নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট শাখার দুই কর্মকর্তাকে পিটিয়ে ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ে রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। ছিনতাইয়ের পর তিনদিন অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৬ জনকে আটক করেছে। পুলিশ বলছে, ছিনতাইয়ের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ভিকটিমের রোলে থাকা এজেন্ট ব্যাংক শাখার অফিস সহায়ক রাসেল বাবু। আর ক্যাশিয়ার নাজমুল হয়েছিলেন তাদের প্রকৃত ভিকটিম। গত ৬ই অক্টোবর উপজেরার পারইল ব্রিজ এলাকায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার ওই টাকা ছিনতাই হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, রাণীনগর উপজেলার বিশিয়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে স্বপন (২৮) একই গ্রামের ওয়াজেদের ছেলে হাসান আলী (২৫), ইসলামী এজেন্ট ব্যাংকয়ের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারী অলংকার দিঘি গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে সুজন (২৭), সিমলাদার গ্রামের আব্দুল ওহাবের ছেলে আবু তালেব (২২) ও অফিস সহায়ক অলংকার দিঘি গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে রাসেল বাবু (২২) এবং মোটরসাইকেল মালিক রাব্বি আলী।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, ৬ই অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকের দুই কর্মচারী ক্যাশিয়ার এবং অফিস সহায়ক আদিমদিঘী রেল গেট থেকে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে তার মালিক ফিরোজ হোসেনের আবাদপুকুর বাজার শাখার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল যোগে রওনা দেয়। বেলা ১টার দিকে রাণীনগর উপজেলার পারইল বাজার পার হয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে পিছন থেকে একটা মোটরসাইকেল তাদের পথরোধ করে এবং লোহার স্টিক দিয়ে মারধর করে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে ওইদিন রাত ১১টার দিকে জেলা গোয়েন্দা শাখার চৌকস টিম ও রাণীনগর থানা পুলিশ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত ও তথ্য প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রাথমিক ক্লু উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে দুই জন আসামি সনাক্ত করে ঘটনার রাতেই অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত রেজিষ্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেলটি জব্দ এবং মোটরসাইকেলের মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসপি আরও জানান, ৭ই অক্টোবর রাতে জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি স্পেশাল টিম জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর ও দিনাজপুর জেলায় অভিযান চালায়। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাইয়ের ঘটানার সাথে জড়িত স্বপন এবং হাসান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের ১লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের দেয়া তথ্যমতে, ৮ই অক্টোবর রাণীনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে আসামি ইসলামী এজেন্ট ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা ও এক কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আসামি ব্যাংকের অফিস সহায়ক রাসেল, কর্মকর্তা সুজন ও আবু তালেব কয়েক মাস ধরে অনলাইন জুয়া খেলে প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা হেরে যায়। তখন তারা বিভিন্ন গ্রাহকদের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে অনলাইন জুয়া খেলায় ব্যবহার করে এবং হেরে যায়। এরপর তারা তিনজন গ্রেপ্তারকৃত অপর ছিনতাইকারী স্বপন, হাসানসহ কয়েকজন মিলে এজেন্ট ব্যাংকের মালিক মো. ফিরোজ হোসেনের টাকা ডাকাতির পরিকল্পনা করে। তারা দীর্ঘ একমাস ধরে এই পরিকল্পনা করতে থাকে। পরিকল্পনা মোতাবেক ঘটনার দিন অফিস সহায়ক রাসেল বাবু ব্যাংকের ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে টাকা আনতে যায়। টাকা নিয়ে অফিসের দিকে যাওয়ার সময় আসামি রাসেল বাবু, স্বপন এবং হাসানসহ পলাতক আসামিদের তাদের অবস্থান জানাতে থাকে। ঘটনাস্থলে টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে নাজমুল ও আসামি রাসেল পৌঁছালে স্বপন এবং হাসানসহ পলাতক কয়েকজন তাদের আটকিয়ে মারধর করে এবং টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ক্যাশিয়ার নাজমুল ছিল প্রকৃত ভিকটিম, তাকে লোহার পাইপ দিয়ে বেশ মারধর করা হয়। অন্যদিকে টাকা বহনকারী অফিস সহায়ক রাসেল বাবু ছিল সাজানো এবং মিথ্যা ভিকটিম।
পুলিশ সুপার বলেন, ৩৪ লাখ টাকার মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকের তিনজন ১০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য সকল ছিনতাইকারীরা মিলে বাকি টাকা নেয়ার কথা ছিল। এরমধ্যে ছিনতাইকারী স্বপন এবং হাসানকে প্রাথমিকভাবে দেড় লক্ষ টাকা দেয়া হয় এবং তাদেরকে নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়। সেই মোতাবেক ছিনতাইকারী হাসান ও স্বপন জয়পুরহাট হয়ে দিনাজপুর পালিয়ে যায়। সকল আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের জেল হাজতে প্রেরণ করা হবে।
এদিকে, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত আবাদপুকুর ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট শাখার স্বত্বাধিকারী ফিরোজ হোসেন। সংবাদ সম্মেলনে নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জিন্নাহ্ আল মামুন, জেলা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক (ওসি ডিবি) হাসিবুল্লাহ হাসিব, নওগাঁ সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান, রাণীনগর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত (ওসি) জাকারিয়া মণ্ডলসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
