হত্যাকাণ্ড ধামাচাপায় লোক দেখানো তদন্ত হতো/জিয়াউলের নিরাপত্তা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে উদ্বেগ

ফন্ট সাইজ:

কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জনসম্মুখে এলে সেটিকে বৈধতা দিতে লোক দেখানো প্রশাসনিক তদন্ত সাজানো হতো বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনালে এ সাক্ষ্য দেন তিনি। শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় প্রসিকিউশনের শেষ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি শেষ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরপরই তাকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তবে এদিন আসামিপক্ষের জেরা শেষ না হওয়ায় আগামী ১৩ই অক্টোবর পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার এস এম মইনুল করিম মানবজমিনকে বলেন, কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জিয়াউলের আইনজীবী। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা বলেছি তাকে জেলখানায় রেখে ভার্চ্যুয়ালি শুনানির প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু আসামিপক্ষ এতেও রাজি নন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষ হলেও আদালত পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখনই জনসম্মুখে আসতো, তখন ওই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্য লোক দেখানো প্রশাসনিক নির্বাহী তদন্ত করা হতো। প্রকৃত অপরাধীরা যেন আড়ালেই থেকে যায়, সেজন্য নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক তদন্ত ব্যবহার করা হতো।

তিনি জানান, নিয়ন্ত্রিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের উদ্দেশ্যে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ গোপন করা হতো এবং এজন্য কর্মকর্তাদের মিথ্যা ও ভুল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং পুলিশ প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বাধ্য করা হতো। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করা। জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্তকালে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে আদালতকে জানান এই কর্মকর্তা। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সাক্ষ্যে তিনি তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে কোথায় কোথায় গেছেন, কী কী তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলো মামলার অভিযোগের সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত— তার বিস্তারিত ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন। বর্তমানে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ শেষের দিকে। এ ছাড়া, তার বিরুদ্ধে গুম, খুন ও নির্যাতনের অভিযোগে আরও একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

একা প্রিজন ভ্যানে আনা নিয়ে শুনানি ও বিতর্ক: এদিকে, জীবননাশের আশঙ্কা প্রকাশ করে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে আলাদা গাড়ির পরিবর্তে অন্যান্য বন্দিদের সঙ্গে একই প্রিজন ভ্যানে আনার আবেদন জানিয়েছেন জিয়াউল আহসান। ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার পক্ষে লিখিত আবেদন জমা দেন আইনজীবী ও বোন নাজনীন নাহার। শুনানিতে এডভোকেট নাজনীন নাহার বলেন, প্রিজন ভ্যানে জিয়াউলকে একা আনা-নেয়া করা বিপজ্জনক, উদ্বেগজনক বিষয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ততটা ভালো নয়। যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এককভাবে না এনে, জিয়াউল আহসানকে যেন অন্য আসামিদের সঙ্গে আনা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ এই আবেদনের বিরোধিতা করে। প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম জিয়াউল আহসানকে জেলখানায় রেখে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত করে বিচারকাজ পরিচালনার আবেদন জানান। তিনি আদালতকে বলেন, কারাগার থেকে ভিডিও’র মাধ্যমে শুনানিতে অংশ নেয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। অন্য কোনো আসামি জীবননাশের আশঙ্কার কথা বলছেন না; জিয়াউল যেহেতু নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা বলছেন, তাই সেই উদ্বেগকে আমলে নিয়ে তাকে সরাসরি আদালতে না এনে ভার্চ্যুয়ালি শুনানি করা যেতে পারে। রাষ্ট্রপক্ষের এ বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে নাজনীন নাহার প্রশ্ন তোলেন, একা আনা হচ্ছে বলেই তারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অন্য কোনো আসামিকে একা আনা হয় না, তাহলে শুধু জিয়াউল আহসানকে একা আনার পেছনে উদ্দেশ্য কী এবং অন্য সবার সঙ্গে আনলে সমস্যা কোথায়। একপর্যায়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে কাঠগড়া থেকে জিয়াউল আহসান বলেন, তাকে একা একটি গাড়িতে আনার উদ্দেশ্য হলো নিজেরা কোনো ঘটনা ঘটিয়ে তার ওপর দায় চাপানো। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল-১ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আদেশ না দিয়ে বিষয়টি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।