোর্টের জন্য কানাডার টরন্টোতে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কার্যালয়ে সর্বশেষ ৪ আগস্ট রিমাইন্ডার (মনে করিয়ে দেওয়া) দিয়ে মেইল করা হয়েছে। কোনো রিপ্লাই (উত্তর) দিচ্ছে না।
সিনহার নিয়োগ
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেয় আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগেই ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। নির্বাচনটি বর্জন করেছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশে রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকেই প্রধান বিচারপতি পদে চায়। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। আর একতরফা নির্বাচন করা একটি সরকার কখনোই নিজের পছন্দের বাইরে কাউকে প্রধান বিচারপতি পদে চাইবে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় আসামিদের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি হয়েছিল আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চে। একজন সদস্য ছিলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আপিল বিভাগের রায়ে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মৃত্যুদণ্ড যখন চূড়ান্ত হয়, তখন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি ছিলেন।
প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পদত্যাগের আগপর্যন্ত ২ বছর ৯ মাস ২৫ দিনের দায়িত্ব পালনকালে নানা কারণে আলোচনায় আসেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। শেষ বিতর্ক তৈরি হয় ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া বিচারপতি সিনহার লেখা রায় নিয়ে। তবে বিচারপতি সিনহার সঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দূরত্ব আরও কিছু আগে থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে।
বিশেষ করে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা নিয়ে সরকারের সঙ্গে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কথা–চালাচালিতে বিষয়টি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। এ নিয়ে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায় হয়। এর বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।
তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ২০১৭ সালের ৩ জুলাই সর্বসম্মতিতে আপিল খারিজ করে রায় দেন। ফলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের বিধান ফিরে। ২০১৭ সালের ১ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। শেষ বিতর্ক তৈরি হয় ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া বিচারপতি সিনহার লেখা রায় নিয়ে।
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তাঁর লেখা রায়ে গণতন্ত্র, রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, সুশাসন, দুর্নীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দেন। এসব পর্যবেক্ষণ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, দলীয় নেতা ও সরকারপন্থী আইনজীবীরা।
বিচারপতি সিনহার পদত্যাগের দাবি তোলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ। অন্যদিকে রায়কে স্বাগত জানায় বিএনপি।
আপিল বিভাগের ওই রায় বাতিলের জন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ওই রায়ে জাতীয় সংসদ সম্পর্কে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির (এস কে সিনহা) ‘অসাংবিধানিক, আপত্তিকর, অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ’ বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব ২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয়।
তার আগে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা এই বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ ১৮ জন মন্ত্রী-সংসদ সদস্য রায় নিয়ে আলোচনা করেন। তাতে সবাই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কড়া সমালোচনা করেন।
সর্বোচ্চ আদালতের ওই রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে ২০১৭ সালে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এই আবেদন পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর রায় দেন আপিল বিভাগ।
এতে বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি জাতীয় সংসদের পরিবর্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে ফেরার বিধানগুলো পুনর্বহাল হয়।
ডাকা হয়েছিল বঙ্গভবনে
ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়েছিল ২০১৭ সালের ১ জুন। সেদিন আপিল বিভাগ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। ওই বছরের ৩ জুলাই রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ।
রায় ঘোষণার আগে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে আলোচনার জন্য বঙ্গভবনে চায়ের নিমন্ত্রণে ডাকা হয়েছিল বলে ‘আ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে নিজের লেখা আত্মজীবনীমূলক বইয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৭ সালের ১ জুলাই সকালে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একটি ফোন আসে। যিনি ফোন করেন তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতির (তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ) সামরিক সচিব হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তাঁর সঙ্গে চায়ের নিমন্ত্রণে বঙ্গভবনে যাওয়ার অনুরোধ জানান। সামরিক সচিবের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তাও পান। সে অনুসারে ২ জুলাই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে যান। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ছাড়াও সেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক (বর্তমানে কারাবন্দী) এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম (প্রয়াত) উপস্থিত ছিলেন।
