একই পরিবারের একাধিক সদস্যের সারের ডিলারশিপ বা খুচরা বিক্রেতা হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে সরকারের প্রণীত নতুন নীতিমালার কার্যকারিতা বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। উক্ত বিধান চ্যালেঞ্জ করে করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের দেয়া স্থিতাবস্থার আদেশ স্থগিত করেছেন চেম্বার আদালত। ফলে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো আইনি বাধা রইলো না। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এ আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. এনামুল হক টুটুল।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নীতিমালা সংস্কার: সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিভিন্ন সময়ে দেশে সার নিয়ে সংকট বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার সমস্যা নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। এর আগে ২০০৯ সালের সার ডিলার ও বিতরণ সংক্রান্ত নীতিমালায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য ডিলার হতে পারবেন কি পারবেন না—এ বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। এর ফলে স্বামী, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধূসহ একই পরিবারের সদস্যদের নামে কোটা বা সিন্ডিকেট তৈরি করে একটি পারিবারিক একচেটিয়া আধিপত্য (মনোপলি) গড়ে তোলা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালে নীতিমালাটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৬ সালের আগস্টে এতে যুগোপযোগী সংস্কার আনে। সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সার ব্যবস্থাপনা, ডিলারশিপ ও বিতরণ সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা হালনাগাদ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো—কৃষকের কাছে যথাসময়ে ও ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়া, সারের ডিলারশিপ নিয়ে বিদ্যমান পারিবারিক সিন্ডিকেট ও কোটা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া, ডিলার নিয়োগ ও বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করা।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে হালনাগাদ করা নীতিমালার বিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে একই পরিবারের একজনের ডিলারশিপ বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত খুচরা বিক্রেতার আইডি কার্ড থাকলে, ওই পরিবারের অন্য কেউ আর কোনো ডিলারশিপ কিংবা খুচরা বিক্রেতার আইডি কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন না।
নীতিমালায় পরিবারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, পুত্র, পুত্রের স্ত্রী, পুত্রের পুত্র ও তাদের স্ত্রী, অবিবাহিত কন্যা এবং নির্ভরশীল ভাই ও বোন, যারা একান্নভুক্ত বা একখানায় খাদ্য গ্রহণ করেন।
হাইকোর্টের রিট ও আপিল বিভাগের আদেশ: দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসা এমন পাঁচটি পরিবারের সদস্যরা গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে সরকারের নতুন নীতিমালার এই অংশ চ্যালেঞ্জ করে দুটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ অন্তর্বর্তীকালীন স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়ে তাদের বিদ্যমান ডিলারশিপ বহাল রাখার নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ (অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়) তাৎক্ষণিকভাবে আপিল দায়ের করে। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল—নীতিমালা অনুযায়ী এখনো ডিলারশিপ নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান এবং বিতরণের চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হয়নি; তাছাড়া পারিবারিক একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই সরকার এই যুগোপযোগী বিধান করেছে।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের দেয়া স্থিতাবস্থার আদেশটি স্থগিত করেন। এর ফলে ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সরকারের প্রণীত নীতিমালাটি হুবহু বহাল থাকল এবং এই নীতিমালার অধীনেই দেশব্যাপী ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ কার্যক্রম চলবে।
