ফরিদপুরের সদরপুরে স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালীদের স্নায়ুদ্বন্দ্বে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। বছরের শেষ সময়ে এসে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে টিসি (ছাড়পত্র) নিয়ে ইতিমধ্যেই ৪০ জন শিক্ষার্থী স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আরও বেশ কিছু শিক্ষার্থী ছাড়পত্র নেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ভাষাণচর ইউনিয়নের ৮২ নম্বর চরচাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাড়পত্র নেয়া শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাচমেন্ট এলাকার বাইরে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ৪১ নম্বর চরচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ভর্তি হয়েছেন।
সরজমিন ৮২ নম্বর চরচাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মোট ১০৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত রয়েছে মাত্র ২৫ জন। বিদ্যালয়ের মাঠে বর্তমানে ৫ তলা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণের পাইলিংয়ের কাজ চলছে। মূলত এই নির্মাণকাজের তড়িঘড়ি উদ্বোধনের পরই স্কুল পরিচালনা কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নেয় এবং এর প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর। অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ, স্কুলে মানসম্মত পাঠদানের ঘাটতি এবং কমিটির দ্বন্দ্বের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, নতুন ভবনের একটি অনুষ্ঠানের দাওয়াত পাননি স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী— এই ক্ষোভ থেকে তারা অভিভাবকদের চাপ দিয়ে সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলন ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ: গত ৫ই অক্টোবর রাতে চরচাঁদপুর বাজারে টিসি নেয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন বিদ্যালয় কমিটির সদস্য ও কোলচুরী গ্রামের বাসিন্দা মুন্নাফ শেখ। লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আ. সামাদের মেয়েকে পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে সমর্থন না করায় তিনি ও তার ছেলেরা ক্ষুব্ধ হন এবং অভিভাবকদের নানাভাবে হুমকি দিতে থাকেন। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়েই অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন। তবে প্রধান শিক্ষক মো. আলী খান জানান, গত ২৬শে সেপ্টেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নতুন ভবনের কাজ শুরুর পর মাত্র দুই ঘণ্টার নোটিশে দোয়ার অনুষ্ঠান করতে বলে। সংশ্লিষ্টদের দাওয়াত পৌঁছানো হলেও অনেকে ব্যস্ততার কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। এরপর থেকেই মূলত ছাড়পত্র নেয়ার হিড়িক পড়ে।
তিনি আরও বলেন, অক্টোবর মাসে কেউ স্কুল ছাড়ে না, এটি জানুয়ারিতেও করতে পারতো। গ্রাম্য প্রভাবশালীরাই এর নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন। তবে আমরা আপস মীমাংসার জন্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দের দ্বারস্থ হয়েছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, কামরুল হাসান ও মুন্নাফ শেখ নামের প্রভাবশালীরা অভিভাবকদের টিসি নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। মকবুল হোসেন খান ডাঙ্গী, নছরদ্দিন খান ডাঙ্গী এবং কোলচুরী ডাঙ্গী গ্রামের মানুষ এসব প্রভাবশালীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. আকল শেখ বলেন, বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তানের পড়াশোনা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বাধ্য হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি। এদিকে, অভিযুক্ত কামরুল হাসান নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে বলেন, আমি ফরিদপুরে থাকি। একটি কুচক্রী মহলের ইন্ধনে আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা রটানো হচ্ছে। ভাষাণচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ মো. গোলাম কাউসার জানান, কমিটির দ্বন্দ্ব থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত। একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিক্ষার্থীরা আবার ফিরে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মামুনুর রহমান বলেন, কমিটির দ্বন্দ্ব থেকেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ হাতে এসেছে। তদন্ত সাপেক্ষে বিদ্যালয়টিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন ক্ষতি এলাকাবাসীর জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা। কোমলমতি শিশুরা যেন আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং দ্রুত স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসে— এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।
