২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্যাডেল ঘোরানোর পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন মো. ইমন। রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন ১৪ বছরের এই কিশোর। আন্দোলন চলাকালে ২০শে জুলাই ঢাকার তেঁতুলতলা মোড়ে নির্বিচার গুলির মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান এই কিশোর। ছেলেকে হারিয়ে যখন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, তখন উল্টো আওয়ামী লীগ নেতার হুমকি শুনতে হয়েছিল-‘লাশ পেয়েছেন, কাঁদতে পারবেন না। নয়তো লাশ গায়েব করে দেবো।’
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে সেদিনের সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বর্ণনা তুলে ধরেছেন শহীদ ইমনের মা। ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মামলার পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে নিহতের মায়ের এ জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান চলাকালে ২৩ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে তিনি এ সাক্ষ্য দেন।
জবানবন্দিতে ইমনের মা জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে আন্দোলনে অংশ নেন ইমন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তেঁতুলতলায় ছেলেকে বাসার দিকে ফিরে আসতে দেখেন তিনি। একই দিন গুলিতে মারা যান ইমনের বোনের ভাশুর। ছেলেকে বাসায় যেতে বলে মেয়ের ভাশুরের মরদেহ দেখতে তেঁতুলতলা মোড়ে যান মা। ততক্ষণে মরদেহ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে নেওয়া হলে তিনি বাসায় ফিরে আসেন। ওই রাতেই জারি করা হয় কারফিউ।
তিনি বলেন, “আমি ছেলেকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু শহীদ ইয়ামিনের একটি ভিডিও দেখিয়ে ইমন বলেছিলÑ‘দেখছো আমার বয়সী ছেলেদের কীভাবে মেরে ফেলছে। আমি কেন আন্দোলনে যাবো না?’”
পরদিন ২০ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে খাওয়া-দাওয়া শেষে বন্ধু নাঈম ও শাহীনকে নিয়ে ফের বাসা থেকে বের হয় ইমন। তারা তেঁতুলতলার মোড়ে আন্দোলনে অংশ নেয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বন্ধু শাহীন বাসায় এসে ইমনের বড় ভাই রাজীবকে জানায়, ‘ইমন গুলি খেয়েছে’। খবর পেয়ে মা, বাবা ও বড় ভাই রাজীব দ্রুত এম জেড হাসপাতালের সামনে তেঁতুলতলার মোড়ে ছুটে যান।
ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিয়ে সাক্ষী জানান, যাওয়ার পথে তারা দেখতে পান চারদিক থেকে, এমনকি ওপর থেকেও গুলি ছোড়া হচ্ছিল। তেঁতুলতলা মোড়ে গিয়ে ইমনকে রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মা। পরে স্থানীয় তিন ব্যক্তি ইমনকে রিকশায় করে বাসার সামনের রাস্তায় নিয়ে আসেন এবং অচেতন মাকে বাসায় নেওয়া হয়।
ইমনের মা ট্রাইব্যুনালকে বলেন, “জ্ঞান ফেরার পর বাসার সামনে ছেলের মরদেহ দেখতে পাই। মাথায় হাত বুলিয়ে দেখি মাথার পেছনে খুলিতে গুলির চিহ্ন। বাম গালের চামড়া ইঁদুরের গর্তের মতো হয়ে ঝুলে ছিল এবং বুকের একপাশেও গুলির চিহ্ন দেখতে পাই।”
তিনি আরও বলেন, “সেই শোকের মুহূর্তে লম্বা চুলওয়ালা এক আওয়ামী লীগ নেতা এসে ধমক দিয়ে বলেন, ‘লাশ পেয়েছেন কাঁদতে পারবেন না, না হলে লাশ গায়েব করে দেবো’।” এছাড়া এলাকার একটি মসজিদে খাটিয়ার জন্য গেলে বড় ছেলে রাজীবকে খাটিয়া পর্যন্ত দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি। পরে অন্য একটি মসজিদ থেকে খাটিয়াসহ গোসল করানোর লোক এনে জানাজা সম্পন্ন করা হয়।
রাত ১১টার দিকে চারদিক থেকে চলা গুলির মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন স্বজনরা। গ্রামে যাওয়ার পথে তিন জায়গায় আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার মুখে পড়েন তারা। পরে অনুরোধ করে ছাড়া পেয়ে ২১ জুলাই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গ্রামের বাড়ি পৌঁছান এবং পারিবারিক কবরস্থানে ইমনের দাফন সম্পন্ন হয়।
জবানবন্দি দেওয়ার সময় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের ছেলের হত্যার জন্য দায়ী করে ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই মা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ১৯ জুলাই যদি কারফিউ না দেওয়া হতো, তবে হয়তো তার ছেলে বেঁচে থাকত। ট্রাইব্যুনালের কাছে সন্তান হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রার্থনা করেন তিনি।
