পিতৃপক্ষ শেষে শুরু হলো দেবীপক্ষের। আজ শুভ মহালয়া। ভোরে তর্পণ বিসর্জন, মহালয়ার ঘট স্থাপন, বিশেষ পূজা আর মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খের ধ্বনি ও চণ্ডীপাঠের মধ্যদিয়ে দেবী দুর্গাকে আবাহন জানানো হয়েছে। উমার মৃন্ময়ীতে করা হয়েছে চক্ষুদান। আর এর মধ্যদিয়েই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় আয়োজন ‘শারদীয় দুর্গোৎসব’র ক্ষণ গণনা শুরু হলো আজ। আর দেবীর এই আগমনকে ঘিরে জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরীতে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকেশ্বরী ছাড়াও রাজধানীর গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন, শ্রী রমনা কালী মন্দিরসহ এবার দেশের মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে আহ্বান জানানো হবে দেবীকে।
পুরাণ মতে, এইদিনই দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। মূলত মহালয়ার তিথির সময়কাল হলো অমাবস্যা। এইদিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করার রীতি প্রচলিত আছে। তর্পণ মন্ত্রে বলা হয়ে থাকে- ‘যে বান্ধবা অবান্ধবা বা, যে অন্য জন্মনি বান্ধবাঃ। তে তৃপ্তিং অখিলাং যান্ত, যে চ অস্মৎ তোয়-কাঙ্খিণঃ।’ অর্থাৎ বন্ধু ছিলেন কিংবা বন্ধু নন অথবা জন্ম-জন্মান্তরে বন্ধু ছিলেন তাদের জলের প্রত্যাশা তৃপ্তি লাভ করুক। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘মহালয়’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত উৎস মহৎ এবং আলয়। কিংবা মহত্ত্বের আলয়। এই মহালয় শব্দ থেকেই স্ত্রীবাচক পদ এসেছে ‘মহালয়া’। তবে শ্রী শ্রী চণ্ডীতে মহালয় হচ্ছে পুজো বা উৎসবের আলয়। অর্থাৎ দেবীপক্ষ বা দুর্গাপূজার শুরুর ক্ষণ।
আসছে ১৫ই অক্টোবর ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবী শুক্লা পঞ্চমী বিহিত পূজার মধ্যদিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজার সূচনা হবে। ১৬ই অক্টোবর ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠী বিহিত পূজা। এই ষষ্ঠী তিথিতেই বিল্ব বৃক্ষের পূজা ও অধিবাসের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হবে দেবী দুর্গাকে। ঢাক-ঢোল আর কাঁসার বাদ্যে দেবীর বোধন পূজার মধ্যদিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এরই মধ্যদিয়ে দেবী দুর্গা কৈলাশ ছেড়ে তার সন্তানদের নিয়ে ঘটকে বা ঘোড়ায় চরে আসবেন পিতৃলোকে। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠায় বছর ঘুরে আবারো আসবেন মর্ত্যে। ১৭ই অক্টোবর সকাল ৭টা ৩৯ মিনিট থেকে ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে হবে সপ্তমী তিথিতে দেবীর নবপত্রিকা স্থাপন সপ্তমাদি কল্পারম্ভের মধ্যদিয়ে হবে মহা সপ্তমী বিহিত পূজা। এইদিনই হবে নবপত্রিকা ‘কলা বউ’ স্নান। নবপত্রিকাকে অধিষ্ঠিত করা হবে সিদ্ধিদাতা গণেশের পাশে। সপ্তমাদি কল্পারম্ভ ও মহামপ্তমী বিহিত পূজার মাধ্যমে এইদিনই প্রাণ সঞ্চার করা হবে দেবীর মৃন্ময়ীতে। পরদিন ১৮শে অক্টোবর হবে দেবী দুর্গা শুক্লা মহাসপ্তমী বিহিত অধিক পূজা। আগামী ১৯শে অক্টোবর সকাল ৭টা ৫৫ মিনিট থেকে ৫টা ৪৩ মিনিটের মধ্যে মহাঅষ্টমী তিথিতে সনাতনী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সকলে মিলে দেবীকে পুষ্পাঞ্জলি দেবে।
এইদিনই হবে সন্ধীপূজা। মাতৃরূপে কুমারী কন্যাকে জীবন্ত প্রতিমা কল্পনা করে জগজ্জননীর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করে হবে ‘কুমারী পূজা’। হিন্দু শাস্ত্রমতে, এদিন পূজিত কুমারী কন্যার নামকরণ করা হয় ‘উমা’। ২০শে অক্টোবর নবমীতে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হবে। সর্বশেষ ২১শে অক্টোবর দশমী তিথিতে দর্পণ বিসর্জনের মধ্যদিয়ে বিদায় জানানো হবে দেবী দুর্গাকে। এবার নৌকায় চড়ে কৌলাশে ফিরবেন মা দুর্গা। শাস্ত্রমতে, মা দুর্গার ঘোড়ায় আগমন হলে ছত্রভঙ্গ বা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার ইঙ্গিত বোঝায়। আর নৌকায় গমন হলে শস্য বৃদ্ধি, ভালো ফলন এবং অনেক সময় অতিবৃষ্টি বা বন্যার আশঙ্কার কথা বলা হয়।
এবারের শারদীয়া দুর্গাপূজা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এবার সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে পূজা উদ্যাপন করা হবে। এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা গতবারের চেয়ে প্রায় দেড় হাজার বেশি। তিনি বলেন, জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ওপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুষ্ঠুভাবে পূজা উদ্যাপনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। পুরো উৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে এবং কোনো হুমকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইসঙ্গে দুর্গাপূজার সময় নজরদারি জোরদার করতে সরকারি সংস্থা এমন একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করবে, যা এর আগে নির্বাচনের সময় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) ব্যবহার করেছিল।
এই অ্যাপ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তথ্য দ্রুত জানিয়ে দিতে সহায়তা করবে এবং শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে। এই পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এবং একইসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভাগীয় ও জেলা পুলিশ পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং সেল চালু থাকবে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
