কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যার ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যাচ্ছে, অটোরিকশাচালক সুমনই তাজমিনকে ধর্ষণ ও পরে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার সকাল ১০টায় জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া। শনিবার কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত সুমনের দেয়া জবানবন্দির বরাতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া। পুলিশ জানান, গত ৮ই অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্সের বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে ৩০০ টাকা ভাড়া ঠিক হয়। অটোরিকশায় ওঠার পর কিছুদূর গিয়ে তাজমিনের দেয়া ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনেছিল সুমন।
এরপর তাকে শর্টকাটে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুরগামী সড়ক ধরে বিজরা বাজার হয়ে নির্জন এলাকার দিকে নিয়ে যায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্জন ও অন্ধকার স্থানে পৌঁছে সুমন অটোরিকশা থামিয়ে দেয়। জায়গাটি রেসকোর্স নয় বুঝতে পেরে তাজমিন ভয় পেয়ে অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় সুমন তাকে আটকে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার চেষ্টা করলে তাজমিন চিৎকার শুরু করে। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তাজমিনকে ধর্ষণের কথা জানিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি গামছা তাজমিনের গলায় পেঁচিয়ে ধরেন। ধস্তাধস্তির পর তাজমিন দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে মাথা পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করার কথা জানান অভিযুক্ত।
তাজমিনের মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে আইফোনটি নিয়ে নেন সুমন। পরে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে রেখে ঘটনাস্থলে নিজের অটোরিকশাটি রেখে কাচিকাটা মসজিদের সামনে যান। সেখানে একটি পুকুরে গোসল করে অন্য একটি ভাড়ায় চালিত সিএনজিতে করে বাখরাবাদ এলাকায় পৌঁছান। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ই অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর (উত্তরপাড়া) গ্রামের একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকার খবর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন আসে। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্তের কার্যক্রম শুরু করে। পরে নিহতের বাবা মরদেহটি শনাক্ত করেন। নিহত জান্নাতুল তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার স্থায়ী ঠিকানা যশোর জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করতো সে।
এ ঘটনায় লালমাই থানায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলা হওয়ার পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে ৯ই অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাখরাবাদ এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে তাজমিনের আইফোনটি লুকিয়ে রেখে সুমন চট্টগ্রামে চলে যায়। পরদিন ৯ই অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্য ও দেখানো মতে বাখরাবাদ এলাকার পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্ত অব্যাহত স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যার ঘটনায় সিএনজিচালককে গ্রেপ্তার ও মোবাইল ফোন উদ্ধারের তথ্য জানিয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। ৪ তারিখ বাড়ি থেকে বের হওয়ার বিষয়ে তদন্ত চলছে।
পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, ভিকটিমের বাবা পুলিশকে জানিয়েছেন, তার মেয়ে গত ৪ তারিখ বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। তবে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তিনি কোথায় গেছেন, কীভাবে গেছেন কিংবা কারও সঙ্গে গিয়েছিলেন কি না- সে বিষয়ে পুলিশকে আগে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। এ ঘটনায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি এবং কোনো অভিযোগও জানানো হয়নি। ভিকটিমের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পেছনে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তার কোনো ছেলে বন্ধু বা বান্ধবী ছিলেন কি না এবং কারও সহযোগিতা ছিল কি না- এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছ। মামলাটা তদন্তাধীন। আমরা ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছি।
