ভয়াবহ হামলা, পাল্টা জবাব ইরানের

ফন্ট সাইজ:

যুদ্ধবিমান, বি-২ স্টিল্‌থ বোমারু বিমান থেকে বৃষ্টির মতো বোমা ফেলা হয়েছে ইরানে। তেহরানে তেল স্থাপনাগুলো জ্বলছে দাউ দাউ করে। পুরো তেহরানের আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। ফলে সেখানে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে। পূর্ব সতর্কতা হিসেবে লোকজনকে ঘরের বাইরে বের না হতে বলা হয়েছে। এতে আকাশ থেকে বিষাক্ত বৃষ্টির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওদিকে বাহরাইনে পানি শোধনাগারে হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে পানীয় জলের সংকট দেখা দিতে পারে। বহু স্থাপনা ধ্বংস বা নষ্ট হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) কয়েকদিনে ইরানের কমপক্ষে ২০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। বি-২ এর এই হামলায় রাতের তেহরান এক অগ্নিগোলকের আকার ধারণ করে। ভয়ে অনেক মানুষ তেহরান ছেড়ে গেছেন। কিন্তু ইরানের মনোবল এখনো ভাঙতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। পক্ষান্তরে ট্রাম্পকে এসব হামলার মূল্য দিতে হবে বলে শাসিয়ে যাচ্ছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পাল্টা জবাব অব্যাহত রেখেছে ইরান। একের পর এক মার্কিন ঘাঁটি, ইসরাইল তাদের নিশানা। ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড জানিয়ে দিয়েছে তাদের হাতে কমপক্ষে আরও ৬ মাসের যুদ্ধের রসদ জমা আছে। ইসরাইলে বা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তার পুরোটা প্রকাশ পাচ্ছে না। এর কারণ, নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া। যেটুকু তারা দেখে, তা লেখে না। তারপরও ইরানের হামলায় বিস্মিত মানুষ। ইরানের মূলে কি আঘাত করতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল! পরিস্থিতি তেমনটাই বলছে। কার্যত মধ্যপ্রাচ্য জ্বলছে। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ভয় পাচ্ছে। ইরান সেদিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে। পরিস্থিতি বলছে ইরানের সামরিক ব্যবস্থা অক্ষত। তাই ইরান এভাবে জবাব দিতে পারছে। এর মধ্যদিয়ে বিস্ময়কর এক ইরান সবার সামনে উদ্ভাসিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত বছর যখন ইরানে হামলা চালায় তখন তাদের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা সহ কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়ার কথা বলে। এও বলে যে, ইরানকে বিশ/ত্রিশ বছর পেছনে ঠেলে দেয়া হয়েছে। তার অর্থ ইরান শেষ। সেই শেষ ইরানই এবার আহত বাঘের মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রমাণ দিচ্ছে বীরেরা মৃত্যুর আগে মরে না। ফলে সবার সামনে এক বিস্ময়ের নাম এখন ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, দিবাগত রাতে ভয়াবহ হামলা হবে ইরানে। এরপর যা দেখা গেল তাতে ইরানের তেল পরিশোধনাগারে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। শনিবার রাতে রাজধানী তেহরানের একটি বিশাল তেল সংরক্ষণাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরানের বেশ কয়েকটি ‘জ্বালানি মজুত কেন্দ্রে’ সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে। ফলে রাতের তেহরান আগুনের শিখায় লাল হয়ে ওঠে। বার্তা সংস্থা এপি’র ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, তেহরানের রাতের আকাশ আগুনের তীব্র আভায় লাল হয়ে আছে। বহুদূর থেকে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই হামলার জন্য সরাসরি ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের’ যৌথ হামলাকে দায়ী করেছে। উল্লেখ্য, এই ডিপোটি তেহরানসহ উত্তরের প্রদেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বেসামরিক মানুষকে সতর্ক করে বলেছে, তেল স্থাপনায় বিস্ফোরণের পর বৃষ্টি বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের বৃষ্টি ত্বকে রাসায়নিক দাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। এ জন্য টেলিগ্রামে দেয়া পোস্টে বিস্ফোরণের পর বৃষ্টি হলে কোনো অবস্থাতেই ঘর থেকে বের না হতে, বাইরে থাকলে অবিলম্বে কংক্রিট বা ধাতব ছাদের নিচে আশ্রয় নিতে, বৃষ্টির পানি ত্বকে লাগলে কোনো অবস্থাতেই আক্রান্ত স্থান না ঘষতে নির্দেশনা দিয়েছে তারা। ইরানও ঘুমিয়ে নেই। তারাও পাল্টা হামলায় তটস্থ করে রেখেছে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে। কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপ (আইআরজিসি)। তারা জোর দিয়ে বলেছে, ৬ মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা আছে। ওদিকে ইরানের সশস্ত্রবাহিনী খাতাম আল আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের তরফে জানিয়েছে ২৪ ঘণ্টায় ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর শক্তিশালী প্রতিশোধমূলক হামলায় দুই শতাধিক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। কুয়েত বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাঙ্কে ড্রোন হামলা করেছে তারা। সব মিলিয়ে মহাশক্তির