ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া এসআইআর নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের জেরে ভারত জুড়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ প্রতিদিনই তীব্র হয়ে উঠছে। দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোট তৃতীয় দিন টানা প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে গেছে। রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন ইন্ডিয়া জোটের নেতারা। বিহারের পাটনায় আরজেডি নেতা তেজস্বীদের লোকভবন অভিযান কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কর্ণাটকের রাজধানী বাঙ্গালুরুতে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র ডাকা ফ্রিডম পার্কের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষ যোগ দিয়েছেন।
যুব ও তরুণদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই প্রতিবাদ সমাবেশে শামিল হয়েছেন। গোটা এলাকা ভোট চোর, গোদি ছোড় স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে।
সিজেপি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, পথে নামুন, গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করুন। দীপককে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একটি ‘নতুন’ স্লোগান দিতে দেখা গেছে—’এক... দুই... তিন... চার... নরেন্দ্র মোদি ভোট চোর’। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে বলে সিজেপি নেতারা ঘোষণা করেছেন।
নরেন্দ্র মোদিকে গণতন্ত্র হত্যাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি ও অভিনেতা প্রকাশ রাজের সঙ্গে সিজেপি নেতারাও সমাবেশে রয়েছেন। এসআইআর প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে বাদ পড়া সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিও বয়ান সেখানে দেখানো হয়েছে। এই কর্মসূচির অংশ হিসাবে একটি ‘পিপলস ট্রাইব্যুনাল’ বা গণ-আদালত আয়োজন করা হয়েছে। এই গণ-আদালতে কর্ণাটকের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরেছেন। এরপর একটি ‘চপ্পল প্রতিবাদ’ কর্মসূচিও পালিত হয়েছে।
ফ্রিডম পার্কের সমাবেশে দাঁড়িয়ে অভিনেতা ও সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ প্রকাশ রাজ বৃহস্পতিবার ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, এটি কেবল ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়ার বিষয় নয়, বরং নাগরিকদের মর্যাদা ও অধিকারের ওপর এক ধরনের আঘাত।
অভিনেতা ও সমাজকর্মী প্রকাশ রাজ জানানোর পরই রাঠি তার অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ছাড়া জেএনইউ-এর ছাত্রনেত্রী ঐশী ঘোষ, আইসার সভানেত্রী নেহা বোরা, সিজেপি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং অন্যান্য যুব ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন।
সিজেপি এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো দাবি জানিয়েছে যে, এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় ভোটার তালিকা থেকে যেসব নাম বাদ দেয়া হয়েছে তা বাতিল করা হোক এবং এসআইআর পূর্ববর্তী ভোটার তালিকা বহাল রাখা হোক। পাশাপাশি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তারা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগও দাবি করেছে।
এদিকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বুধবারের পর বৃহস্পতিবার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকে আরও তীব্র করার ঘোষণা দিয়ে পথে নেমেছে বিরোধী ইন্ডিয়া জোট। বুধবার যা ঘটেছে এবং পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলের সাংসদরা বৃহস্পতিবাার দুপুর নাগাদ দিল্লির একটি ক্যাফেতে বৈঠকে বসে তাদের আন্দোলনের কৌশল ঠিক করেছেন। বৈঠকের পর তারা বাসে রাজঘাটে গান্ধী স্মৃতিসৌধের দিকে যাত্রা করে সেখানে পৌঁছে অবস্থান শুরু করেছেন। মল্লিকার্জুন খাড়গে রাজঘাট অভিমুখে রওনা হওয়ার আগে জানিয়েছেন, ইন্ডিয়া জোটের সদস্যরা রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধী স্মৃতিসৌধে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। সেখানে তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের শুভবুদ্ধি উদয়ের জন্য প্রার্থনা করবেন, যাতে তারা উপলব্ধি করতে পারেন যে তাদের কার্যকলাপ দেশের স্বার্থের পরিপন্থি।
খাড়গে জানান, বিরোধী জোট ‘ভোট চুরি’, ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি এবং যুবসমাজের বিভিন্ন সমস্যার মতো বিষয়গুলো তুলে ধরবে। তিনি জনস্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের জন্য বিজেপি সরকারের সমালোচনা করেন এবং বলেন যে, অধিকার ও স্বাধীনতার সংকোচন নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, বিরোধী দলগুলো তা সবার সামনে তুলে ধরতে চায়।
বুধবারের বিক্ষোভ আন্দোলনের জেরে ফের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বিরুদ্ধে নতুন করে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দিল্লিতে দলের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ কর্মীদের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা দেয়া এবং ধাক্কাধাক্কি ও দুর্ব্যবহার করার অভিযোগে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বিরুদ্ধে আরও একটি এফআইআর দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ। বিক্ষোভে অংশ নেয়া আরও কয়েকজন কংগ্রেস নেতা ও কর্মীর বিরুদ্ধেও এই মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালীন বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে এই এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভের সময় কয়েকজন সাংসদ ও নেতাসহ মোট ৯১ জনকে আটক করা হয়েছিল। বুধবার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলেন। এরপর পুলিশ তাকে ও আরও কয়েকজন সাংসদকে আটক করেছিল।
সিপিআই সাংসদ পি. সন্তোষ কুমার জানিয়েছেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দলগুলো তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি আরও জোরদার করবে এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেছেন, প্রতিবাদ কর্মসূচিতে জোটের আনুষ্ঠানিক অংশীদার না হওয়া সত্ত্বেও বিজু জনতা দল (বিজেডি)সহ সমস্ত বিরোধী দলই শামিল হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, বেশ কিছু যুব ও ছাত্র সংগঠনও এই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন।
কুমার বলেছেন, এই প্রতিবাদ এখন ‘জাতির প্রয়োজনে’ পরিণত হয়েছে এবং এটি চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ।
জ্ঞানেশ কুমারের বেআইনি কার্যকলাপ’-এর খতিয়ান পেশের উদ্দেশ্যে ভারতের প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের যে আর্জি জানিয়েছিলেন বিরোধীরা তার অনুমতি পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। শুক্রবার প্রেসিডেন্ট দেখা করতে রাজি হয়েছেন। সূত্রের খবর, ১৫ জন নেতার একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাতের আবেদন জানালেও প্রেসিডেন্ট মুর্মুর সঙ্গে দেখা করার জন্য ১০ জন সদস্যকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। এই প্রতিনিধিদলে রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব, আরজেডির তেজস্বি যাদব ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থাকার কথা রয়েছে।
