গাজায় গণহত্যার বিরোধিতা করা ছাড়াও একের পর এক মানবাধিকার রক্ষায় বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিধরের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। তার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় ইসরাইল গণহত্যার জন্য দায়ী বলে ঘোষণা করা জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেয়া সহ দীর্ঘ কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে কাজ করেছেন ৮৫ বছর বয়সী পিল্লাই। তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিচারকও। বিশ্বের সর্বোচ্চ মর্যাদার শান্তি পুরস্কার কেন তাকে দেয়া হয়েছে এবং তার জীবন সম্পর্কে কী জানা যায়, তা তুলে ধরেছেহলেন এই পুরস্কারজয়ী পঞ্চম দক্ষিণ আফ্রিকান। গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে কয়েক দশক ধরে কাজ করার জন্য পিল্লাইয়ের প্রশংসা করেছে নোবেল কমিটি। তাদের ভাষায়, তার এই দীর্ঘ পথচলায় ছিল ‘বিচারিক কঠোরতা, ব্যক্তিগত সততা ও অসাধারণ সাহস’। বর্ণবাদী শাসনামলের দক্ষিণ আফ্রিকায় আন্দোলনকারীদের আইনি সহায়তা দেয়া থেকে শুরু করে অনলাইন আল জাজিরা।
কে এই নাভি পিল্লাই?
নাভানেথেম পিল্লাই। তিনি নাভি পিল্লাই নামে পরিচিত। ১৯৪০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশের বর্ণবৈষম্যে বিভক্ত শহর ডারবানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মা ছিলেন ভারতের তামিল বংশোদ্ভূত। নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ওই প্রদেশের প্রথম নারী হিসেবে নিজস্ব আইন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের বহু কর্মীর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক হন। এরপর রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) সভাপতিত্ব করেন। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করেছিল এই ট্রাইব্যুনাল। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন। গত বছর কমিশনটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, গাজায় গণহত্যার জন্য ইসরাইল দায়ী। বর্তমানে পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একজন বিচারক। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে চলমান মামলার সঙ্গেও তিনি যুক্ত।
কোন কাজের জন্য তিনি বেশি পরিচিত?
নিজ দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার রক্ষায় জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেছেন পিল্লাই। শিক্ষাজীবনে বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বয়কট ও মিছিলে অংশ নিয়েছেন। পরে তিনি দেশটির সুপরিচিত কয়েকজন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীর আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন ফিলিস নাইডু ও স্ট্রিনি মুডলি। ১৯৭৩ সালে পিল্লাই এমন একটি মামলা পরিচালনা করেন, যা রবিন দ্বীপে বন্দি রাজনৈতিক বন্দিদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এর মধ্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারও ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনামলে এই দ্বীপের কারাগারেই বন্দি ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। ২০১৬ সালে ‘ডিপ্লোম্যাটিক কুরিয়ার’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পিল্লাই বলেন, বর্ণবাদী শাসনের অধীনে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তার মানবাধিকারবিষয়ক প্রাথমিক কাজের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। তিনি বলেন, আমি অনেক চ্যালেঞ্জকেই নিজের সুবিধায় কাজে লাগিয়েছি। জাতিগত বৈষম্যের মামলাগুলোতে সুরক্ষা দিতে আমাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন শিখতে হয়েছে। গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালিয়েছে বলে ২০২৫ সালে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন, সেটির নেতৃত্বও দিয়েছেন পিল্লাই। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেয়া এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতি গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য সবকিছু করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ‘সব ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার’ আহ্বান জানান পিল্লাই।
কী কারণে তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে?
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে পিল্লাইকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। কমিটির ভাষায়, তিনি ‘আমাদের সময়ের আন্তর্জাতিক আইনি নীতির অন্যতম প্রধান রক্ষক’। রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার পরিচালনায় পিল্লাইয়ের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে নোবেল কমিটি।
কমিটির মতে, তার অবদান প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছে যে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি গণহত্যার অপরাধও হতে পারে। কমিটি আরও বলেছে, একই মামলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতিতে পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রথমবারের মতো কোনো আসামির বিরুদ্ধে শুধু প্রচার-প্রচারণা ছড়ানোর ভিত্তিতে গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
কেন তার এই পুরস্কার জয় এত তাৎপর্যপূর্ণ?
নোবেল কমিটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন যখন ‘প্রচণ্ড চাপের মুখে’ এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো যখন আক্রমণের শিকার, তখন পিল্লাইকে সম্মানিত করার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক কর্মকর্তারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, এই পুরস্কার এমন একটি স্বীকৃতি ও পুনঃনিশ্চিতকরণ যে মানবাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি- শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধিসহ সবকিছুর জন্যই মৌলিক বিষয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা ও আইনের শাসন যখন গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন এই পুরস্কার বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পিল্লাইয়ের এই অর্জনকে তার ‘সাহস, সততা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি আজীবন অঙ্গীকারের’ প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে অভিহিত করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলো বলেছেন, এই পুরস্কার স্পষ্ট বার্তা দেয় যে শান্তি শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে না; বরং শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলো রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করা সাহসী মানুষের ওপরও নির্ভরশীল।
উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত গবেষণাবিষয়ক অধ্যাপক অশোক সোয়াইন আল জাজিরাকে বলেছেন, পিল্লাইকে নির্বাচন করা ছিল ‘আনন্দদায়ক বিস্ময়’ এবং ‘সম্ভাব্য সেরা পছন্দ’। তার মতে, গণহত্যা ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে পিল্লাইয়ের আজীবন লড়াইয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে নোবেল কমিটি। দক্ষিণ আফ্রিকার এই বিচারককে পুরস্কার দেয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকেও একটি বার্তা দেয়া হয়ে থাকতে পারে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। অন্যদিকে, শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানাররা ‘গণহত্যার’ শিকার হচ্ছেন- এমন ভিত্তিহীন দাবি নিয়ে তার প্রশাসনের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরোধ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অনেক সমালোচক এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার ওপর আঘাত হিসেবে দেখেছেন। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় আইসিসি বলেছিল, এটি ‘একটি নিরপেক্ষ বিচারিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর নির্লজ্জ আক্রমণ’। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ওপরও এটি আঘাত। আদালত জানিয়েছিল, যেকোনো বিধিনিষেধ, চাপ বা হুমকি উপেক্ষা করেই তারা কাজ চালিয়ে যাবে।