বিরুদ্ধে এখনো যে ইরান টিকে আছে, শাসকগোষ্ঠী টিকে আছে- এ এক বিস্ময়। বিস্ময়কর ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মুখে যতই বলুক ইরানকে শেষ করে দিয়েছে, ইরানে কোনো শাসন কাঠামো নেই, বাস্তবে সেগুলো ফাঁকা বুলির মতো শোনায়। কারণ, ইরান সমান শক্তিতে ফাইট দিয়ে আসছে। এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। হোয়াইট হাউস, সান ফ্রান্সিসকোতে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভ হয়েছে মেক্সিকো সিটিতে অবস্থিত মার্কিন কন্স্যুলেটের সামনে। এতদিন পর এই যুদ্ধে কড়া সতর্কতা দিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের জনগণই ওই অঞ্চলের প্রকৃত মালিক। তাই ওই অঞ্চলের বিষয়গুলো সেখানকার দেশগুলোকেই স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করতে হবে। ওদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওমান এয়ার এক সপ্তাহের জন্য ফ্লাইট স্থগিত করেছে। তারা ঘোষণা করেছে- আঞ্চলিক আকাশসীমা বন্ধ থাকার কারণে ৯ই মার্চ থেকে ১৫ই মার্চের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এবং সেখান থেকে আসা সব বিমান চলাচল স্থগিত থাকবে। বিমান সংস্থাটি জানিয়েছে যে আম্মান, দুবাই, বাহরাইন, দোহা, দাম্মাম, কুয়েত, বাগদাদ, খাসাব, এই গন্তব্যগুলোতে চলাচলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ওদিকে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন নিহত হয়েছেন। ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা হাইফা ও তেল আবিবে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তারা নিশ্চিত করেছে, তারা হামলার পরিসর আরও বাড়িয়ে কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। ইরানের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ মেহদি মির বাঘেরি জানিয়েছেন, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পদে একজনের বিষয়ে ঐকমত্যে এসেছেন। তবে সামান্য পদ্ধতিগত সমস্যার জন্য ঘোষণা দেয়া হয়নি। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, ৭২ ঘণ্টায় মার্কিন বিমান বাহিনী বি-২ স্পিরিট স্টিল্‌থ বোমারু বিমান সহ যুদ্ধবিমান দিয়ে ইরানের গভীরে প্রায় ২০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, তেহরানের আশপাশের এলাকাগুলোই ছিল বি-২ অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। তবে কোথায় কোথায় হামলা চালানো হয়েছে, সেই নির্দিষ্ট স্থানগুলো তিনি প্রকাশ করেননি। বি-২ স্পিরিটকে বর্তমানে ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত কৌশলগত স্টিল্‌থ বোমারু বিমানগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে এমন উচ্চমানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দেয়ার জন্য, যা অন্য বেশির ভাগ যুদ্ধবিমানকে আটকে দিতে পারে। তেহরানের আশপাশের এলাকা বলতে সম্ভবত ‘মাউন্টেন বেস’ বা ‘মিসাইল সিটি’কে বোঝানো হয়েছে। অ্যালর্বোজ পর্বতমালার ভেতর খোদাই করে তৈরি বিশাল ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এটি। সেখানে ইরান তাদের শক্তিশালী দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করে। বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকায় তেহরান এখন যেন এক ভুতুড়ে শহর। যারা এখনো শহর ছেড়ে যাননি, তারা নতুন বিস্ফোরণের ভয়ে ঘরের ভেতরেই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। মধ্য তেহরানের ফেরদৌসি স্কয়ারের আশপাশের বহু ভবন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৩ বছর বয়সী নার্স সামিরেহ বলেন, ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতেও আমার ভয় লাগে। কারণ আকাশ থেকে এখনো বোমা পড়ছে। তিনি বলেন, ইরানের রাজধানী শহরে সাধারণত প্রায় ১ কোটি মানুষের বসবাস। কিন্তু গত কয়েক দিনে এখানে এত কম মানুষ দেখা যাচ্ছে যে মনে হয় যেন কোনো দিনই এখানে কেউ থাকতো না। শনিবার খামেনির বাসভবনে প্রথম ইসরাইলি ও মার্কিন হামলার পর ইরান সরকার তেহরানের বাসিন্দাদের শান্ত থেকে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানায়। সামিরেহ বলেন, আমাকে শহরেই থাকতে হচ্ছে। কারণ আমি একজন নার্স। না হলে আমি অবশ্যই এরই মধ্যে রাজধানী ছেড়ে চলে যেতাম। তেহরানের অপেক্ষাকৃত অভিজাত উত্তরাংশে অনেক বাসিন্দাই চলে গেছেন। সেখানে স্বাভাবিক সময়ের যানজটের কোলাহলের বদলে এখন শোনা যাচ্ছে বিড়ালের ডাক আর পাখির কূজন। যেসব আধুনিক ক্যাফে ও রেস্তরাঁ সন্ধ্যায় সাধারণত জমজমাট থাকে, সেগুলো বন্ধ। রাস্তাঘাট ফাঁকা। যে ক’টি যানবাহন এখনো চলাচল করছে, সেগুলোর বেশির ভাগই খোলা থাকা মুদি দোকান ও ছোট স্থানীয় দোকানগুলোতে সরবরাহ পৌঁছে দিচ্ছে। ক্রেতারা তাড়াহুড়ো করে ফল কিনছেন, আর তাজা রুটির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

Md. Zarzis Alam

৪ মাস আগে

আল্লাহ তুমি সর্ব শক্তিমান, তুমি ছাড়া ইরানের মজলুম বান্দাদের রক্ষা করার জন্য পৃথিবীতে আর কেউ নেই.

A R Sarker

৪ মাস আগে

আল্লাহ সবই দেখছেন। নিশ্চয়ই তিনি তার বান্দাদের ছেড়ে যাবেন না।

মন্তব্য করুন