‘প্রধানমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনীর রায় সংক্রান্ত বিষয়টি উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছিলেন যেন সরকারের পক্ষে রায় দেওয়া হয়। আমি বলেছিলাম যে আমি সরকারের পক্ষে মতামত দিলেও হাইকোর্টের রায় বাতিল হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই; কারণ বিষয়টি নিয়ে তাঁরা (নিজে ও আপিল বিভাগের অপর বিচারপতিরা) তখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। রায় ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তেই মতামত প্রকাশ করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল বারবার তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন অন্য বিচারকেরা যদি বিপক্ষে মতামত দিলেও তিনি যেন সরকারের পক্ষে মতামত দেন। তিনি অনড় থাকায় প্রধানমন্ত্রী মেজাজ হারিয়ে ফেলেন’, বলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
বিষয়টি এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বিতর্ক পর্যায়ে পৌঁছে বলে উল্লেখ করে এই সাবেক বিচারপতি বলেন, ‘তখন আমি পদত্যাগ করব বলেছিলাম। এ সময় প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই পদত্যাগ না করতে অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী বললেন, “ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে রায়ের আগে পদত্যাগ করলে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।” অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগের যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম, তা থেকে সরে আসি।’
‘ছুটিতে যাওয়া’ ও আলোচনা
২০১৭ সালে অবকাশকালীন ছুটি শেষে সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম শুরুর তারিখ ছিল ৩ অক্টোবর। এর ঠিক এক দিন আগে ২ অক্টোবর তিনি এক মাসের ছুটির কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেন। তাঁর ছুটিকে কেন্দ্র করে তখন পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি ছুটি নিয়েছেন শারীরিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে। তখন বিএনপি অভিযোগ করে, তাঁকে ‘গৃহবন্দী’ করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ অক্টোবর ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা জনসমক্ষে বের হন।
অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর সকালে আদালতে যান বলে ‘আ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব তাঁকে জানান ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন দুপুর ১২টায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান। তিনি তাঁকে আসার অনুমতি দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন করছেন বলে জানান তিনি (ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক)। তিনি (সাইফুল) ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসের ছুটিতে যাওয়ার কথা বলেন। তা প্রত্যাখ্যান করি।’
সেদিন বাসায় ফেরার পর গৃহবন্দী হয়ে পড়েন বলে উল্লেখ করেন এই সাবেক প্রধান বিচারপতি।
সে সময় আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে আগামী ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিন ছুটি মঞ্জুরের বিষয়ে সানুগ্রহ অনুমোদন প্রদান করেছেন। প্রধান বিচারপতির অসুস্থতাজনিত ছুটি ভোগকালীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে দেশের প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্ব দিয়েছেন।’
দেশ ছাড়ার সময় বিবৃতি
সরকারের পক্ষ থেকে ‘অসুস্থতাজনিত ছুটির’ কথা বলা হলেও বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তিনি অসুস্থ নন, তিনি ভালো আছেন। তিনি একটু বিব্রত।…বিচার বিভাগের স্বার্থে, বিচার বিভাগ যাতে কোনোভাবে কলুষিত না হয়, এ জন্য তিনি সাময়িকভাবে যাচ্ছেন।’
এরপর লিখিত বিবৃতি উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের হস্তান্তর করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, তিনি সুস্থ আছেন। ইদানীং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী যেভাবে তাঁর সমালোচনা করেছেন, এতে তিনি সত্যিই বিব্রত।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দেশত্যাগ ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। সে সময় (১৪ অক্টোবর, ২০১৭) বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে যা ঘটেছে, তা সরাসরি বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ।
এদিকে সুরেন্দ্র কুমার উল্লেখ করেন, তৎকালীন সরকার দেশত্যাগ করতে তাঁকে বাধ্য করেছিল। তিনি বলেন, ‘মানে এটাকে বলে কন্সপিরেসি (ষড়যন্ত্র), একেবারে কন্সপিরেসি। প্রথমত, ডিজিএফআইকে ব্যবহার করা হয়েছিল।…বিচারক হওয়ার কারণে হয়তো আমাকে আয়না ঘরে নিতে পারেনি। আপিল বিভাগের সহকর্মী বিচারকেরা বঙ্গভবন থেকে ফিরে এসে রাতারাতি আমার সঙ্গে বসবেন (আদালতে) না বলে বললেন।’
যদি না বসেন (তাঁর সঙ্গে একই বেঞ্চে) তাহলে একজন প্রধান বিচারপতির কী আর থাকতে পারে, এমন প্রশ্ন রেখে সাবেক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘অথচ এর কিছুদিন আগে রায় (ষোড়শ সংশোধনী) দিলাম, একসঙ্গে দিলাম। রায়ের পর কী হয়ে গেল?’
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান বলেছিলেন, “স্যার আপনি থাকতে পারবেন না, আপনাকে দেশের বাইরে যেতে হবে।” ডিজিএফআই ও শেখ হাসিনার চোখ রাঙানি আমি ভয় পাইনি।...ভয় পেয়েছিলাম সহকর্মীদের ভূমিকায়। সহকর্মী বিচারকেরা যেহেতু সহযোগিতা করলেন না, আমি কী আর করব?’
