গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে: হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে: হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

ফন্ট সাইজ:

গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে মর্মে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। সোমবার হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে, গ্রামীণ টেলিকমের উৎসে কর কর্তন ও জমার চালান দেখিয়ে গ্রামীণ কল্যাণ তাদের অপরিশোধিত আয়কর পরিশোধ হিসেবে দাবি করতে পারে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির দায়ের করা রিট আবেদন খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অপরিশোধিত কর আদায়ে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ডিমান্ড নোটিশ জারির জন্য রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি মো. রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত পূর্বে জারি করা রুল খারিজ করেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ বাতিল ঘোষণা করেন।

মামলার প্রেক্ষাপট: নথি অনুযায়ী, কর অঞ্চল-১৪ (কোম্পানিজ), সার্কেল-২৮৭-এর করদাতা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণ ২০১২-২০১৩, ২০১৩-২০১৪, ২০১৪-২০১৫, ২০১৫-২০১৬ এবং ২০১৬-২০১৭ করবর্ষে তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করে। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে গ্রামীণফোন লিমিটেডের লভ্যাংশের আয়ের অংশ দেখিয়ে ২০ শতাংশ হারে কর প্রযোজ্য দাবি করে আসছিল।
পরবর্তীতে কর অঞ্চল-১৪-এর অতিরিক্ত কর কমিশনার (পরিদর্শী রেঞ্জ-১) আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ১২০ ধারার অধীনে কার্যধারা শুরু করে পূর্বের অ্যাসেসমেন্ট বাতিল করেন এবং লভ্যাংশের বদলে একে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ (Income from other sources - ধারা ৩৩) হিসেবে ৩৭.৫০% হারে কর আরোপের নির্দেশ দেন।
এর বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণ হাইকোর্টে রিট (রিট পিটিশন নং ১৪৩৬৪/২০১৭) করলে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর প্রতিষ্ঠানটি আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ ধারায় কর কমিশনারের (প্রতিপক্ষ নং ২) কাছে রিভিশন আবেদন করে।
২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর কর কমিশনার রিভিশন আবেদন খারিজের আদেশে ভুলবশত উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘দাখিলকৃত রিটার্নের ভিত্তিতে প্রদেয় কর পরিশোধিত’। পরবর্তীতে এই কর প্রকৃতপক্ষে পরিশোধিত না থাকায় ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর নোটিশ দিয়ে কর কমিশনার আয়কর অধ্যাদেশের ১৭৩ ধারার ক্ষমতাবলে একই বছরের ২৭ নভেম্বর আদেশ সংশোধন (Rectification) করেন। সংশোধিত আদেশে ‘পরিশোধিত’ শব্দের স্থলে ‘অপরিশোধিত’ প্রতিস্থাপন করা হয় এবং আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ(৪)(বি) ধারার শর্তানুযায়ী অবিসংবাদিত কর পরিশোধ না করায় রিভিশন মামলা খারিজ (Reject) করা হয়।
কর কমিশনারের এই সংশোধন ও খারিজের আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালেই হাইকোর্টে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে রিট পিটিশন নং ১৭৭২৭/২০১৭ দায়ের করে গ্রামীণ কল্যাণ। ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল নিশি জারি করেন এবং কর কমিশনারের আদেশের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির আদেশক্রমে মামলাটি শুনানির জন্য এ বেঞ্চে পাঠানো হয়।

আদালতে উভয় পক্ষের যুক্তি: আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম. কামাল ও আইনজীবী সরদার জিন্নাত আলী (সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, আইনজীবী মো. উম্বর আলী, মো. দেলোয়ার হোসেন, খাজা তানভীর আহমেদ ও সৈয়দ মুনতাজিম আলী)।
শুনানিতে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, উপ-কর কমিশনার (ডিসিটি) ট্রাইব্যুনালের সামনে আইটি-৫৯ সনদে কর পরিশোধের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। তাছাড়া কর কমিশনার নিজের আগের আদেশ পর্যালোচনা বা সংশোধন করে বাতিল করতে পারেন না, যা এখতিয়ারবহির্ভূত (coram non judice) এবং আইনগতভাবে টেকসই নয়।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ও ২ নম্বর প্রতিপক্ষের পক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আব্দুস সামাদ আজাদ (সঙ্গে ছিলেন ডিএজি এ. এম. জামিউল হক ফয়সাল, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, আরিফুল আলম, সাবিকুন নাহার, মো. আরিফুর রহমান ও মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান)।
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে হলফনামা (Affidavit-in-opposition) দাখিল করে জানানো হয়, গ্রামীণ কল্যাণ অধ্যাদেশের ৭৪(১) ধারার আবশ্যিক শর্ত পূরণ করেনি এবং নিজস্ব নামে চালান বা পে-অর্ডার দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামীণ টেলিকমের নামে জমাকৃত উৎসে করের চালান দেখিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে চেষ্টা করেছে। এছাড়া কর কমিশনার অধ্যাদেশের ১৭৩ ধারার এখতিয়ার অনুযায়ী শুনানি ও নোটিশের সুযোগ দিয়েই স্পষ্ট করণিক ভুল সংশোধন করেছেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও রায়: উভয় পক্ষের শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ে উল্লেখ করেন: ১. আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ(৪)(বি) ধারা অনুযায়ী রিভিশন দায়েরের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো অবিসংবাদিত কর পরিশোধ করা। গ্রামীণ কল্যাণ নিজস্ব নামে দাখিলকৃত রিটার্নের ভিত্তিতে ধারা ৭৪ অনুযায়ী আইনগতভাবে কর পরিশোধ করতে বাধ্য ছিল। গ্রামীণ টেলিকমের নামে উৎসে কর্তিত করকে নিজেদের পরিশোধ বলে দাবি করে দায় এড়ানোর কোনো আইনগত সুযোগ নেই। ২. আয়কর অধ্যাদেশের ১৭৩ ধারা অনুযায়ী কর কমিশনারের নিজ উদ্যোগে পূর্বের আদেশের ভুল সংশোধনের পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে। কর কমিশনার আবেদনকারীকে শুনানির নোটিশ দিয়ে ও ব্যাখ্যা শুনেই ১৩ দিনের মধ্যে এ সংশোধন এনেছেন। ৩. কর কমিশনারের সংশোধিত আদেশে কোনো ধরনের বেআইনি উপাদান নেই, যা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের দাবি রাখে।
এসব পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে আদালত গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা রিট পিটিশনের রুল খারিজ ঘোষণা করেন এবং স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেন। একই সঙ্গে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে অপরিশোধিত কর আদায়ে অনতিবিলম্বে ডিমান্ড নোটিশ জারি করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।