গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ সেবা গ্রহীতারা অসহায় হয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত হচ্ছে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের শিকার। ঘুষ ছাড়া মিলছে না সেবা। এমনটাই অভিযোগ উঠেছে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের তৈরি করা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে একাধিক ভুক্তভোগী গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করেছেন। ভুক্তভোগীদের লিখিত ও মৌখিক অভিযোগের সূত্র ধরে সরজমিন অনুসন্ধান করে মানবজমিন। বেরিয়ে আসে গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ঘুষ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনুসন্ধানে জানা যায়, খোদ সহকারী পরিচালক (এডি) নাহিদ নেওয়াজের গোপন নির্দেশেই চলছে এই চক্রটি। এই সিন্ডিকেটের প্রধান সেনাপতি হিসেবে কাজ করেন উচ্চমান সহকারী অমিত কুমার পাল। তিনি মূলত অফিসের ২য় তলার ২০৬ নম্বর রুমে বসেই নিয়ন্ত্রণ করেন সবকিছু। তার সহকারী হিসেবে নিচতলার ১০১ নম্বর রুমে দায়িত্ব পালন করেন সহকারী হিসাবরক্ষক বাপ্পু মিত্র।
এডি নাহিদ নেওয়াজ, উচ্চমান সহকারী অমিত কুমার পাল ও সহকারী হিসাবরক্ষক বাপ্পু মিত্র এই তিনজনেই মূলত সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। পাশাপাশি তারা তৈরি করেছেন কিছু ভলেন্টিয়ার/হেল্পিং হ্যান্ড। ভলেন্টিয়ার হিসেবে কাজ করে পাসপোর্ট অফিসের সিকিউরিটির দায়িত্বে নিয়োজিত বেশকিছু আনসার ও পুলিশ সদস্য। এ ছাড়াও প্রভাবশালী ওই সিন্ডিকেটের রয়েছে অফিসের ভেতরে এবং বাইরে প্রায় ৫০ এর অধিক নিয়োগপ্রাপ্ত দালাল। মূলত আনসার ও পুলিশ সদস্য ও নিয়োগপ্রাপ্ত দালালদের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হয়। জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়া ভুক্তভোগী নারী করুনা রানী বিশ্বাস মানবজমিনকে জানান, আমার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মেয়ে সিমলা রানী বিশ্বাস-২৩ এর পাসপোর্ট করতে গিয়ে আমি দিনের পর দিন ঘুরতে ঘুরতে নাজেহাল হয়েছি।
পাশাপাশি কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার ও হুমকি-ধমকিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। সরকারি নিয়মে পাসপোর্টের আবেদনপত্র জমা করতে না পেরে ঘুষ দিয়ে জমা করেছি। ঘুষ ছাড়া গোপালগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে কোনো কাজই হচ্ছে না। আমি এ সকল অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ঘুষ বাণিজ্যের বিচারের দাবিতে ডিসি স্যারের কাছে অভিযোগ করেছি। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী পাসপোর্ট করতে আগ্রহী মানুষেরা প্রথমে যেকোনো কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করার পর মূল কপি জমা করতে সরাসরি পাসপোর্ট অফিসে আসতে হয়। নিচ তলার ১০১ নম্বর রুমে পাসপোর্টের আবেদনের মূল কপি জমা নেয়ার বুথ হিসেবে ব্যবহার করে কর্তৃপক্ষ। অফিসের একটি গোপন সূত্র মানবজমিনকে জানিয়েছে ১০১ নম্বর রুমে ভুল ধরার নামে ফাঁদ পেতে বসে থাকেন সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী সদস্য বাপ্পু মিত্র। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উৎকোচ আদায়ের উদ্দেশ্যে অধিকাংশ পাসপোর্ট আবেদনের কাগজপত্রে ভুল ধরে রিফিউজ করেন। শুরু হয় নানা নাটকীয়তা। হতাশায় ভুগতে শুরু করেন সেবাগ্রহীতারা।
এই সুযোগ কাজে লাগায় পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য দালাল চক্রের সদস্যরা। তারা সেবা গ্রহীতাদের সহজে পাসপোর্ট করে দেয়ার অফার দেয়। ত্রুটিভেদে দাবি করে দেড় হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। মানুষ নিরুপায় হয়ে সরকারি ফি’র থেকেও দুই-তিন গুণ বেশি টাকা ঘুষ দিয়ে পাসপোর্ট গ্রহণ করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের বাইরের এক দালাল সদস্য বলেন, আমরা বেকার তাই পেটের তাগিদে দালালি করি। একটা পাসপোর্ট করতে যে টাকা চুক্তি করি তার সিংহভাগ দিতে হয় অফিসের স্যারদের। আমরা নামমাত্র ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পাই। কাগজপত্রের ত্রুটিভেদে স্যারদের সঙ্গে কথা বলে পার্টির কাছ থেকে টাকা নেই। ফাইল জমা করার পরপরই টাকা পৌঁছে দিতে হয়, একটু এদিক সেদিক হলে অফিসে ঢোকা বন্ধ করে দেয়। তাই আমরা যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত কেউই বেইমানি করি না।
এ সকল অভিযোগ সহকারী পরিচালক নাহিদ নেওয়াজ, উচ্চমান সহকারী অমিত কুমার পাল ও সহকারী হিসাবরক্ষক বাপ্পু মিত্র অস্বীকার করেন। সহকারী পরিচালক নাহিদ নেওয়াজ বলেন, আমার অজান্তে ছোট খাটো ভুল ত্রুটি ও টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম আমার অফিসে হচ্ছে না। জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান বলেন, পাসপোর্ট অফিসের বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্তে সত্যতা মিললে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করা হবে।