‘নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না, একপর্যায়ে দেশের বাইরে এলাম। ১৩ অক্টোবর (২০১৭) দেশ থেকে বের হই’, বলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
মূলত ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের প্রেক্ষাপটে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, ‘অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সরকারের অধীনে। মাসদার হোসেন মামলার রায় হয়েছে, রায় (অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা) বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় সংসদের অধীনে, মানে নির্বাহীর অধীনে ফিরিয়ে নিতে ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। আমি প্রতিবাদ করলাম। রায় দিয়ে বললাম ষোড়শ সংশোধনী যেটা করেছিল, তা অবৈধ। ওই আমার প্রতি ক্ষোভ—এটাই।’
চাকরির সুবিধাদি পেয়েছেন কি
অর্জিত ছুটি নগদায়ন (ল্যাম্প গ্রান্ট অর্থাৎ ১৮ মাসের মূল্য বেতনের সমপরিমাণ অর্থ) পেয়েছেন বলে জানান সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, ‘১৮ মাসের মধ্যে আগে ১২ মাসের পাওনা অর্থ দিয়েছিল। বাকি ছয় মাস (ল্যাম্প গ্রান্ট) ও পেনশনের জন্য এখান (কানাডা থেকে) থেকে আবেদন করি। ছয় মাসের টাকা দিয়েছে।’
তবে পেনশন দিচ্ছে না অভিযোগ করে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘বলছে কনসাল জেনারেলের কাছ থেকে আমার দস্তখত কাউন্টার সাইন করা লাগবে। আই এম দ্য লাস্ট পারসন, একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যায়ের বা অফিসারের কাছে গিয়ে আমার সিগনেচার কাউন্টার সাইন করব, এটা অপমানজনক।…আমি না খেয়ে মরছি কিন্তু আমি কোনো দিনই ‘বো ডাউন’ (নত হওয়া) করি নাই।’
‘কোনো রেসপন্স পাইনি’
দেশত্যাগের পর সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) চার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা এক মামলায় ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর রায় দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক। রায়ে দুটি ধারায় সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ৭ ও ৪ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সাবেক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘তিনটি কি না, জানি না। তবে একটি মামলা পড়েছি, যে মামলায় দণ্ড দেওয়া হয়েছে। উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের বাড়ি বিক্রি করে, বিক্রি করা টাকা থেকে চার নম্বর সেক্টরের অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছি, যা আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেছি। সম্পূর্ণ সত্য আড়াল করে মনগড়া ওই মামলা সাজানো হয়েছে।’
সাবেক এই প্রধান বিচারপতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দেশে ফিরতে চাই। পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছি, দুই বছরের বেশি হয়ে গেল। কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে রিমাইন্ডার দিয়ে সর্বশেষ ৪ আগস্ট মেইল পাঠিয়ে বললাম—এর কী অবস্থা? কোনো রেসপন্স পাইনি।’
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘দাবানল হয়ে ছড়াচ্ছে বিক্ষোভ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দিল্লির রাজপথে নিরাপত্তার কড়াকড়ি, ব্যারিকেড, আটক, যান চলাচলে বিধিনিষেধ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদ বাঁচাতে ভারতের রাজধানী শহরটিতে রেড অ্যালার্টের আবহ বিরাজ করছে। এ অবস্থায়ও সোমবার সেখানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। কংগ্রেস বিরোধী নেতৃত্বাধীন বিরোধী ইন্ডিয়া জোট লাখো মানুষের জনসমাগম ঘটনায়। এতে কার্যত জনারণ্যে পরিণত হয় দিল্লি। তবে এদিন পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের মারধর বা হেনস্তা করতে দেখা যায়নি।
সোমবার এ বিক্ষোভ থেকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী উচ্চারণ করেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পরও আমরা থামব না; শুরু হবে নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পালা। এদিন দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, তারা যন্তর মন্তরে আর কোনো বিক্ষোভ করতে দেবে না। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, তারা মাথা নোয়াবেন না; বরং পুরো ভারতকেই যন্তর মন্তর বানানো হবে।
ব্যাপক ধরপাকড় আর নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কার্যত ফুঁসছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিরোধী দলগুলো। সোমবার কংগ্রেসের বিক্ষোভের বাইরেও দিল্লিতে বিক্ষিপ্তভাবে আন্দোলন হয়েছে। অমিত শাহের নিয়ন্ত্রণে থাকা পুলিশ সিজেপিসহ বিভিন্ন দলকে বলছে, যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানে যেন বিক্ষোভ করা হয়।
প্রশ্ন উঠছে, যান চলাচল ও নিরাপত্তা সামলানোর যুক্তিতে নেওয়া এ সিদ্ধান্ত কি আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাতও কমিয়ে দেবে? সিজেপি নেতৃত্বের হুঁশিয়ারি, জায়গা বদল করে আন্দোলন থামানো যাবে না। এ অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের আরও কয়েকটি রাজ্যে বিক্ষোভের উত্তাপ টের পাওয়া যাচ্ছে।
মাথা নোয়ানোর প্রশ্নই নেই, সিজেপির হুঁশিয়ারি: গত শনিবার দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও আন্দোলন থেকে সরেননি সিজেপির অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। তারা বলছেন, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর নামে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে। অভিজিৎ দীপকের বার্তা, যন্তর মন্তরে আন্দোলনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হলেও আন্দোলন থামবে না, বরং পুরো দেশকেই যন্তর মন্তর করে তোলা হবে।
সৌরভ দাসের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা নাগরিক অধিকার। সেই অধিকার প্রয়োগের পথ আটকে দেওয়ার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিকভাবেই লড়াই চলবে। আশুতোষ রাঙ্কাও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে অনড়। সোমবার সিজেপি দিল্লি পুলিশের কাছে যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের দিন ও সময় নির্ধারণের দাবি জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য, অনুমতি না মিললে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। ফলে প্রতিবাদের স্থান বদলের সরকারি সিদ্ধান্তের পরেও সংঘাত থামার লক্ষণ নেই।
