একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা তার নিজস্ব সক্ষমতা। সেই সক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি পেশাদার ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী, যার সঙ্গে যুক্ত জনগণের আস্থা, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ভাবনার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগের যোগসূত্র এখানেই। দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আত্মনির্ভর শক্তিতে রূপান্তরের এই পরিকল্পনা মূলত দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়াস।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান চলতি বছরের ১২ এপ্রিল ঢাকা সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ দরবারে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে দল-মতের ঊর্ধ্বে একটি পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি আধুনিক, সুদৃঢ় ও সময়োপযোগী সশস্ত্র বাহিনী নির্মাণে সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতার অঙ্গীকারও জানান। এর ঠিক তিন দিনের মাথায় জাতীয় সংসদে ‘ফোর ডাইমেনশনাল’ বা চতুর্মাত্রিক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনার ঘোষণা আসে তাঁর কণ্ঠে। সেনানিবাসের সেই উচ্চারণ থেকে সংসদের ঘোষণায় প্রতিরক্ষা ভাবনার একটি সুস্পষ্ট রেখাচিত্র ফুটে ওঠে—প্রচলিত সক্ষমতার সীমানা পেরিয়ে প্রযুক্তি, আধুনিকতা ও সমন্বিত শক্তির ভিত্তিতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি।
প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনাটির তাৎপর্য বুঝতে হলে পরিবর্তিত বিশ্বে যুদ্ধ ও নিরাপত্তার বাস্তবতার দিকেও তাকাতে হয়। সময়ের সঙ্গে যুদ্ধের ধরন পাল্টেছে। বিস্তৃত হয়েছে নিরাপত্তার পরিসরও। স্থল, নৌ ও আকাশ—প্রচলিত এই তিন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবারস্পেস, ড্রোন, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফলে আধুনিক প্রতিরক্ষা আর কেবল অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের শক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। তথ্য, প্রযুক্তি, নজরদারি, যোগাযোগ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও এখন একটি দেশের প্রতিরোধক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বদলে যাওয়া নিরাপত্তা বাস্তবতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রচলিত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, সাইবার ও ইলেকট্রনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মূলত প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ হিসেবেই এগিয়ে নিতে চায় সরকার। এর সঙ্গে জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাকেও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পরিকল্পনাটি শুধু সামরিক সরঞ্জাম সংযোজন বা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর কর্মসূচি হয়ে থাকছে না। সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে আগাম প্রস্তুতি নিতে সক্ষম একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার বৃহত্তর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের নিজস্ব সক্ষমতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর চিন্তাভাবনাও এর সঙ্গে যুক্ত। আত্মনির্ভরতা, প্রযুক্তি ও সমন্বিত প্রস্তুতির এই পথই শেষ পর্যন্ত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ভাবনাকে প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে যুক্ত করে—যেখানে দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল শক্তি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নিজের সক্ষমতা।
সরকারের এই উদ্যোগের রাজনৈতিক ভিত্তিও রয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে। নির্বাচনী ইশতেহারে সশস্ত্র বাহিনীকে ‘মডার্ন, কুইক, সেলফ কনটেইন্ড, রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতাসম্পন্ন’ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ইশতেহারে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার আধুনিকায়নের পাশাপাশি পেশাদারিত্ব, আত্মনির্ভরতা, আন্তঃবাহিনী সমন্বয় এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের পরিকল্পনাগুলোকে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নধর্মী ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। এখানে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের পরিধি অস্ত্র সংগ্রহের চেয়েও বিস্তৃত। সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে প্রযুক্তি, গবেষণা, উৎপাদন, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাকে একসূত্রে গাঁথার প্রয়াস রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা চিন্তার ঐতিহাসিক পরম্পরায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর সশস্ত্র বাহিনীর পুনর্গঠন, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় প্রতিরক্ষায় জনগণের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার যে দর্শন তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ ‘টোটাল পিপলস ওয়ার’। এই ধারণার মূল কথা—দেশের প্রতিরক্ষা কেবল সশস্ত্র বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়। জনগণের মনোবল, জাতীয় ঐক্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এবং সামগ্রিক সামাজিক প্রস্তুতিও একটি দেশের প্রতিরোধ শক্তির অংশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতাতেও এর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। জনগণের সম্মিলিত শক্তি ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। বর্তমান সময়ে সেই ধারণাকে প্রযুক্তি ও আধুনিক সামরিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্যেই এর নতুন তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়।
একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধ আর শুধু স্থল, সমুদ্র ও আকাশে সীমাবদ্ধ নেই। সাইবারস্পেস, তথ্য, ইলেকট্রনিক স্পেকট্রাম, ড্রোন, স্যাটেলাইট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্রমেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে। এখানে ‘ফোর ডাইমেনশনাল’ সশস্ত্র বাহিনীর ধারণা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রচলিত তিন বাহিনীর শক্তির সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি আরও বিস্তৃত হতে পারে। ড্রোন প্রযুক্তি, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, সাইবার প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, স্যাটেলাইটনির্ভর নজরদারি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার তাই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নয়; শান্তিকালীন নজরদারি, সীমান্ত ও আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই বৃহত্তর দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনায়। গত ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে তিন বছর এবং পরবর্তী সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর আওতায় নতুন ট্যাংক ও সাঁজোয়া যুদ্ধযান যুক্ত করে স্থলযুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে আধুনিক আর্টিলারি রকেট ব্যবস্থা, ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজনের মাধ্যমে দূরপাল্লায় নির্ভুল আঘাত এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা হবে।
