তেলাপোকা জনতা পার্টির জুলাইয়ে প্রথম দফার যন্তর মন্তর বিক্ষোভ নিয়ে দিল্লি পুলিশকে নাজেহাল হতে হয়েছিল। প্যালেট গান ব্যবহারের মতো ঘটনা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। এবার শনিবারের দ্বিতীয় দফায় তেলাপোকা পার্টির যন্তর মন্তর-২ বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার চেষ্টা হচ্ছে। রাজধানী দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। যন্তর মন্তরে আসার সব পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেলাপোকাদের বিক্ষোভ নিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তটস্থ অবস্থা। দিল্লি পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সরাসরি অধীনে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকিতে ব্যস্ত রয়েছেন। তাই তিনি বিভিন্ন রাজ্য সফরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাতিল করে দিল্লিতেই থেকে গিয়েছেন।
ইতিমধ্যেই কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে ২৩ হাজারের বেশি আধাসামরিক বাহিনীকে দিল্লির নিরাপত্তার জন্য আনা হয়েছে। এই বাহিনীতে রয়েছে, সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ), ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (আইটিবিপি), সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি) এবং সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স (সিআইএসএফ)-এর জওয়ানরা। তথ্য অনুযায়ী, কোনো বিক্ষোভ চলাকালে রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বৃহত্তম ঘটনা। এর আগে জি-২০ সম্মেলনের সময় এত বৃহৎ সংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল নিরাপত্তার স্বার্থে।
সূত্রমতে, আধাসামরিক বাহিনীকে মধ্য দিল্লিতে ভিড় সামলানো, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সহায়তা করার জন্য আনা হয়েছে। পিটিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, মাঠে দিল্লি পুলিশের অন্তত ১৫ হাজার সদস্যকেও মোতায়েন করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি) এই বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে। তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন বামপন্থি ছাত্র সংগঠনও। তবে শনিবার যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’-কে দিল্লি পুলিশ অনুমতি দেয়নি। পুলিশের যুক্তি, সংগঠনটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। দিল্লি পুলিশ প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি না দেয়া সত্ত্বেও, সিজেপি নেতারা জানিয়েছেন, তারা ১০ই অক্টোবরের কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। বলা হয়েছে, গোটা দিল্লি প্রয়োজনে যন্তর মন্তরে পরিণত হবে। অনুমান করা হচ্ছে, এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সারা দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ তরুণ ও সাধারণ মানুষ অংশ নেবেন।
দিল্লিতে সিজেপি’র বিক্ষোভ কর্মসূচির ঠিক আগের দিন, শুক্রবার সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ১০ই অক্টোবর রাজধানীগামী ও সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেন বাতিল করার প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, সরকার যদি যুবসমাজকে ভয় পায়, তবে তাদের উচিত পুরো দেশটাই বন্ধ করে দেয়া।
রেলওয়ে বোর্ড শুক্রবার বেশ কিছু মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন বাতিল করেছে, যেগুলোর ১০ই অক্টোবর ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হযরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল। বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসা তরুণদের আগমন রুখতে দিল্লি পুলিশ ‘দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন’কে ৫৭টি মেট্রোস্টেশন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে পরে সুপ্রিম কোর্ট এক নির্দেশে পরিবহনের উপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নিতে বলেছে।
বিক্ষোভকারীর সংখ্যা নিয়ে দিল্লি পুলিশ তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এতটাই বিচলিত যে, জনস্রোত ঠেকাতে নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। পুলিশ সিজেপি’র আগের বিক্ষোভ থেকে শনাক্ত হওয়া হাজার হাজার ব্যক্তির ওপর নজর রাখছে এবং রাজধানী দিল্লির দিকে আসা বাসগুলোর গতিবিধির ওপরও নজরদারি চালাচ্ছে। এ ছাড়া, শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভে যোগ দেয়া থেকে বিরত রাখতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ‘পেয়িং গেস্ট’ (পিজি) আবাসনের মালিকদের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে।
বিক্ষোভে অংশ না নেয়ার জন্য নাগরিকদের প্রতি পুলিশের আহ্বান জানানোর এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিজেপি’র সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস বৃহস্পতিবার ‘এক্স’-এ একটি পোস্ট করে বলেছেন, ‘কোন অধিকারে পুলিশ বাহিনী নাগরিকদের কোনো বিক্ষোভে যোগ দেয়া বা না দেয়ার বিষয়ে আহ্বান জানায়?’ বিক্ষোভের অধিকারকে সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে দাস বলেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করবেন এবং কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাবে-হয় যেন তাদের জন্য যন্তর মন্তরের ব্যবস্থা করা হয়, নতুবা ‘পুরো দিল্লিকেই যন্তর মন্তরে পরিণত হতে দেখা যাবে’।
দিল্লি আম আদমি পার্টির (আপ) সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ করেছেন, ‘আপ’ এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ‘এএসএপি’-এর সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেপ্তার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, তাদের ফোনগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী যদি সমবেত হন, সরে যেতে অস্বীকার করেন এবং স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার বরণের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে অস্থায়ী আটক কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি নিয়েও পুলিশ আলোচনা করেছে।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, মেট্রোট্রেন চলাচলের ওপর কোনো ‘পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করা যাবে না। আদালত কর্তৃপক্ষকে বলেছে যেন ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ কর্মসূচির আগে মেট্রো ও অন্যান্য রেল পরিষেবা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে চালু রাখার অনুমতি দেয়া হয়। এর বাইরে দিল্লিতে যন্তর মন্তর এলাকায় ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে শুক্রবার রাত ১০টা পর্যন্ত। বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা।
২রা অক্টোবর থেকে দেশ জুড়ে তেলাপোকা পার্টির পাশাপাশি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন (আইসা), বাম দলগুলো এবং বিভিন্ন নাগরিক সমাজ গোষ্ঠী জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কংগ্রেস এবং বিরোধী দলগুলোর সাংসদরা দিল্লিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। এদিকে বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের ১০ জনের এক প্রতিনিধিদল শুক্রবার রাত আটটায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন বলে জানা গেছে। তারা জ্ঞানেশ কুমারের কার্যকলাপ নিয়ে একটি খতিয়ান লিখিতভাবে জমা দেবেন বলে জানা গেছে। প্রতিনিধিদলে রয়েছেন, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী, তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আরজেডি’র তেজস্বী যাদব প্রমুখ।