রেড অ্যালার্টের আবহ : গত শনিবারের (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভের আগে থেকেই দিল্লিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন, ব্যারিকেড, যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, মেট্রো পরিষেবায় বিধিনিষেধ এবং আটক করার প্রস্তুতি-সব মিলিয়ে দিল্লির একাধিক এলাকায় তৈরি হয় কড়া নিরাপত্তার পরিবেশ। বিক্ষোভের দিন বহু মানুষকে আটক করা হয়। পরবর্তী দিনগুলোতেও প্রতিবাদস্থল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি অব্যাহত থাকে।
সূত্র জানায়, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে সরিয়েছে। নতুন তিনটি জায়গা হলো রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান। প্রশাসনের যুক্তি, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ পরিচালনার জন্য বিকল্প জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের আশঙ্কা, কেন্দ্রীয় দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকার বদলে দূরের মাঠে আন্দোলন সরিয়ে দিলে তার দৃশ্যমানতা ও জনসমর্থন তুলে ধরার সুযোগ কমতে পারে। এ সিদ্ধান্ত এমন সময় এলো, যখন সিজেপি, ছাত্র সংগঠন এবং বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরদার করছে।
জ্ঞানেশের পর মোদি ও অমিত শাহের পালা-রাহুল : দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে সোমবার বিরোধী দলের নেতারা আবেদন করেন। একই দাবিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে লাখো কর্মী-সমর্থক সুপ্রিমকোর্ট অভিমুখে মিছিল করেন। রাহুলের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরাও ছিলেন। তারা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও তার পদত্যাগ দাবি করেন। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব। আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াটিতে নানা অনিয়ম হয়েছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে মিছিলটি তিলক মার্গ হয়ে সুপ্রিমকোর্টের দিকে যাচ্ছিল।
তবে ভগবান দাস রোডে পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দেয়। ফলে মিছিলটি সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। হাজারো মানুষ তখনো ভগবান দাস রোড ও আশপাশ এলাকায় অবস্থান করছিলেন। মিছিল শুরুর আগে সাংবাদিকদের রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আলাদা কোনো আন্দোলন হচ্ছে না। রাহুলের ভাষায়, ‘আলাদা কোনো প্রতিবাদ নেই। জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর জন্য একটিই প্রতিবাদ চলছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী, অমিত শাহের পালা। আমরা থামব না।’ কংগ্রেসের এ নেতা অভিযোগ করেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের চাপে কাজ করছেন।
পরে রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে সাংবাদিকদের বলেন, তার হাতে এখনো সরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। একই সঙ্গে রাজসাক্ষী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের চাপের কারণে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হচ্ছে।
কালের কণ্ঠ
‘জ্বালানি নিরাপত্তায় এবার কয়লা উত্তোলনে নজর’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়ায় দেশের নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের সম্ভাবনাময় কয়লাখনিগুলোর উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে সরকার।
এ ক্ষেত্রে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খনিটি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উন্নয়নের পাশাপাশি জমির মালিকদের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগির পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণের আন্দোলন ও পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে আটকে থাকা ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্নয়নে এবার নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, খনির জন্য জমি ইজারা নেওয়ার বিনিময়ে মালিকদের অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি মুনাফার একটি অংশ তাঁদের মধ্যে বণ্টন করা হতে পারে।
ইজারার মেয়াদ শেষে জমি ফেরত দেওয়া, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, আবাসন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় রয়েছে। তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক মানুষের পুনর্বাসন, কৃষিজমি রক্ষা, সুপেয় পানির সংস্থান ও পরিবেশগত প্রভাব মোকাবেলা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে খনিগুলোর প্রকৌশলগত, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দেশের নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়েছে। এতে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দিঘিপাড়া খনির পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। জামালগঞ্জ খনির সমীক্ষা এবং অন্যান্য খনির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফুলবাড়ী খনি উন্নয়নের বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খনির জন্য ইজারা নেওয়া জমির মালিকদের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আরো আলোচনা শেষে ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্নয়নের চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি কয়লা উত্তোলনেরও পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কয়লা উত্তোলনে সব ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার খনিসংলগ্ন এলাকার জমির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে। জমির ইজারা বাবদ অর্থের পাশাপাশি খনির মুনাফার একটি অংশ তাদের দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফুলবাড়ীতে বছরে দেড় কোটি টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা : কয়লাখনির তথ্য অনুযায়ী, ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লার মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭৫ মিলিয়ন টন উত্তোলনযোগ্য বলে ধারণা করা হয়। খনিটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা গেলে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা উত্তোলন সম্ভব হতে পারে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, ফুলবাড়ী খনি এলাকায় প্রায় ১০ হাজার একর জায়গাজুড়ে ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। খনি উন্নয়নে প্রায় ৪৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমি, বসতবাড়ি স্থানান্তর, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
