জ্বালানির বাড়তি মূল্যের চাপ চালে

জ্বালানির বাড়তি মূল্যের চাপ চালে

ফন্ট সাইজ:

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বাড়ার অজুহাতে রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে নতুন করে চালের দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় দেশের প্রধান চালের মোকামগুলোতেও দাম বেড়েছে। ফলে বিপদে পড়েছে স্বল্প আয়ের সাধারণ ভোক্তারা।
খুচরা ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে ট্রাক ভাড়া দুই থেকে তিন হাজার টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি ধানের দামও বাড়তি। এ কারণে চালের দর বাড়াতে হচ্ছে।

ভোক্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা সব সময় জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজেন। এখন পরিবহন ভাড়া বাড়ার দোহাই দিয়ে চালের দাম বাড়াচ্ছেন। সরকারের সঠিক নজরদারি না থাকায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন। শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
গত ২০শে সেপ্টেম্বর একলাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ে ২০ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ১১ দিন পর রাজধানীতে নতুন দরে চাল বাজারে এসেছে। কাওরান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবুবাজার ও নিউমার্কেটসহ একাধিক বাজার ঘুরে দেখা যায়, সরু চালের (মিনিকেট ও নাজিরশাইল) দাম মানভেদে প্রতি কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে ৬৮ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; কিছু ব্র্যান্ডের চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৬ থেকে ৮৫ টাকায়। একইসঙ্গে মাঝারি মানের চাল (বিআর-২৮, ব্রি-২৯ ও পাইজাম) কেজিতে ১ থেকে ৩ টাকা বেড়ে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায় পৌঁছেছে। আর মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ দরে বিক্রি হওয়া পোলাও চালের দর কিছুটা কম দেখা গেছে। মানভেদে খোলা প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। এতদিন এ ধরনের চালের কেজি ছিল ২০০ থেকে ২১০ টাকা।

পাইকারি আড়তদার ও মিল মালিকরা জানান, সেপ্টেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুষ্টিয়া থেকে চাল আনতে ট্রাকপ্রতি অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। কুষ্টিয়ার খাজানগর এবং নওগাঁর মোকামে ধানের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ায় চালের মিলগেট মূল্যবৃদ্ধি করতে হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন।
রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ঢাকা মহানগরের দৈনিক বাজার দরের খুচরা মূল্য অনুযায়ী, পাইজাম ও ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ চালের কেজি এখন ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে ৩ টাকা বেড়েছে। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে; কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।

পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) চালের দর ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়লেও অনেক এলাকায় খুচরা ব্যবসায়ীরা ক্রেতা হারানোর ভয়ে আগের মজুত থেকে সামান্য লাভে চাল বিক্রি করছেন। যাত্রাবাড়ীর আড়তদার ও স্থানীয় বিক্রেতারা সতর্ক করে বলেছেন, পুরনো মজুত শেষ হলে খুচরা বাজারে এই দরবৃদ্ধির প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।
কাওরান বাজারের বাহার ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী ফারুক বলেন, দু’দিনে দাম বেড়েছে দুই টাকা। তবে পোলাও চালের দর কমেছে। আরেক বিক্রয়কর্মী মহিউদ্দিন জানান, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট থেকে ৩০ বস্তা চাল এনেছি। গত সপ্তাহের তুলনায় বস্তায় ৫০ টাকা বেশি দিয়ে আনতে হয়েছে। অর্থাৎ কেজিতে পাইকারি পর্যায়ে এক টাকা দর বেড়েছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল অটো রাইস মিলের এক বিক্রয়কর্মী জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার পর থেকে দিনাজপুর থেকে চাল আনতে প্রায় তিন হাজার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আনতে দুই হাজার টাকা করে ট্রাক ভাড়া বেশি দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচও বেড়েছে। সে জন্য কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে এক টাকার মতো বাড়াতে হচ্ছে।

বাজারের এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, পরিবহন ভাড়া সামান্য বাড়লেও ব্যবসায়ীরা সেই অজুহাতে অতিরিক্ত দাম বাড়াচ্ছেন এবং সরকারের যথাযথ নজরদারির অভাবেই এই সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ভোক্তাদের উদ্বেগের বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন করে দাম বাড়ার বিষয়টিতে তদারকি ও বাজার অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।
১০ কেজি বিআর-২৮ চাল কিনেছেন গৃহকর্মী ফাতেমা বেগম। তিনি জানান, দোকানদার ৬৫ টাকা করে দাম চেয়েছে। দরকষাকষি করে তিনি ৬৪ টাকা দরে কিনেছেন। ক্ষুব্ধ এই ক্রেতা বলেন, “ব্যবসায়ীরা এক এক করে সব জিনিসপত্রের দাম বাড়াইতেছে। আমাদের মতো গরিবের সংসারে খরচ বাড়ছে, কিন্তু রোজগার তো বাড়ে না।”

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, সারা দেশের বাজারে প্রতিদিনই তাদের কর্মকর্তারা তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নতুন করে চালের দাম বাড়ার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে অভিযান জোরদার করা হবে।
এদিকে কুষ্টিয়ার এক অটো রাইস মিল মালিক বলেন, ধানের দাম, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়-সবকিছুই বেড়েছে। ধান, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, প্যাকেজিং ও পরিবহনসহ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আগের দরে চাল সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে মিলগেটে দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে।