স্বস্তি নেই নিত্যপণ্যের বাজারে

স্বস্তি নেই নিত্যপণ্যের বাজারে

ফন্ট সাইজ:

নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই। মাছ, মাংস, ডিম ও সবজির চড়া দামে ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্রেতারা। ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে অন্যান্য মাছের দামেও। এই পরিস্থিতিতেই বেড়েছে চালের দাম। ঢাকার খুচরা বাজারে গত এক থেকে দেড় সপ্তাহে সরু চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে। একই সময়ে মাঝারি মানের চালের দামও কেজিতে ১-৩ টাকা বেড়েছে। বাজারে শীতের সবজি আসা শুরু করলেও এখনো চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির সবজি। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা বিরাজ করছে ডিমের বাজারে। ফার্মের মুরগি চড়া দামে স্থিতিশীল রয়েছে। শুক্রবার ঢাকার একাধিক বাজারে নিত্যপণ্যের বাজারের এই পরিস্থিতি দেখা গেছে।

বাজারে সয়াবিন তেল ও চিনির সরবরাহ সংকটের কারণে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এসব পণ্য। নিত্যপণ্যের বাজারে পিয়াজের দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়ে ভালো মানের পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। ফলে রান্নার অন্যতম প্রয়োজনীয় এ পণ্য কিনতেও ক্রেতাদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। ফার্মের মুরগির ডিমের দামেও স্বস্তি নেই। দীর্ঘদিন ধরেই চড়া দামের বিক্রি হচ্ছে ফার্মের মুরগিসহ সোনালি মুরগি। গত দুই-তিন সপ্তাহের তুলনায় সয়াবিন তেল, চিনি ও ডিমের দামে উল্লেখযোগ্য কোনো স্বস্তি আসেনি। বাজারে কোথাও কোথাও বোতলজাত সয়াবিন তেল ও প্যাকেটজাত চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যেসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর দামও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি। কোথাও প্যাকেট কেটে খোলা চিনি বিক্রি করা হচ্ছে বাড়তি দামে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রজাতির সবজির মধ্যে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা থেকে ১৮০ টাকায় এবং বেগুন প্রতি কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া করলা ও ঢ্যাঁড়শের প্রতি কেজি ৮০ টাকা। তবে সবজির মধ্যে সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে কেবল মুলা, যার প্রতি কেজি ৩০ টাকা। প্রতি কেজি করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, বেগুন (গোল) প্রতি কেজি ১০০ টাকায়, শিম প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, শসা প্রতি কেজি ৮০ টাকা, গাজর প্রতি কেজি ১৪০ টাকা, পটোল প্রতি কেজি ৬০ টাকা এবং কাকরোল প্রতি কেজি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য সবজির মধ্যে ঝিঙা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়, পেঁপে প্রতি কেজি ৩০ টাকা, মুলা প্রতি কেজি ৭০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ প্রতি কেজি ৬০ টাকা, ধন্দুল প্রতি কেজি ৬০ টাকা, বরবটি প্রতি কেজি ৮০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়।

ডিমের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট: দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির ডিমের বাজার। বলা যায় এখন সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস ডিম। ডিমের উৎপাদন বাড়লেও খামারিদের জন্য উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্যের ব্যবধান বড় চ্যালেঞ্জ। পোলট্রি ফিড, বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও সরবরাহ ব্যবস্থার নানা ত্রুটির কারণে খামারি পর্যায়ের বিক্রয়মূল্য এবং খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকছে।

খুচরা বাজারে প্রতি পিস ডিম কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৩ টাকা। অর্থাৎ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ এ ডিম উৎপাদনে খামারির খরচ হয়েছে ১০ টাকা ২৫ পয়সা। ডিমের দাম নিয়ে ক্রেতারা অস্বস্তিতে থাকলেও ডিম উৎপাদনের খরচসহ লভ্যাংশ তোলাই দায় হয়েছে খামারিদের। বৈরী আবহাওয়া, ফিড ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালানোর খরচ এবং বাজারের কারসাজিতে তাদের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না বলে জানান খামারিরা।

সাধারণত কয়েক হাত ঘুরে ডিম যখন শহরের দোকানে পৌঁছায়, তখন দাম বেড়ে যায় কয়েক টাকা। অথচ এ বাড়তি দামের পুরোটা খামারির ঘরে পৌঁছায় না। বরং মাঝে মাঝে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বিক্রি করে লোকসান গুনতে হয় তাদের। উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খামারির বিক্রয়মূল্য বাড়ছে না। আবার খামার থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর পথে মধ্যস্বত্বভোগীদের কয়েকটি স্তরে যোগ হওয়ায় খুচরা বাজারে ডিমের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আর ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে এ বাড়তি দাম।
ফেনীর সোনাগাজীর পোল্ট্রি ফার্মের মালিক আবুল কালাম বলেন, প্রতিটি শেডে ৬০ কেস ডিম হওয়ার কথা, সেখানে ডিম পাচ্ছি ৪৯ কেস। সম্ভবত খাবারের মান ভালো না; বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবও আছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রান্তিক খামারি ডিম ও মুরগি উৎপাদন করেন- কিন্তু দাম নির্ধারণ করতে পারেন না। দাম নির্ধারণ করে কিছু ডিম ব্যবসায়ী সমিতি, যারা মূলত মধ্যস্বত্বভোগী। তাদের সুবিধামতো প্রতিদিন দেশের সব আড়তে মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে যে দাম নির্ধারণ করা হয়, সে দামেই প্রান্তিক খামারিদের ডিম বিক্রি করতে হয়। একই মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রান্তিক পোল্ট্রি শিল্প রক্ষা এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম মল্লিক। তিনি বলেন, প্রান্তিক খামারিদের ডিম বাজারে আসার সময় কম দামে কিনে নেয়া হয়। পরে তেজগাঁও সমিতির মাধ্যমে সেগুলো বেশি দামে বিক্রি করা হয়। আবার বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত মুরগি ও ডিম বাজারে আসার সময়ও নানা কৌশলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয়।