ফুলবাড়ী খনি উন্নয়নের উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক জিসিএম রিসোর্সেস পিএলসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জি করপোরেশন (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি আগে খনিটির সম্ভাব্যতা যাচাই করে উন্নয়ন পরিকল্পনা জমা দিয়েছিল। পরে খনির পাশে সর্বোচ্চ এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের পর প্রকল্পটির অগ্রগতি থেমে যায়।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘একক প্রার্থীর চ্যালেঞ্জে বিএনপি ইসিতে আশ্বস্ত নয় জামায়াত’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সূচি ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবারের নির্বাচন পাঁচটি ধাপে আয়োজন করা হবে। প্রথম ধাপের ভোট হবে আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি।
গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সভাকক্ষে ইসির ১৩তম কমিশন সভায় সময়সূচি চূড়ান্ত করে কমিশন। পরে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ভোটের রোডম্যাপ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ৪ হাজার ৩০০ ইউপির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয় নির্বাচনের এই সময়সূচি নিয়ে বিএনপি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে স্থানীয় নির্বাচন শুরুর ঘোষণা দিয়েও সরকারের প্রতিক্রিয়ার পর নির্বাচন কমিশন একবার পিছিয়ে যাওয়ায় ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্থাটি নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কিনা- এ নিয়ে সন্দিহান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াত বলছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে হানাহানি হতে পারে এমন আশঙ্কায় সরকারি দল নির্বাচন চায় না। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচন হবে কিনা, সন্দেহ রয়েছে। তবে জামায়াত নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। এনসিপিও দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন চায়।
জামায়াত ২০২৫ সালের শুরুতেই ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভায় কারা দল সমর্থিত প্রার্থী হবেন, তা নির্ধারণ করেছে। তারা জনসংযোগও অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে আসন্ন ইউপি নির্বাচনে কোন্দল মোকাবিলা করে চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী বাছাই করা ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
২০১৬ সালের ২২ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ছয়টি ধাপে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলভিত্তিকভাবে এবং দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্যানুযায়ী, ওই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ভোট; তখন ১০১ জন নিহত হন।
২০২১ সালের নভেম্বর থেকে সাত ধাপে হয়েছিল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। সেবার চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে এবং ৯টি সাধারণ ওয়ার্ডে ও তিনটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে নির্দলীয় পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নির্বাচনে ১১৩ জন নিহত এবং সাত হাজার ২০১ জন আহত হন।
আগের দুই নির্বাচনে সে সময়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং বিদ্রোহী স্বতন্ত্রদের সংঘর্ষে অধিকাংশ প্রাণহানি হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদশে জারি করে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাদ দেয়। বিএনপি সরকার তা আইনে পরিণত করেছে।
ইত্তেফাক
‘পাঁচ ধাপের ইউপি নির্বাচন ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন পাঁচ ধাপে করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম ধাপে ভোট হবে আগামী ২১ জানুয়ারি। দ্বিতীয় ধাপে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপে ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপে ১৩ মে এবং পঞ্চম ধাপে ভোট হবে ২৭ মে। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে গতকাল সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ১৩তম ইসি কমিশন বৈঠকে ইউপি ভোটের রোড ম্যাপ চূড়ান্ত হয়। বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে ৮০ উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে। এদিকে আগামী ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তপশিল ঘোষণা করা হতে পারে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা এ তপশিল ঘোষণা করবেন। প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এর আগে বলেছিলেন, ‘তপশিল আমরা ঘোষণা করব না। তপশিল ঘোষণা করবেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা। আমরা স্লটগুলো বলে দেব যে, কোন কোন স্লটে নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে।’
