বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে সাজানো হতো ‘লোক দেখানো’ তদন্ত: ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কর্মকর্তা

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে সাজানো হতো ‘লোক দেখানো’ তদন্ত: ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কর্মকর্তা

ফন্ট সাইজ:

কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জনসম্মুখে এলে সেটিকে বৈধতা দিতে লোক দেখানো প্রশাসনিক তদন্ত সাজানো হতো বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় করা এ মামলায় প্রসিকিউশনের শেষ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি শেষ করেন তিনি। এরপরই তাকে জেরা শুরু করেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা।

জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখনই জনসম্মুখে আসত, তখন ওই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার জন্য লোক দেখানো প্রশাসনিক নির্বাহী তদন্ত করা হতো। প্রকৃত অপরাধীরা যেন আড়ালেই থেকে যায়, সেজন্য নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক তদন্ত ব্যবহার করা হতো।’ তিনি আরও জানান, নিয়ন্ত্রিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের উদ্দেশ্যে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ গোপন করা হতো এবং এ জন্য কর্মকর্তাদের মিথ্যা ও ভুল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও পুলিশ প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বাধ্য করা হতো। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করা।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে আদালতকে জানান এই কর্মকর্তা। গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্য চলাকালে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি কোথায় কোথায় গেছেন, কী কী তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলো মামলার অভিযোগের সঙ্গে কীভাবে সম্পৃক্ত, তার বিস্তারিত ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন।

এদিকে, জীবননাশের আশঙ্কা প্রকাশ করে জেলখানা থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে একই প্রিজন ভ্যানে আনার আবেদন জানিয়েছেন জিয়াউল আহসান। তার এই আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে আদালতে সশরীরে হাজির না করে কারাগার থেকে ভার্চ্যুয়ালি মামলার শুনানির প্রস্তাব দেয় প্রসিকিউশন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল-১ বিষয়টি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ:
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে: প্রথম অভিযোগ: ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিনজনকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ: ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালসংলগ্ন বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ও মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়। তৃতীয় অভিযোগ: একই সময়ে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ আরও ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এসব অভিযোগে গত বছরের ১৭ই ডিসেম্বর প্রসিকিউশন জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল করে এবং একই দিন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ তিনটি আমলে নেন। পরবর্তীতে ২৩শে ডিসেম্বর তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়।