একই সঙ্গে আত্মনির্ভরতা অর্জনও এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। ফিউজ ও প্রাইমার, আধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেটসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামের দেশীয় উৎপাদন অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারপ্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে বৈদেশিক নির্ভরতা কমবে এবং দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ঘটবে। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী ১০ বছরে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ নৌবাহিনী। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ও সাবমেরিন সংযোজনের পরিকল্পনা দেশের সমুদ্রসীমা, সামুদ্রিক সম্পদ এবং নৌযোগাযোগপথের নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার সঙ্গে সম্পর্কিত। বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব যত বাড়ছে, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার প্রশ্নও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ব্লু ইকোনমি, সমুদ্রসম্পদ, বাণিজ্যিক নৌপথ ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রক্ষায় একটি সক্ষম নৌবাহিনী বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পদ। মনুষ্যবিহীন নৌ প্ল্যাটফর্ম, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এবং আধুনিক নৌঘাঁটি এই সক্ষমতাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নেও ভবিষ্যৎ যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট, ফাইটার, অ্যাটাক হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার সংযোজনের পরিকল্পনার মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইউএভি, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে বৃহত্তর বগুড়ায় একটি ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্যাসিভ ডিটেকশন সিস্টেম, লং-রেঞ্জ রাডার ও এয়ার ট্রাফিক সার্ভেইলেন্স রাডার যুক্ত হলে আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য হুমকি শনাক্তের সক্ষমতা আরও বাড়বে। মিডিয়াম-রেঞ্জ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যবস্থা আকাশ প্রতিরক্ষাকে আরও শক্তিশালী করবে। সব মিলিয়ে লক্ষ্য—প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত সক্ষমতার মাধ্যমে দেশের আকাশসীমা ও জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা আরও জোরদার করা।
আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য শুধুমাত্র পৃথক বাহিনীর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বিত শক্তিই সেখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ। তথ্য ও যোগাযোগের সমন্বয়, উন্নত প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির যৌথ প্রয়োগ একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, দ্রুততর ও শক্তিশালী করে। সেই সমন্বিত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকটিও বর্তমান প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের নেতৃত্বে তিন বাহিনী দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার এই ঐতিহ্যই ভবিষ্যতের আধুনিক ও সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার শক্ত ভিত্তি। দেশের বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটে সশস্ত্র বাহিনীর মানবিক ভূমিকা জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে করেছে আরও গভীর। নতুন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার বাস্তবায়নে তিন বাহিনীর সমন্বিত সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে তাদের এই দৃঢ় সম্পর্ক বাংলাদেশকে আরও প্রস্তুত, আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম করে তুলবে।
‘টোটাল পিপলস ওয়ার’ ধারণার আধুনিক তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্কের জায়গায়। একটি দেশের প্রতিরক্ষা কেবল অস্ত্র, প্রযুক্তি ও সামরিক অবকাঠামোর সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জনগণের মনোবল, সামাজিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা। প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনায় জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে আস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ভাবনা তাই বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ একটি দেশের প্রতিরোধ সক্ষমতা তখনই গভীর ও টেকসই হয়, যখন সামরিক শক্তির পাশাপাশি জনগণের আস্থাও সমানভাবে দৃঢ় থাকে।
সম্প্রতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রা যোগ করেছে। কমিটির সভাপতি মো. আশরাফ উদ্দিন এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন ২৫টি দপ্তর ও সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে পরিচিতি এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রাথমিক পর্যালোচনা হয়। বৈঠকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন কার্যক্রম সম্পর্কেও উপস্থাপনা দেওয়া হয়। কমিটির পক্ষ থেকে পুরোনো যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে সশস্ত্র বাহিনীকে সজ্জিত করার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে আধুনিক ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে সশস্ত্র বাহিনীর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতির মৌলিক লক্ষ্য যুদ্ধ নয়; সার্বভৌমত্ব ও শান্তি সুরক্ষিত রাখা। একটি রাষ্ট্রের প্রতিরোধ সক্ষমতা যত বিশ্বাসযোগ্য হয়, বহিরাগত চাপের মধ্যেও নিজের জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের জায়গা তত সুদৃঢ় থাকে। এই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত পরিকল্পনার মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এর দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোয়। তিন বাহিনীর আধুনিকায়ন, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তঃবাহিনী সমন্বয় এবং জনগণের সম্পৃক্ততা—সবগুলোকে একটি বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা এখানে দৃশ্যমান। শহীদ জিয়ার জনগণভিত্তিক প্রতিরক্ষা ভাবনা, বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান পরিকল্পনাকে একই ধারাবাহিকতায় দেখলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা দর্শনের একটি পরিবর্তনশীল চিত্র খোলাসা হয়—প্রচলিত সক্ষমতা থেকে প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতায়, নির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরতার দিকে এবং বিচ্ছিন্ন বাহিনীভিত্তিক প্রস্তুতি থেকে সমন্বিত জাতীয় প্রতিরক্ষার দিকে।
আক্ষরিক অর্থেই একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর প্রকৃত শক্তি শুধু তার অস্ত্রভাণ্ডারে নয়; তার পেশাদারিত্বে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতায়, শৃঙ্খলায়, জনগণের আস্থায় এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারে। সেই জায়গায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ভাবনাটি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হলে তার কেন্দ্রে থাকে একটি মৌলিক রাষ্ট্রীয় প্রত্যয়—দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশই হবে অগ্রাধিকার। আমরা বলতে পারি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই ভাবনাকে সামনে রেখে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের যে দীর্ঘ পথচলা শুরু হয়েছে, তার সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে এমন একটি সশস্ত্র বাহিনী, যে বাহিনী আধুনিকতায় সময়ের সঙ্গে এগিয়ে থাকবে, প্রযুক্তিতে সক্ষম হবে, আত্মনির্ভরতায় শক্ত ভিত গড়বে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের শান্তি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় থাকবে নির্ভরযোগ্য প্রহরী।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।
[email protected]