এই নির্বাচনের প্রাক্প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে গত ১৪ সেপ্টেম্বর আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছিলেন, প্রাথমিকভাবে সাত ধাপে ভোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী ১২ নভেম্বর শুরু করে ২৭ মে ভোট শেষ করার কথা ছিল। তবে ইসির ভাবনা প্রকাশ হওয়ার পর ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার ‘কিছুই জানে না’। এ পরিস্থিতিতে ইসির তরফে বলা হয়, সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঠিক করা হবে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে বৈঠকে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন করতে স্কুল-কলেজের ফাইনাল পরীক্ষাসহ নানা অসুবিধার কথা তুলে ধরা হয়। তখন ইসি জানিয়েছিল, আরো আলোচনা করে নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে। গত বৃহস্পতিবার ইসি জানাল, ইউপি ভোটের দিনক্ষণ ১২ অক্টোবর জানানো হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, সাড়ে চার হাজার ইউপির মধ্যে আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০-এর মতো নির্বাচন উপযোগী রয়েছে, সেগুলো ২৭ মের মধ্যে শেষ করা হবে। ইসি ভোটের তারিখ দিয়েছে; আর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা ছয় সপ্তাহ বা যখন যে নির্বাচন হবে, ৩৮-৪২ দিন আগে তপশিল ঘোষণা করবেন। তিনি বলেন, এই পাঁচটি দিনে ভোট হবে, সব নির্বাচনই বৃহস্পতিবার পড়েছে। সব জেলায় একই সঙ্গে নির্বাচন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। এক্ষেত্রে সদর উপজেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি যেসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনেক দিন ধরে বকেয়া রয়েছে কিংবা যেগুলোর মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, সেগুলোও অগ্রাধিকার পাবে। পরবর্তী পর্যায়ে বাকি উপজেলাগুলোর নির্বাচন সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বর্ণানুক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করা হবে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে ইউপি নির্বাচন কতটা সহায়ক হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একই ধরনের উদ্বেগের কথা কমিশনকে শুনতে হয়েছে। এর পরও জাতীয় নির্বাচন স্মরণকালের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি না, বাংলাদেশ আর কোনো সংঘাতময় নির্বাচনের পথে হাঁটতে প্রস্তুত আছে।’ নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা কামনা করে সানাউল্লাহ বলেন, কমিশন যে ভালো নির্বাচনের সংস্কৃতি শুরু করেছে, তা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজন সহযোগিতা করলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সংঘাতপূর্ণ হবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নভেম্বর ফের স্মার্ট কার্ড মুদ্রণ শুরু :নভেম্বর মাস থেকে পার্সোনালাইজেশন সেন্টারে স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট শুরু হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের আলোচ্যসূচি তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, যা পরবর্তীকালে একটি কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে। আগামী মাসের মাঝামাঝি থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট করার এবং অডিট অবজেকশনসহ অন্যান্য প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান করা হবে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার খবর ‘কিভাবে ডুবল ব্যাংক খাত’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন আর কেবল কিছু ব্যবসায়ীর ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার সমস্যা নয়; এটি আর্থিক খাতের সুশাসন, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দীর্ঘদিনের দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে এই পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা; অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
দুই বছর আগেও পরিস্থিতি এত দৃশ্যমান ছিল না। ২০২৪ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জুনে বেড়ে ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশে পৌঁছায়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে এই হার দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে। পরে ডিসেম্বর শেষে কমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ হলেও ২০২৬ সালের জুনে তা আবার বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে ঠেকেছে।
ঋণ বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ: নিয়ম নাকি অনিয়ম?
এই বৃদ্ধির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নতুন করে ঋণখেলাপি হওয়ার পাশাপাশি ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর করা, অতীতে আড়ালে থাকা অনাদায়ী ঋণ প্রকাশ্যে আসা এবং পুরনো ঋণের সুদ জমে যাওয়াও মোট খেলাপি ঋণের অঙ্ক বাড়িয়েছে, অর্থাৎ ব্যাংক খাতের সমস্যার একটি অংশ বহু বছর ধরে জমে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার বড় অংশ হিসাবের খাতায় দৃশ্যমান হয়েছে।
আইএমএফের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম পরিবর্তন করে। আগে কিছু মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধের তারিখ পার হওয়ার পরও অতিরিক্ত সময় পাওয়া যেত। নতুন ব্যবস্থায় নির্ধারিত পরিশোধের তারিখের পরদিনই বকেয়া হিসাব করার নিয়ম চালু হয়, যা ধাপে ধাপে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে কার্যকর করা হয়।
এর ফলে আগে যে ঋণ আরো দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো সম্ভব হতো, তার কিছু অংশ নতুন নিয়মে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়। তবে নিয়ম কঠোর করার কারণে পরিসংখ্যান বেড়েছে- এ কথা বলে সমস্যার প্রকৃত গুরুত্ব কমিয়ে দেখার সুযোগ নেই; বরং আগে থেকেই ঋণ আদায় দুর্বল ছিল কি না এবং কেন সেই দুর্বলতা যথাসময়ে শনাক্ত হয়নি, তা খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।
খাতভিত্তিক প্রভাব: উৎপাদনশীল অর্থায়নে চাপ
