রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রশিক্ষিত জনবল ধরে রাখা নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) অন্তত ১৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি ছেড়েছেন। তাদের অধিকাংশই রাশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে প্রায় ৫৫ জন এবং ২০২৬ সালে আগস্ট পর্যন্ত আরও প্রায় ২০ জন চাকরি ছেড়েছেন। তাদের কেউ বিদেশে, কেউ দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।
চাকরি ছাড়াদের মধ্যে বিভিন্ন শাখার প্রধান ও উপ-প্রধান পর্যায়ের কর্মকর্তাও ছিলেন বলে জানা গেছে। রূপপুর কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ২০১৫ সালে এনপিসিবিএল প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬৯৩ জনকে কেন্দ্র পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৯৭ জন রাশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
রাশিয়ায় এসব প্রশিক্ষণে রাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা প্রায় ১৫২ কোটি মার্কিন ডলার নয়, বরং ১৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, একজন কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ার পরই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার উপযোগী হয়ে ওঠেননি। দীর্ঘ তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণের মধ্যদিয়ে তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা চলে গেলে তার বিকল্প তৈরি করতেও ফের সময় ও অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে পাঠানোর আগে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে ১০ বছর চাকরি করার নিশ্চয়তাপত্র নেয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর দায়িত্ব পালনের পরও অনেকে চাকরি ছেড়েছেন। কেউ বেসরকারি খাতে, আবার কেউ তুলনামূলক কম বেতনেও অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। চাকরি ছেড়ে যাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু বেতন নয়— দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবন পরিকল্পনা, পদোন্নতির সুযোগ, প্রশাসনিক কাঠামো ও কর্মপরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। ২০১৯ সালে যোগ দেয়া অনেক কর্মকর্তা প্রত্যাশিত গ্রেডে উন্নীত হতে পারেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতার কিছু কর্মকর্তা বাইরে থেকে নিয়োগ পেয়ে উচ্চতর পদে দায়িত্ব পেয়েছেন— এমন দাবিও করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে পর্যাপ্ত বসার জায়গা, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, নামাজের স্থান ও ক্যান্টিনসহ বিভিন্ন মৌলিক সুবিধার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৫০ কোটি টাকার ভবিষ্যৎ তহবিল পড়ে থাকা এবং কর্মীদের নিজ নিজ হিসাব সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত না করার অভিযোগও করা হয়েছে। শীর্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত যথাযথভাবে কাজে না লাগানোর দাবি রয়েছে সংশ্লিষ্ট নথিতে। পারমাণবিক স্থাপনায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর এক কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া এবং পরে প্রকল্প এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে সংশ্লিষ্ট নথিতে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি নথিতে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর পাঁচ শতাধিক কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একদিনেই ১৮৬ কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একই নথিতে ২০২৫ সালের মার্চে ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। পরে তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও নথিতে দাবি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে রূপপুরের কর্মপরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের ঘটনায় উত্তেজনা তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ঈশ্বরদীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অপসারণের দাবিতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি স্বাক্ষরসংবলিত আবেদন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে দেয়া হয়েছিল বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো জটিল স্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাদের ধরে রাখতে বেতন-ভাতার পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বচ্ছ পদোন্নতি নীতি, সুস্পষ্ট চাকরি বিধি, দায়িত্বের ধারাবাহিকতা, পেশাগত স্বাধীনতা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে এনপিসিবিএলের কোম্পানি সচিব আব্দুর রশিদ মানবজমিনকে বলেন, ‘যারা চাকরি ছেড়েছেন, তাদের কাছে বিষয়টি শুনুন কেন চাকরি ছেড়েছেন। আপনি কোম্পানিতে আসেন, মানবসম্পদ বিভাগে কথা বলেন। আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না।’