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও উৎপাদনশীল অর্থায়নের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে। এসএমই খাতের সঙ্কোচন : ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ব্যাংক ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত রোববার প্রকাশ করা সারণি অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসএমই ঋণ বিতরণ হয়েছিল দুই লাখ ২৫ হাজার ১৩০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় দুই লাখ পাঁচ হাজার ৪৯৩ কোটি ১৬ লাখ টাকায়; অর্থাৎ এক বছরে বিতরণ কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ।
শিল্পঋণের শেষ প্রান্তিকে পতন: শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণে বার্ষিক হিসাবে সামান্য প্রবৃদ্ধি (২ দশমিক ৭৪ শতাংশ) দেখা গেলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ২৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আগের বছরের একই প্রান্তিকে তা ছিল ৩১ হাজার ৮২ কোটি টাকা। সে হিসাবে শেষ প্রান্তিকে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় সাড়ে ৩৫ শতাংশ।
কৃষিঋণে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি : শিল্প ও এসএমই খাতের বিপরীতে কৃষি ও অকৃষি পল্লী ঋণ বিতরণে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্টে মোট বিতরণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৮৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতিতে আশার সঞ্চার করলেও ঋণের অর্থ প্রকৃত কৃষকদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আজকের পত্রিকা
‘সৌদিতে হামলায় দুশ্চিন্তায় প্রবাসীরা’—এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রিয়াদের কিং খালিদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে চলছে ফ্লাইটের কার্যক্রম। কোথাও ফ্লাইট একেবারেই বন্ধ। সৌদিমুখী অনেক ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫১টি ফ্লাইটের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ফ্লাইটের সময়সূচির অনিশ্চয়তায় বিপাকে পড়েছেন হাজারো সৌদিপ্রবাসী। তাঁদের অনেকের ছুটি শেষ হয়ে গেছে। কারও ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি হারানো কিংবা আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কায় উদ্বেগের মধ্যে সময় কাটছে তাঁদের।
ঢাকায় আটকে পড়া যাত্রীদের মধ্যে সৌদি আরবগামী সরাসরি ফ্লাইটের যাত্রী যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন অন্য দেশের বিমানবন্দর হয়ে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী ট্রানজিট যাত্রীরাও।
গতকাল সন্ধ্যায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট শাখার স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব জানান, কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ৫১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ১২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৩৯টি। সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের তিনটি ফ্লাইট রয়েছে।
ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, সালামএয়ারের তিনটি, ইজিপ্টএয়ারের একটি, এমিরেটসের নয়টি, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচটি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের পাঁচটি ফ্লাইট রয়েছে।
রিয়াদ অভিমুখী ফ্লাইট স্থগিত
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিমান কর্তৃপক্ষ বলেছে, বাংলাদেশ সময় ও তারিখ অনুযায়ী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত থাকবে। স্থগিত ফ্লাইটগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নতুন সময়সূচি যথাসময়ে জানানো হবে। একই পরিস্থিতিতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। সংস্থাটির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় তাদের বিএস৩৮১ ও বিএস৩৮২ ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকবে। নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিঘ্নিত অন্যান্য ফ্লাইট
নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ঢাকা-দাম্মাম রুটেও ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৯ ফ্লাইটটি গতকাল বেলা ৩টা ১০ মিনিটে স্থগিত করা হয়। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফ্লাইটটির পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নতুন সময়সূচি সম্পর্কে আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হবে। এর আগের দিন রোববারও একই ফ্লাইট নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ঢাকা থেকে দাম্মামের উদ্দেশে যাত্রার সময় সৌদি আরবের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও কিছু সময় পরে তা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় বিজি-৩৪৯ ফ্লাইটটি বাংলাদেশ সময় রাত আড়াইটায় কাতারের দোহা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর দাম্মাম বিমানবন্দর আবার চালু হলে ফ্লাইটটি বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছায়।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম অজ্ঞাত লাশের আড়ালে ‘হত্যা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১২ জুলাই নিখোঁজ হন শরীয়তপুরের যুবক হানিফ ঢালি। পরিবারের সদস্যরা খোঁজ করেও তার সন্ধান পাননি। তিন দিন পর ১৫ জুলাই গোসাইহাটের একটি পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিচয় না থাকায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। তদন্তের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে প্রতিবেশী কয়েকজন মিলে তাকে হত্যা করে। নিহতের বাবা বাদী হয়ে ২০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। একই ঘটনা ঘটেছে বছর তিনেক আগে রাজশাহীর শাহমখদুম এলাকায়। সেখানে একটি ডোবা থেকে এক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পিবিআইয়ের তদন্তে তার নাম রোকসানা বলে জানা যায়। তাকে পরকীয়ার জেরে হত্যা করা হয়।
এই দুটি ঘটনার মতোই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের পর জানা যায় সেটি হত্যাকান্ড। এমন অনেক হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আবার কোনো লাশের কূলকিনারা হচ্ছে না। দিন দিন অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। পুলিশের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে দুই হাজার অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে ২০২৩ সালে উদ্ধার হয় ৩৬২টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ। ২০২৪ সালে বেড়ে ৫১০ ও ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ৬৪১টিতে। চলতি বছরের ৯ মাসেই উদ্ধার হয়েছে ৪৮৯টি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তের অভাবে ভুক্তভোগীর পরিবার জানতে পারে না স্বজন বেঁচে আছে নাকি মারা গেছেন। ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগও মেলে না। হত্যাকাণ্ড হলেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিচার। বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা, মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিক সংকটে ভুগতে হয় পরিবারকে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এফআইভিইএস অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিলেও কেবল ফিঙ্গার প্রিন্টভিত্তিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব হচ্ছে না। অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্ত অনেক সময় ভয়ঙ্কর অপরাধ উদ্ঘাটনেরও প্রথম দরজা। বহুক্ষেত্রে একটি অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয়ই হয়ে ওঠে পুরো তদন্তের টার্নিং পয়েন্ট। পরিচয় জানা না গেলে হত্যার উদ্দেশ্য, অপরাধী চক্র, পূর্বশত্রুতা, অর্থনৈতিক বিরোধ কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের নেটওয়ার্ক শনাক্তে মাঝে মধ্যে কঠিন হয়ে পড়ছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আমরা তদন্ত করছি। অজ্ঞাত লাশগুলোর আরও গভীর তদন্তে অনেক ক্ষেত্রে রহস্য উদ্ঘাটন হচ্ছে। ধরা হচ্ছে অপরাধী। ক্লুলেস ঘটনার রহস্যও বেরিয়ে আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ভাসমান মানুষের পরিচয় সংগ্রহ বা তালিকা করা বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এতে তারা কোনো অপরাধে জড়িয়ে গেলে যেমন চিহ্নিত করা যাবে, তেমনি মৃত্যুর পর তাদের লাশ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়। এটি প্রতিরোধ করতেই হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে। গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘অনিশ্চয়তায় সৌদিগামী কর্মীরা’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। প্রতিবেদনে বলা হয়, হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের পর দাম্মাম বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সীমিত হওয়ায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। লন্ডভন্ড হয়েছে সৌদিগামী ফ্লাইটের শিডিউল। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে দেশে আটকে পড়েছে সাড়ে ৫ হাজার বাংলাদেশি। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ঢাকায় এসে শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছানো প্রবাসী কর্মীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। আটকে পড়াদের অনেকেরই সৌদি আরবে প্রবেশের সময়সীমা শেষের দিকে থাকায় তৈরি হয়েছে তাঁদের কাজের অনিশ্চয়তা। এ অবস্থায় বিকল্প ফ্লাইটে সৌদি আরবে যাত্রী পাঠানোর চেষ্টা করছে সরকার। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকতে বলেছে বাংলাদেশ দূতাবাস। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় হুতিদের হামলায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার কারণে এখন পর্যন্ত ১২টি সরাসরি ও ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। দেশে আটকে পড়েছে ৫ হাজার ৪১৮ জন যাত্রী। বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৪, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২, সাউদিয়া এয়ারলাইনসের ৩ ও রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৩টি ফ্লাইট রয়েছে। এ ছাড়া ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের ১৬, সালাম এয়ারের ৩, ইজিপ্ট এয়ারের ১, এমিরেটস এয়ারলাইনসের ৯, কাতার এয়ারওয়েজের ৫, ফ্লাই দুবাইয়ের ৫টি ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রিয়াদগামী ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর এবং ইউএস-বাংলার ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গতকাল পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে বিমান বাংলাদেশ ও ইউএস-বাংলার পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিমান জানায়, সংস্থাটির ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে।
ইউএস-বাংলার জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘২১ অক্টোবর পর্যন্ত ইউএস-বাংলার ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।’ বেবিচকের তথ্যানুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধের প্রভাব এখন শুধু সরাসরি ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ট্রানজিট ফ্লাইটও এর আওতায় এসেছে। রিয়াদগামী সব ফ্লাইট হয় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো বাতিল করা হয়েছে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গতকাল দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দেখা যায় রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব প্রবাসীর অনেকেই জানেন না কবে আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পাবেন, কিংবা টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করতে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফ্লাইট বাতিলের পর বিকল্প যাত্রার নিশ্চয়তা না পেয়ে তাঁদের চোখে মুখে ছিল দুশ্চিন্তার ছাপ। বিদেশে কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে না পারার আশঙ্কার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন করে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচের চাপ। সৌদিপ্রবাসী রফিকুল ইসলামের ছুটি কাটিয়ে গতকাল দুপুরে রিয়াদে ফেরার কথা ছিল। আগেই টিকিট কেটে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পরবর্তী ফ্লাইট কখন ছাড়বে, সে সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছেন না।
